নাটক-সিনেমার ফেসবুক গ্রুপে চাঁদাবাজি, পরিচালক ও শিল্পীরা জিম্মি

বিনোদন প্রতিবেদক
বিনোদন প্রতিবেদক বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৩৯ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০২১

প্রচারেই প্রসার। সংশ্লিষ্ট ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে প্রচারের বিকল্প নেই। নানা সভ্যতায় প্রচারের জন্য বৈচিত্রময় কৌশলের উদ্ভব হয়েছে। এই ডিজিটাল যুগে প্রচারের দারুণ এক মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে যে কোনোকিছু খুব দ্রুতই সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এই মাধ্যমে। যেখানে ফেসবুক সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

সেই ফেসবুকে নাটক-চলচ্চিত্রকে ভিত্তি করে অনেকদিন ধরেই নানা রকম গ্রুপ গড়ে উঠেছে। উদ্দেশ্য, সেই প্রচার। দেশীয় নাটক ও চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে এর মান ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তোলা। বলা চলে সেই প্রচেষ্টা বেশ ভালোভাবেই সফল। গেল কয়েক বছরে অনেক নাটক-সিনেমারই নাম নেয়া যাবে যেগুলো গণমাধ্যমের পাশাপাশি ফেসবুকের গ্রুপগুলোর হাত ধরে আলোচনায় এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা নিঃস্বার্থভাবে দেশীয় নাটক-সিনেমা প্রতিনিয়ত লিখেন। যা প্রভাবিত করে সাধারণ দর্শককে।

তবে বেদনা ও পরিতাপের বিষয় হলো বেশিরভাগ গ্রুপই জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতাকে পূঁজি করে আজ নানা বিতর্কের মুখে রয়েছে। অভিযোগ আছে নাটক-চলচ্চিত্র ও তারকাদের প্রচারের বিনিময়ে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে কিছু গ্রুপ থেকে। এইসব চাঁদাবাজিতে জড়িয়েছেন জনপ্রিয় গ্রুপগুলোর অনেক অ্যাডমিন ও সদস্যরা। যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিনোদন ভিত্তিক বিষয় নিয়ে লেখালেখির জন্য বেশ পরিচিত। দেখে নেয়া যাক সেইসব গ্রুপ ও অভিযোগগুলো-

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে রাশিদ পলাশের সিনেমা ‘পদ্মাপুরাণ’। মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে ছবিটির। তবে কোনো এক অদ্ভূত কারণে এই ছবিটি নিয়ে ফেসবুকে সিনেমা সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোতে কোনো আলোচনাই নেই। এর কারণ জানতে গিয়ে বের হয়ে আসে চাঁদাবাজির এক ভয়ংকর তথ্য। ছবির পরিচালক রাশিদ পলাশ জানিয়েছেন একটি গ্রুপ থেকে তার কাছে ছবির প্রচারের জন্য আড়াই লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন ওই গ্রুপের অ্যাডমিন।

তিনি বলেন, ‘একটি গ্রুপের সদস্য সৈয়দ নাজমুস সাকিব নামের একজন। তিনি বলেছেন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিলে আমার ছবিটি নিয়ে লেখালেখি করবেন। পজিটিভ রিভিউ দেবেন। আমি রাজি হইনি। পরে তিনি আর আমার সিনেমাটি নিয়ে একটি অক্ষরও লিখেননি। এমনকি জানতে পেরেছি ওই গ্রুপে অনেকেই আমার ছবিটি নিয়ে লিখতে চেয়েছেন কিন্তু সেইসব লেখা গ্রুপে এপ্রুভ করা হয়নি।’

এ নির্মাতা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘তাহলে কি এসব ফেসবুক ভিত্তিক সিনেমার গ্রুপগুলোর কাছে আমরা পরিচালকরা জিম্মি? এদেরকে টাকা দিলেই কিংবা এরা লিখলেই কি সিনেমা হিট হয়ে যাবে? তাহলে টাকা পেলে তো এরা তাদের মা-কেও বেঁচে দেবে, যদি এমন হয়? এদের কাছ থেকে আমরা কি আশা করতে পারি? এরা যাদের কাজ বা যাদের নিয়ে লেখে তার মানে তারা এদেরকে টাকা দেয়! এখন থেকে ওরা যা লিখবে তার উল্টোটা ভাবতে হবে তাহলে।’

এ বিষয়ে তিনি একটি স্ট্যাটাসও দিয়েছেন আজ। যেখানে লিখেছেন, ‘তার মানে শুধু টাকা দিতে পারিনি বলে সিনেমার রিভিউ করলেন না সিনেমা প্রেমিক সৈয়দ নাজমুস সাকিব। আপনাদের বাংলা সিনেমার প্রতি এই দরদ টা মনে থাকবে ভাই। কি মনে হয়, আপনারা না লিখলে সিনেমা চলবে না? কিংবা টাকা না দিলে পোলাপান দিয়ে নেগেটিভ রিভিউ করাবেন? দিন বদলে গেছে ভাই। আটকাতে পারবেন না। পদ্মাপুরান ঢাকার বাইরে যাচ্ছে, বাংলা সিনেমায় সুদিন ফিরছে,ইন্ডিয়ান সিনেমা বাজী হল থেকে নেমে যাচ্ছে,উঠছে পদ্মাপুরান,বাংলা সিনেমা,বাংলাদেশের সিনেমা।’

সেই স্ট্যাটাসের নিচে অভিযুক্ত সৈয়দ নাজমুস সাকিব আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‌‘আপনি কোন যুক্তিতে এই আলাপ করলেন? একটা প্রমাণ দেখাতে পারবেন যে আমি টাকা চাইসি আপনার কাছে বা কারো কাছে লেখার জন্য? আপনার সিনেমার ইংরেজি সাবটাইটেল করার জন্য আমাকে দিলেন, নিজের ব্যক্তিগত ব্যস্ততার জন্য আমি সেটা করতে পারিনি, এরপরেও আমি আমার এক ছোট ভাইকে দিয়ে করালাম। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আপনার সিনেমাটা আমার ভাল্লাগে নাই। সেজন্য আমি কিছুই বলিনি। বললে শেষে আপনারাই বলেন- আপনাদের মত লেখকদের জন্য আমাদের সিনেমার উন্নতি হয় না। এত ভুল ধরেন কেন? আর সব ঠ্যাকা আমাকেই কেন নিতে হবে? সব কেন আমাকেই লিখতে হবে? আমার জীবন নাই? আপনার সিনেমা ভাল হলে আমি না লিখলে খারাপ হয়ে যাবে? এও সম্ভব? কনফিডেন্স নাই আপনার নিজের সিনেমার উপরে? লাস্ট অনেকদিন আমি দেশি কন্টেন্ট নিয়ে একদম লিখি না আপনাদের এরকম আচরণের জন্য। চন্দ্রাবতী কথা ভাল লেগেছিল, তাই নিজের তাগিদেই লিখেছি। ডিরেক্টরকে জিজ্ঞাসা করে দেইখেন কোন টাকা নিয়েছি কিনা। শুধু টাকার জন্য কাজ করলে, সিনেমার জন্য প্যাশন না করলে নিজের প্ল্যাটফর্ম সিনেগল্প থেকে আলাদা করে কন্টেন্ট বানাতাম না আপনার সিনেমার প্রসূন আজাদ আর সুমিত সেনগুপ্তকে নিয়ে। এখনও পেজে আছে সেটা। নিজের পেজ থেকে আপনার সিনেমার পোস্টার আর ট্রেলার শেয়ার দিতাম না যদি শুধু টাকার কথা ভাবতাম। চমৎকার প্রতিদান দিলেন ভালোবাসার।’

রাশিদ পলাশ আরও অভিযোগ করেন নাটকের গ্রুপগুলোতেও সিনেমা নিয়ে লেখালেখি হয়। কিন্তু তার ‘পদ্মাপুরাণ’ মুক্তির পর সেটি হয়নি। কারণ কি জানতে চাইলে ফেসবুকে জনপ্রিয় নাটকের একটি গ্রুপের অ্যাডমিন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই গ্রুপে সাধারণত নাটক নিয়েই লেখা হয়। তবে নাটকের কোনো তারকার সিনেমা হলে সেই সিনেমা নিয়েও লেখা হয়। কিন্তু ‘পদ্মাপুরাণ’ সিনেমায় তেমন কেউ নেই।

অথচ ‘পদ্মাপুরাণ’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন বহু নাটকের অভিনেত্রী প্রসূন আজাদ ও অভিনেতা সুমিত। এ বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি আর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। সেইসঙ্গে দেশীয় একটি প্লাটফর্মের কাজ নিয়ে
নিয়মিত মাতামাতি হয়, গ্রুপ সদস্যদের এমন অভিযোগের ব্যাপারে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলেন না ওই অ্যাডমিন।

গ্রুপ চালান এমন অনেকে আবার পাল্টা অভিযোগ ছুঁড়ে বলেন, ‘এমন অনেকে তো আছে যারা নিজেদের প্রচার ও নাটক-সিনেমার পজিটিভ রিভিউয়ের জন্য গ্রুপের সদস্যদের টাকা দিতে চান। নানা রকম উপহার দিতে চান। আমরা সেগুলো এড়িয়ে চলি। কারণ এসব নেয়ার মানে হলো ওই নির্মাতা বা শিল্পীর কাছে বিক্রি হওয়া। তার মতো করে লেখালেখি করা। এটা তো আমরা করবো না।’

জনপ্রিয় নির্মাতা শিহাব শাহীনও এই অভিযোগ নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব গ্রুপ বা পেইজগুলো যারা চালায়, তাদের যোগ্যতা কি? তারা নাটক-সিনেমা সম্পর্কে কতটুকু জ্ঞান রাখে? এরা তো ক্রিটিকস না। এরা সিনেমার ফিলোসফি সম্পর্কে কতটুকু জানে? সাহসই বা পায় কি করে কোনো পরিচালক বা শিল্পীকে নিয়ে কোনো কিছু বলার বা লিখার? এরা তো অযোগ্য। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এরা গ্রুপ চালায়, সাধারণ দর্শক। দেশের নাটক সিনেম নিয়ে লিখবে। ভালো হলে ভালো, মন্দ হলে সমালোচনা করে ভুল ধরিয়ে দেবে। কিন্তু চাঁদাবাজি, জিম্মি করার প্র্যাকটিস কেন করছে? এদের বিরুদ্ধে সবার সতর্ক হওয়া উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরকম অনেক গ্রুপই আছে কিন্তু সবাই একরকম না। কেউ কেউ নিউট্রাল জায়গায় থেকে ভালটাকে ভালো এবংমন্দটাকে মন্দই বলেন। তবে এদের মধ্যে সবাই না, কিছু গ্রুপ কিংবা সদস্য আছে যারা এসব বাজে কর্মকাণ্ডগুলো করে থাকে। অল্পদের জন্য চমৎকার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলো আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

আমার ‘মরীচিকা’ কন্টেন্ট রিলিজের সময় দুইটা গ্রুপ থেকে আমার কাছে কয়েকজন টাকা চায়। আমি তাদেরকে কোনো টাকা দেইনি, এজন্য অনেকে আমাকে দেখতে পারে না। আমার কোনো কাজ নিয়ে তারা লিখে না, লিখলেও সেটা নেগেটিভ। এদের লেখার উপর তো আর একজন শিহাব শাহীন তৈরি হয়নি। আমি কাকে নিয়ে কাজ করবো নাকি না; কিংবা কি বানাবো? আমি তো সেসব গ্রুপ, পেইজের ধারে কাছেও নেই। এরা একটা চক্র। এই বাজে চক্রদের মুখোশ উন্মোচন জরুরী।’

আরেক জনপ্রিয় নাট্য নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহও জানালেন গ্রুপের সিন্ডিকেটের খপ্পরে বাজে অভিজ্ঞতার কথা। বলেন, ‘এসব তো অনেক দিন ধরেই হয়ে আসছে। এরা হচ্ছে কারো কারো জন্য চাঁদাবাজ। আমার কাছে কোনো সময় কেউ টাকা পয়সা চাওয়ার সাহস করতে পারেনি। আমার কোনো কাজকে এরা মূল্যায়ন করে না। আমাকে নিয়ে কিংবা আমার কাজকে নিয়ে কেউ কোনো পজেটিভ লিখলে সেগুলো অনেক সময়ই এপ্রুভ হয় না। অনেকেই এগুলো আমাকে জানিয়েছেন। এখন আমার কথা হলো, এদের পরিচয় কি? এরা আমাকে কিংবা আমার কাজকে মূল্যায়ন করার কি যোগ্যতা রাখে? এরা লিখলে কি হবে আর না লিখলেই কি হবে?

আমার একটা প্রশ্ন, কোনো পরিচালক, প্রযোজক কিংবা শিল্পীর লক্ষ্য কি এটা হওয়া উচিত? যে, আমাকে নিয়ে অমুক তমুক লিখুক। এটা তো রুচির প্রশ্ন, শিক্ষার প্রশ্ন! অযোগ্যদের একটা পোস্টের ওপর যদি কারো মূল্যায়ন নির্ভর করে তাহলে সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

আরও একটা বিষয় বলতে চাই সেটা হলো, এই যে বিভিন্ন পোস্টে শিল্পী এবং পরিচালকসহ অনেককে কিছু মানুষ হেয় করে তুলে ধরেন, তাদেরকে মানুষের কাছে নিচু করে উপস্থাপন করেন; এগুলো কতটা যৌক্তিক? এটা আমার মানবিক প্রশ্ন তাদের প্রত্যেকের কাছে। যাদেরকে ছোট করে, নিন্দা করে, ব্যঙ্গ করে নানারকম পোস্ট করে এদের কি মানবতা নেই? এদের কি একবারও মনে হয় না যে, যাকে নিয়ে এত বাজেভাবে লিখছে; তার ভিতর দিয়ে কি যাচ্ছে? কিংবা তার পরিবারের মধ্যে কি অতিবাহিত হচ্ছে?’

এদিকে নানা শিল্পী, পরিচালক ও সাধারণ দর্শকের আরও অনেক অভিযোগ এসেছে প্রায় সবগুলো গ্রুপ থেকে। সাধারণত গ্রুপের অ্যাডমিনরা চাঁদা দাবি করেন নাটক ও সিনেমার প্রচারের স্বার্থে। ফেসবুকে যার যতো
বেশি ফলোয়ার তার ডিমান্ড হয় ততবেশি। কখনো কখনো গ্রুপের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রচারের জন্য টাকা দাবি করেন অনেকে।

এই সিন্ডিকেটের খপ্পরে পা দিচ্ছেনও অনেকে। বিশেষ করে শোবিজের পড়তি ও উঠতি তারকারা আলোচনায় থাকতে টাকাসহ নানা উপঢৌকন দিয়ে থাকেন ওইসব অ্যাডমিন ও ফেসবুকে নাটক-সিনেমার প্রচার করা ফেসবুক ব্যবহারকারীকে। অনেকের সঙ্গে বনিবনা না হওয়া থেকে সম্পর্কও খারাপ হয়। তখন সেই শিল্পী বা পরিচালকদের নামে নেতিবাচক লেখা, রিভিউ পোস্ট করা হয়।

অনেকে নজরে এনেছেন এইসব ফেসবুকের এসব গ্রপ সদস্যদের রাতারাতি বদলে যাওয়া জীবন যাপনের দিকেও। এদের ব্যাপারে আইনিভাবে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলেও মনে করছেন অনেকে।

এলএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]