দশ বছরের একক রাজত্ব নিয়ে শাকিব খানের ২০ বছর

বিনোদন প্রতিবেদক
বিনোদন প্রতিবেদক বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৯ পিএম, ২৮ মে ২০১৯

অভিনয় ক্যারিয়ারে ২০ বছরে পূর্ণ করলেন ঢালিউড সুপারস্টার শাকিব খান। ১৯৯৯ সালের আজকের এ দিনে মুক্তি পেয়েছিল সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘অনন্ত ভালোবাসা’ চলচ্চিত্রটি। এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় পা রেখেছিলেন শাকিব খান। সিনেমায় আসলেন আর জয় করলেন এমন ক্যারিয়ার নয় তার। ক্যারিয়ারে প্রথম ১০ বছর প্রচুর কাঠ খড় পুড়াতে হয়েছে তাকে। তারপর সফলতা ধরা দেয় হাতে।

সিনেমায় আসার প্রথম ১০ বছরে পরিশ্রম তাকে বানিয়েছে আজকের শাকিব খান। ১০ বছর ধরে ঢাকাই সিনেমায় একক রাজত্ব তার। বছরের পর বছর ধরে দেখা যাচ্ছে সারা বছরের সেরা ব্যবসা সফল ছবির তালিকায় অধিকাংশ ছবিই থাকে শাকিব খান অভিনীত। চোখবন্ধ করে প্রযোজকরা বাজি ধরেন তার উপর।

২০ বছর আগের চোখে স্বপ্ন মাখা সেই হ্যাংলা পাতলা মাসুদ রানা নামের ছেলেটিই আজকের শাকিব খান। এই নামের বাইরেও ঢালিউডের কিং খান ও বস নাম্বার ওয়ান নামে তাকে ডেকে থাকেন তার ভক্তরা। ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ এই নায়ক জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আব্দুর রব ছিলেন একজন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী ও মাতা নূরজাহান একজন গৃহিণী।

সুদর্শন এই নায়কের উচ্চতা ৬ ফুট। ছোট বেলায় স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হবেন। ছাত্রও ছিলেন সাইন্সের। কিন্তু এইচএসসি পড়ার সময়ই সিনেমার প্রতি ঝোঁক তৈরী হয়। শেষে ঝুঁকলেন সিনেমাতেই। শাকিব ১৯৯৯ সালে প্রথম চুক্তিবদ্ধ হন ‘সবাইতো সুখী হতে চায়’ চলচ্চিত্রে। আফতাব খান টুলু পরিচালিত এ ছায়াছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এতে তার বিপরীতে ছিলেন আরেক নবাগতা কারিশমা শেখ।

তবে এই ছবির শুটিং শেষ হওয়ার আগেই তার অন্য একটি সিনেমা মুক্তি পায়। এই দিক থেকে শাকিব খান অভিনীত প্রথম ছবি সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘অনন্ত ভালোবাসা’। এটি মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালের আজকের দিনে ২৮ মে। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন চলচ্চিত্রের আরেক অভিনয়শিল্পী মৌসুমীর ছোট বোন ইরিন জামান। দু'জনেরই এটি ছিল প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র।

ছবি হিসেবে অনন্ত ভালোবাসা খুব একটা সফল না হলেও নায়ক হিসেবে শাকিব খান সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরের বছর ২০০০ সালে অভিনয় করেন গোলাম, আজকের দাপট, দুজন দুজনার, বিষে ভরা নাগিন চলচ্চিত্রে। এজে রানা পরিচালিত ‘আজকের দাপট’ চলচ্চিত্রে প্রথম পূর্ণিমার বিপরীতে, আবু সাঈদ খান পরিচালিত ‘দুজন দুজনার’ চলচ্চিত্রে প্রথম পপির বিপরীতে ও দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ‘বিষে ভরা নাগিন’ চলচ্চিত্রে প্রথম মুনমুনের বিপরীতে অভিনয় করেন।

২০০১ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত শিকারী, স্বপ্নের বাসর, মায়ের জেহাদ, রাঙ্গা মাস্তান, হিংসার পতন, বন্ধু যখন শত্রু ছায়াছবিগুলো। এফআই মানিক পরিচালিত স্বপ্নের বাসর চলচ্চিত্রে রিয়াজ ও শাবনূরের পাশাপাশি তার অভিনয় প্রশংসিত হয়।
২০০২ সালে মুক্তি পায় এফআই মানিক পরিচালিত ফুল নেবনা অশ্রু নেব, ও স্ত্রীর মর্যাদা, শাহাদাৎ হোসেন লিটন পরিচালিত ও প্রিয়া তুমি কোথায়, জিল্লুর রহমানের নাচনেওয়ালী এবং বাদল খন্দকারের বিশ্ব বাটপার। স্ত্রীর মর্যাদা ছায়াছবিতে তিনি প্রথম মৌসুমীর বিপরীতে অভিনয় করেন।

২০০৩ সালে অভিনয় করেন সাহসী মানুষ চাই, প্রাণের মানুষ, ক্ষমতার দাপট, ও সবার উপরে প্রেম চলচ্চিত্রে। এ বছর তার অভিনীত মহম্মদ হাননান পরিচালিত সাহসী মানুষ চাই চলচ্চিত্রটি প্রশংসিত হয়। ২০০৪ সালে তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো মধ্যে নয়ন ভরা জল, আজকের সমাজ, বস্তির রানী সুরিয়া, রুখে দাঁড়াও উল্লেখযোগ্য।

২০০৫ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত এমএ রহিম পরিচালিত সিটি টেরর। এ চলচ্চিত্রে তিনি আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা মান্নার সাথে অভিনয় করেন। এছাড়া শাহীন-সুমন পরিচালিত বাঁধা চলচ্চিত্রে রিয়াজ ও পূর্ণিমার সাথে অভিনয় করেন। এই সময় ছিলো অশ্লিল সিনেমার দাপট। আলেক জান্ডার বো, মেহেদী, ময়ূরী, মুনমুনরা চলচ্চিত্রের এই অন্ধকার সময়ের ধারক ছিলেন। শাকিব খানও তাতে গা ভাসাননি তা নয়। অশ্লীল যুগেও শাকিব খান সেই সময়কার দাপুটে নায়িকা মুনমুন,ময়ুরি দের সাথে কিছু অশ্লীল ছবিতে অভিনয় করেন। সেখানেও সফলও হয়েছিলেন।

চলচ্চিত্রে ১৯৯৯ সালে ক্যারিয়ার শুরু করে পাঁচ বছর মোটামুটি চলেছে শাকিব খান অভিনীত সিনেমা। এরই মধ্যে সেই সময়ের চলচ্চিত্রের স্বনামধন্যদের সঙ্গে অভিনয় করে ফেলেন শাকিব। নায়ক রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, মান্না, রিয়াজ, আমিন খান, আলমগীর, বাপ্পারাজসহ আরো অনেকের সঙ্গে অভিনয় করেন। সেই সময়ে তার নায়িকার ভূমিকাতে দেখা গেছে মৌসুমী, পূর্ণিমা, পপি, মুনমুনের মতো নায়িকাদের।

২০০৬ সাল থেকে শাকিব খানের অভিনয় জীবনে নতুন বাঁক নেয়। এ বছর এফআই মানিক পরিচালিত ‘কোটি টাকার কাবিন’ সিনেমাটি শাকিবকে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা এনে দেয়। শাকিব-অপু জুটির প্রথম সিনেমা ছিল এটি। এরপর থেকে একের পর এক সিনেমায় জুটি হয়েছেন শাকিব-অপু। যার মধ্যে অধিকাংশ সিনেমায় ব্যবসা সফল।

এই বছর তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে আরো ছিল- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প সুভা অবলম্বনে নির্মিত ‘সুভা’। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ও নাম চরিত্রে অভিনয় করেন অভিনেত্রী পূর্ণিমা। একই বছর আরো মুক্তি পায় পিতার আসন, দাদিমা, চাচ্চু ও দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত মায়ের মর্যাদা।

২০০৭ সালে মা আমার স্বর্গ, আমার প্রাণের স্বামী, কাবিনামা, স্বামীর সংসার, ডাক্তার বাড়ি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ২০০৬ ও ২০০৭ শাকিবের টার্নিং হয় ভালোভাবেই। এ সময়ের নাম্বার ওয়ান হিরো ছিলেন চিত্রনায়ক মান্না। মান্নার সিনেমার পাশাপাশি শাকিবের সিনেমাও দেখতে শুরু করে দর্শক।

২০০৮ সাল থেকে শাকিব খানের রাজত্বের পূর্ভাবাস মিললো। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মান্না। চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। মান্নার শূন্যস্থানে শাকিব তার অবস্থান তৈরি করে নেন ভালোভাবেই। ২০০৮ সালে তার অভিনীত সিনেমাগুলো হলো— তোমাকে বউ বানাবো, আমার জান আমার প্রাণ, সমাধি, ১ টাকার বউ, ভালোবাসার দুশমন, প্রিয়া আমার প্রিয়া, টিপ টিপ বৃষ্টি, তুমি স্বপ্ন তুমি সাধনা, আমাদের ছোট সাহেব, সন্তান আমার অহংকার, যদি বউ সাজো গো, মনে প্রাণে আছ তুমি।

এরপর থেকে কেবলই নিজের রাজত্ব বাড়াতে থাকেন শাকিব খান। ২০০৯ সালে তিনি অভিনয় করেন আমার প্রাণের প্রিয়া, স্বামী স্ত্রীর ওয়াদা, ভালোবাসা দিবি কি না বল, মন যেখানে হৃদয় সেখানে, বলো না কবুল, বিয়ের প্রস্তাব, জন্ম তোমার জন্য, প্রেম কয়েদী, সাহেব নামের গোলাম, ও সাথী রে চলচ্চিত্রে।

২০১০ সাল থেকে বলা চলে একক রাজত্ব শুরু হয় তার। এই বছর থেকেই আর কোনো নায়ক তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না। সে বছর মুক্তি পায় তার অভিনীত বলো না তুমি আমার, প্রেম মানে না বাধা, টপ হিরো, পরান যায় জ্বলিয়া রে, ভালোবাসলেই ঘর বাধা যায় না, টাকার চেয়ে প্রেম বড়, জীবন মরনের সাথী, প্রেমে পড়েছি, চেহারা : ভণ্ড-২, প্রেমিক পুরুষ, হায় প্রেম হায় ভালোবাসা।

জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না চলচ্চিত্রে একজন স্বাধীনচেতা যুবক সূর্য চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে তার বিপরীতে ছিলেন অপু বিশ্বাস ও রুমানা খান। এ ছাড়া ওই বছর ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় তার অভিনীত নাম্বার ওয়ান শাকিব খান, চাচ্চু আমার চাচ্চু ও নিঃশ্বাস আমার তুমি।

বদিউল আলম খোকন পরিচালিত নাম্বার ওয়ান শাকিব খান ব্যবসায়িক সফলতা লাভ করে এবং ঢালিউডের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের সেরা দশে অবস্থান করে। শাহাদাৎ হোসেন লিটনের জীবন মরণের সাথী, পি এ কাজলের চাচ্চু আমার চাচ্চু এবং বদিউল আলম খোকনের নিঃশ্বাস আমার তুমি তিনটি চলচ্চিত্রেই তার বিপরীতে অভিনয় করে অপু বিশ্বাস এবং চলচ্চিত্রগুলো বিভিন্ন বিভাগে জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কার অর্জন করে।

অনেক ঘাত­প্রতিঘাত পেরিয়ে ততোদিনে শাকিব খান প্রমাণ করেছেন তার অভিনীত সিনেমা মানেই ব্যবসায়িকভাবে সফল। ৩৫-৪০ লাখ টাকা সম্মানী হাঁকলেও নির্মাতারা নায়ক হিসেবে তাকেই চান। সেই ধারাবাহিকতায় ছুটে চলতে থাকে নাম্বার ওয়ান নায়কের ক্যারিয়ার। এক শ্রেণির দর্শকের মাথার মুকুট হয়ে যান শাকিব খান।

২০১১ সালে শাকিব খান অভিনীত কোটি টাকার প্রেম, মাটির ঠিকানা, কিং খান, মনের জ্বালা, আদরের জামাই, বস নাম্বার ওয়ান, টাইগার নাম্বার ওয়ান চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পায়। মালেক আফসারি পরিচালিত মনের জ্বালা চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে অভিনয় করেন অপু বিশ্বাস। এই ছায়াছবিতে তিনি প্রথম নেপথ্য শিল্পী হিসেবে ‘আমি চোখ তুলে তাকালেই সূর্য লুকায়’ গানে কণ্ঠ দেন।

সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত কোটি টাকার প্রেম ও পরিচালক জুটি শাহীন-সুমন পরিচালিত টাইগার নাম্বার ওয়ান ছবিও ব্যবসা সফল হয়। মোহাম্মদ হোসেন জেমী পরিচালিত কিং খান চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে অভিনয় করেন অপু বিশ্বাস ও লামিয়া মিমো।

২০১২ সালে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন করেন শাকিব। মিজু আহমেদকে হারিয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন। তার সাথে সাধারণ সম্পাদক হন মিশা সওদাগর। পরের নির্বাচন হয় ২০১৫ সালে। সেবারও সভাপতি হন শাকিব। মিশা হেরে যান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে সাধারণ সম্পাদক হন অমিত হাসান। টানা পাঁচ বছর শিল্পী সমিতির সভাপতি ছিলেন শাকিব।

তবে শিল্পী সমিতির চেয়ে তার মনোযোগ ছিল অভিনয়েই বেশী। শাকিব ২০১২ সালে অভিনয় করেন সে আমার মন কেড়েছে, বুক ফাটে তো মুখ ফুটেনা, এক টাকার দেনমোহর, মাই নেম ইজ সুলতান, ডন নাম্বার ওয়ান, খোদার পরে মা, ঢাকার কিং চলচ্চিত্রে।শাহীন-সুমন পরিচালিত খোদার পরে মা মুন্না চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে তার বিপরীতে ছিলেন সাহারা এবং তার মায়ের ভূমিকায় ছিলেন ববিতা।

২০১৩ সালে মুক্তি পায় তার অভিনীত ঢাকা টু বোম্বে, ফুল এন্ড ফাইনাল, জোর করে ভালবাসা হয় না, ভালবাসা আজকাল, নিষ্পাপ মুন্না, জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার, দেবদাস, মাই নেম ইজ খান, পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী। এফআই মানিক পরিচালিত জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে ছিলেন পূর্ণিমা। এছাড়াও এই ছায়াছবিতে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর একসাথে অভিনয় করেন রাজ্জাক, সোহেল রানা ও আলমগীর। ছায়াছবিটি ব্যবসা সফল হয়।

বদিউল আলম খোকন পরিচালিত মাই নেম ইজ খান চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে ছিল অপু বিশ্বাস। সিনেমাটি ঢালিউডের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের সেরা দশে অবস্থান করে।

অপরাজেয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বিখ্যাত উপন্যাস দেবদাস অবলম্বনে নির্মিত দেবদাস চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন চাষী নজরুল ইসলাম। শাকিব খানের বিপরীতে পার্বতী চরিত্রে অভিনয় করেন অপু বিশ্বাস ও চন্দ্রমুখী চরিত্রে অভিনয় করেন মৌসুমী। চলচ্চিত্রটি একই পরিচালকের ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দেবদাস চলচ্চিত্রের পুনঃনির্মাণ।

পিএ কাজলের ‘ভালবাসা আজকাল’ ছবিতে তিনি প্রথম মাহিয়া মাহীর বিপরীতে অভিনয় করেন। সাফি উদ্দীন সাফি পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ছায়াছবিতে তার সাথে অভিনয় করেন জয়া আহসান ও আরিফিন শুভ। এই ছায়াছবিতে তিনি দ্বিতীয়বার নৈপথ্য শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দেন ‘ও প্রিয় আমি তোমার হতে চাই’ গানে। ছবিটিতে জয় শিকদার চরিত্রে অভিনয় করে অর্জন করেন ২০১৪ সালে প্রদত্ত মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার-এ দর্শক জরিপ শাখায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতার পুরস্কার।

শাকিব খান ২০১৪ সালে অভিনয় করেন রাজত্ব, ফাঁদ - দ্য ট্র্যাপ, সেরা নায়ক, ডেয়ারিং লাভার, কঠিন প্রতিশোধ, হিটম্যান, হিরো: দ্য সুপারস্টার ছায়াছবিতে। এস কে ফিল্মসের ব্যানারে হিরো: দ্য সুপারস্টার ছায়াছবিটি প্রযোজনা করেন শাকিব খান নিজেই।

বদিউল আলম খোকন পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে তার সাথে অভিনয় করেন অপু বিশ্বাস, ইয়ামিন হক ববি, ববিতা ও নূতন। ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবিটি ব্যবসা সফল হয় এবং ঢালিউডের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের সেরা দশে অবস্থান করে। এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ২০১৫ সালে প্রদত্ত মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার-এ দর্শক জরিপ শাখায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতা বিভাগে পুরস্কৃত হন।

এছাড়া চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ প্রযোজিত এক কাপ চা ছায়াছবিতে একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০১৫ সালে তার অভিনীত এইতো প্রেম, আরো ভালবাসবো তোমায়, দুই পৃথিবী, লাভ ম্যারেজ, রাজা বাবু মুক্তি পায়। সোহেল আরমান পরিচালিত এইতো প্রেম তার অভিনীত প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র।

এতে তার বিপরীতে প্রথমবার অভিনয় করেন আফসানা আরা বিন্দু। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ২০১৬ সালে প্রদত্ত মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার-এ দর্শক জরিপ শাখায় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে মনোনীত হন।

২০১৬ সালে এসএ হক অলিক পরিচালিত ‘আরো ভালবাসবো তোমায়’ ছবিটি মুক্তি পায়। সে ছবিতে তিনি প্রথম অভিনয় করেন পরীমনির বিপরীতে। একই বছর উত্তম আকাশ পরিচালিত ‘রাজা ৪২০’ এবং সাফি উদ্দীন সাফি পরিচালিত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২’ মুক্তি পায়। পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২ ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনীর সিক্যুয়াল। দুই ক্রিকেটারের দ্বন্দ্ব নিয়ে নির্মিত এই ছায়াছবিতে তার সাথে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান ও মামনুন হাসান ইমন।

এই বছর ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় তার অভিনীত শিকারি, রানা পাগলা, সম্রাট। ২০১৬ সালে যৌথ প্রযোজনার ‘শিকারি’ ছাড়া অন্য ছবিগুলো ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি।

২০১৬ সাল থেকেই বলা চলে অনেকটা ব্যাকফুটে চলে যান শাকিব খান। কমেছে ছবির সংখ্যা। দর্শকের অভাবে হল বন্ধের মিছিলে ঈদ ছাড়া প্রযোজক ও হল মালিকরা শাকিবের উপরেও ভরসা করার সাহস হারান এ বছর থেকেই। সে থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি বছর শাকিবের ছবির দেখা মিলে ঈদেই। ১০-১৫টি ছবির জায়গায় সংখ্যাটা এসে থেমেছে সর্বোচ্চ ৩-৫-এ।

২০১৭ সালটি ক্যারিয়ারের বাইরে ব্যক্তি জীবনেও বেশ ধাক্কা নিয়ে আসে শাকিবের জন্য। এই বছরে অপু বিশ্বাস নিখোঁজ হওয়ার প্রায় এক বছর পর প্রকাশ্যে আসেন। শাকিবের সঙ্গে তার বিয়ের খবর ফাঁস করেন। সঙ্গে প্রকাশ্যে আনেন একমাত্র ছেলে আব্রামকেও। প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত চাপ ও সমালোচনার মুখে শাকিব খান অপুকে বিয়ের কথা ও পুত্র আব্রামের কথা স্বীকার করে নেন।

তখন জানা যায় শাকিব খান ২০০৮ সালে ১৮ এপ্রিল অপু বিশ্বাসকে বিয়ে করেন। বিয়ের বিষয়টি গণমাধ্যমে গোপন রাখা হয়। পরে ২০১৭ সালে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে বিয়ে করার কথা জানান অপু বিশ্বাস। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদও হয়ে গেছে।

ওই বছর থেকেই শাকিব খান হঠাৎ করে যৌথ প্রযোজনা ও কলকাতার ছবির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। দেশীয় চলচ্চিত্র যখন অনেক বেশি নির্ভর করছিলো শাকিবের উপর ঠিক তখন যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে ঝুঁকেছেন তিনি। প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে থাকেন দেশীয় নির্মাতা ও টেকনিশিয়ানদের। এজন্য সবার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হন তিনি। তাকে বয়কটের ঘোষণাও দেয় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ১৮ সংগঠনের চলচ্চিত্র পরিবার।

প্রথমে জাজ মাল্টিমিডিয়াার হাত ধরে তিনি এসকে মুভিজের ‘শিকারী’ ছবিতে কাজ করেন। এরপর নিজেই সম্পর্ক গড়ে তুলেন কলকাতার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ভেঙ্কটেসের সঙ্গে। সেখানে তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। আসে বেশ কয়েকটি ছবির ঘোষণাও। তবে মুক্তি পেয়েছে কেবল ‘নাকাব’ নামের ছবিটি। এটি দুই বাংলাতেই ব্যবসায়িক সাফল্য পেতে ব্যর্থ হয়েছে। 

২০১৭ সালে শাকিবের ‘সত্তা’, ‘নবাব’, ‘রংবাজ’, ‘অহংকার’, ‘রাজনীতি’ ছবিগুলো মুক্তি পায়। তারমধ্যে ব্লকবাস্টার হিট করেছে জাজ ও এসকে মুভিজের ‘নবাব’ ছবিটি। সে বছরের রোজা ঈদে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে শাকিবের নায়িকা ছিলেন শুভশ্রী। ওই বছরে গড়পরতা ব্যবসা করতে সক্ষম হয় ‘রংবাজ’ ও ‘রাজনীতি’ ছবি দুটো। ‘সত্তা’ ও ‘অহংকার’ মুখ থুবড়ে পড়ে বক্স অফিসে। 

২০১৮ সালে অনেকটাই ম্লান দেখা যায় ঢালিউডের কিং খান খ্যাত শাকিবের ক্যারিয়ার। নতুন নায়ক সিয়াম আহমেদের উত্থান সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে অনেকটাই চাঙ্গা করে দিলো। পুরনো মুখের পরিবর্তে নতুন মুখের উপস্থিতি এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ধরা দিলো সিনেমাপ্রেমী দর্শকের কাছে। গেল বছরের শাকিব খানের তিনটি ছবির সঙ্গে মুক্তি পায় নতুন নায়ক সিয়ামের ‘পোড়ামন ২’। 

প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বাজিমাত করতে সক্ষম হয় ছবি। ঈদের সেরা ব্যবসাসফল ছবি হিসেবে এগিয়ে যায় এটি। শাকিবের ‘পাংকু জামাই’, ‘চিটাগাইংগা পোয়া নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ এবং ‘সুপারহিরো’ ছবিগুলোর মধ্যে ‘সুপারহিরো’ খানিটা দর্শক টানতে সক্ষম হয়।একই বছর কোরবানি ঈদে শাকিব খান সাফল্য পান ‘ক্যাপ্টেন খান’ ছবিটি দিয়ে।

২০১৮ সাল থেকে আবারও দেশি সিনেমায় নিয়মিত হন শাকিব খান। বলা চলে অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি কলকাতার ছবি থেকে সরে আসেন। বাংলাদেশে সিনেমার ব্যর্থতা দেখে ও যৌথ প্রযোজনার নীতিমালায় নতুন নিয়মে অনেক প্রতিবন্ধকতা চলে আসায় কলকাতার যে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শাকিব কাজ করতেন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। আবারও দেশমুখী তাই নায়ক।

চলছে ২০১৯ সাল। সারা বছর একটি ছবিও মুক্তি পায়নি শাকিবের। আসছে ঈদের জন্য তৈরি করেছেন নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে একটি ছবি। এসকে ফিল্মস থেকে ঈদে মুক্তি পাবে ‘পাসওয়ার্ড’। ছবিটি পরিচালনা করেছেন মালেক আফসারী। এ ছবিতে শাকিব খানের বিপরীতে বুবলী অভিনয় করেছেন। ছবিটিতে আরও অভিনয় করেছেন নায়ক ইমন। একইসঙ্গে এই ঈদে মুক্তি পাবে তার ‘নোলক’ ছবিটিও। 

এছাড়া বর্তমানে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে শাকিবের ‘শাহেনশাহ’, ‘একটু প্রেম দরকার’ নামের ছবি দুটো। এই দুই ছবির শুটিং প্রায় শেষ। এগুলো আগামী কোরবানি ঈদে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে নতুন করে কাজী হায়াতের পরিচালনায় ‘বীর’ ছবিতে যুক্ত হলেও সেটির নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে পরিচালকের অসুস্থতায়। সর্বশেষ তিনি যুক্ত হয়েছেন জাকির হোসেন রাজুর একটি ছবিতে।

এরপর..... আপাতত থামতে হচ্ছে। 

ধারণা করা হচ্ছে চিত্রনায়ক শাকিব খান হয়তো এবার প্রযোজনাতে নিয়মিত হবেন। কারণ সিনেমা হল বন্ধের হিড়িকে নিয়মিত বাড়ছে প্রযোজকদের লোকসান। তাই সিনেমা অর্থ লগ্নি করতে এখন আর কেউ সাহস দেখাচ্ছেন না। কোনো নায়কের উপরই এখন আর কেউ আস্থা রাখছেন না। শাকিব খানও ঈদ ছাড়া বছরের বাকিটা সময় নিজের ছায়া হয়ে থাকছেন। তাই বাধ্য হয়ে নিজেকেই প্রযোজনায় নিয়মিত থাকতে হবে, যদি তিনি নিজেকে নায়ক হিসেবে দেখতে চান। 

তবে এই সুযোটাই শাকিবের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। সিনেমার এই ক্রান্তিলগ্নে শাকিব খান প্রযোজনায় নিয়মিত হলে, অন্য তারকাদের নিয়ে একটা সম্প্রীতির বলয় তৈরি করতে পারলে আরও অনেকটা সময় নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবেন। সেইসঙ্গে কেটে যাবে তার ‘স্বার্থপর নায়ক’ দুর্নামটিও।

ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সুপারস্টার শাকিব খানকে ২০ বছর পূর্তিতে শুভেচ্ছা।

এমএবি/এলএ/এমকেএইচ

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - [email protected]

আপনার মতামত লিখুন :