যেখানে মৃতদের কাঁধে তুলে নাচা হয়

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:১৭ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

 

পৃথিবীর সবাই মৃত্যুবরণ করবে-এটি এক চূড়ান্ত সত্য। বিভিন্ন ধর্ম এই সত্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ এবং জৈন সম্প্রদায় কর্মের ওপর ভিত্তি করে পুনর্জন্মে বিশ্বাস রাখে, আর খ্রিস্টান, মুসলিম ও ইহুদিরা মৃত্যুর পর পরকালে চূড়ান্ত বিচার, পুনরুত্থান এবং স্বর্গে অনন্তজীবনের ধারণা রাখে।

সবার কাছে মৃত্যু মানেই দুঃখ এবং প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা। তবুও অবাক করার বিষয় হলো, কিছু সম্প্রদায়ের কাছে মৃত্যু কখনও কখনও একটি উৎসবের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়। হ্যা, সত্যিই এমন ঘটনা ঘটে। মৃতদেহকে কেন্দ্র করে আফ্রিকায় নানা ধরনের লোকাচার প্রচলিত আছে। তেমনি একটি অনন্য রীতি মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগণের মধ্যে দেখা যায়, যেখানে তারা মৃতদের সাথে নাচ-গান করে মৃত্যুকে স্মরণ ও উদযাপন করে।

drty

মাদাগাস্কারের অদ্ভুত রীতি
মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগণ বিশ্বাস করে, মৃত্যু কেবল শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন, আত্মা এখনও পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে উদ্ভূত হয়েছে তাদের অনন্য উৎসব ‘ফামাদিহানা’, যা মালাগাসি ভাষায় ‘হাড় ঘুরিয়ে দেওয়া’, ‘মৃতদের সাথে নাচানো’ বা ‘শরীর ঘুরিয়ে দেওয়া’ বোঝায়।

উৎসবে মৃতদের কফিন খোলা হয় এবং পরিবারের সদস্যরা তাদের সঙ্গে নাচ-গান করে আনন্দ উদযাপন করে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে, তারা মাটির নিচ থেকে পরিবারের আত্মীয়দের মৃতদেহ তুলে নিয়ে আসে এবং কাঁধে বা বাহন করে পুরো এলাকা পরিক্রমা করে নাচ-গান করে। তারা বিশ্বাস করে, পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত পূর্বপুরুষরা বিরক্ত হতে পারে। তাই মাঝে মাঝে কফিন খোলা হয়, মৃতদেহগুলোকে কাফনে মুড়িয়ে রাখা হয়।

ftg

উৎসবের প্রস্তুতি ও আয়োজন
ফামাদিহানার আয়োজন প্রায় এক বছর আগে থেকেই শুরু হয়। উদযাপন চলে প্রায় এক সপ্তাহ, যার মধ্যে নাচ, গান এবং খাওয়া-দাওয়া থাকে। সাধারণত এটি জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পালিত হয়, কারণ এই সময় মাদাগাস্কার দ্বীপে শীত থাকে।

পরিবারের প্রায় সব সদস্য একত্রিত হয়। কোনো পরিবারের সদস্য সংখ্যা দু’শো ছাড়িয়ে গেলে সাত দিনের খাওয়া-দাওয়ায় যথেষ্ট ব্যয় হয়। মৃত ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকীর উপর ভিত্তি করে তারিখ নির্বাচন করা হয় না। বরং পরিবারের বড়রা জ্যোতিষী ও স্বপ্নের মাধ্যমে তারিখ ঠিক করেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে পায়ে হেঁটে উৎসবে যোগ দিতে আসে বাকি সদস্যরাও। এটি প্রতি ৫-৭ বছর অন্তর পালিত একটি উৎসব।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক রীতি
মাদাগাস্কারের মানুষ তাদের পরিবারের জন্য সাধারণত দুই ধরনের কবর খনন করে-একটি নারীদের জন্য, অন্যটি পুরুষদের জন্য। শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে এই কঠোর নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়। কবরের আকার, জাঁকজমক ও ব্যয় পরিবারটির সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বসতবাড়ির চেয়ে পারিবারিক কবরেই বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়।

frt

ফামাদিহানা উৎসবের সময় মৃতদের জন্য নানা ধরনের উপহার আনা হয়। আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং আয়োজক পরিবারের প্রতি সৌজন্যসূচক উপহার প্রদান করেন। উৎসবজুড়ে প্রচুর মদ্যপানও একটি পরিচিত চিত্র। যারা কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আনেন, তাদের হাতে থাকে আফ্রিকান রামের বোতল। আবার যারা মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে নাচ-গান করেন, তারাও আগে ইচ্ছেমতো মদ্যপান করেন।

পরিবারের প্রধান কর্তা পশু উৎসর্গ করেন। সেই উৎসর্গীকৃত পশুর মাংস দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় এবং অতিরিক্ত অংশ স্থানীয় দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মৃতদেহ বহনের জন্য যে পাটাতন ব্যবহার করা হয়, সেটিও সমাবেশে অংশ নেওয়া সবাই স্পর্শ করেন। সবশেষে আয়োজক পরিবার এটি নিজেদের বাড়িতে রেখে দেন এই বিশ্বাসে যে, এটি পরিবারের জন্য সৌভাগ্য ও কল্যাণ বয়ে আনবে।

ftyu

এই উৎসবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একত্রে উদযাপন করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কেউ যদি এই অনুষ্ঠানে পরিবারের সঙ্গে অংশ না নেয় বা উদযাপন থেকে নিজেকে দূরে রাখে, তবে সেটিকে অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আধুনিক প্রেক্ষাপট
আঠারো শতকের পর থেকে ফামাদিহানা প্রথার প্রচলন শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও এর নির্দিষ্ট শুরুর সময় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। বহু বছর ধরে এই আচার মাদাগাস্কারের মালাগাসি জনগণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

dfty

বর্তমান সময়ও বিপুল সংখ্যক মানুষ ফামাদিহানা পালন করে থাকলেও ধীরে ধীরে এই প্রথার পরিসর কমে আসছে। এর পেছনে প্রধান দুটি কারণ রয়েছে- প্রথমত, কয়েকটি খ্রিস্টান সংগঠনের পক্ষ থেকে এই আচারকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, উৎসব আয়োজনের ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক কারণে এটি নিয়মিত পালন করতে পারছে না।

তবু মালাগাসি সমাজে ফামাদিহানার গুরুত্ব আজও অস্বীকার করা যায় না। এটি কেবল মৃতদের স্মরণ করার একটি রীতি নয়, বরং পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা, পারিবারিক বন্ধন এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক অনন্য প্রকাশ।

সূত্র: এনডিটিভি

আরও পড়ুন:
স্পেনের হবু রানি লিওনর সম্পর্কে কতটা জানেন? 
ইরানের শেষ রানির মুকুট রাজকীয় ঐতিহ্যের এক নিদর্শন 

এসএকেওয়াই/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।