জালভোট দেওয়ার শাস্তি কী জানেন?
ভোট নাগরিকের সবচেয়ে শক্তিশালী অধিকার। একটি সিল বা বোতাম চাপের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলা। কিন্তু সেই ভোট যদি প্রকৃত ভোটারের না হয়ে অন্য কারো হয়ে পড়ে, কিংবা জোর করে দেওয়া হয় তখনই জন্ম নেয় এক ভয়ংকর বাস্তবতা, যার নাম জালভোট। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে এই শব্দটি বহুবার আলোচনায় এসেছে, বিতর্ক তৈরি করেছে, প্রশ্ন তুলেছে গণতন্ত্রের ভিত্তি নিয়েই।
জালভোট কী?
জালভোট বলতে বোঝায় এমন ভোট, যা প্রকৃত ভোটার নিজে স্বেচ্ছায় দেননি। এটি হতে পারে-অন্য কেউ ভোটারের নাম ব্যবহার করে ভোট দিয়ে দেওয়া। ভোটার উপস্থিত না থাকলেও ব্যালট বা ইভিএমে ভোট পড়ে যাওয়া। ভয়ভীতি বা জোর করে কাউকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা। কিংবা এক ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দেওয়া। সহজ কথায়, যেখানে ভোটারের স্বাধীন ইচ্ছা অনুপস্থিত, সেখানেই জালভোটের অস্তিত্ব।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে জালভোটের অভিযোগ নানা রূপে এসেছে। অনেক সময় ভোটার কেন্দ্রে না এলেও তার নামে ভোট পড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ভোরের দিকেই অনেক কেন্দ্রে “ভোট শেষ” এমন অভিযোগ শোনা যায়।
কিছু ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক পক্ষ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে ঢুকতেই পারেন না, তাদের আগেই বিপুলসংখ্যক ভোট দেওয়া হয়ে যায়। ভোট দিতে গেলে হামলা, হুমকি বা সামাজিক চাপে অনেকেই ভোট দিতে যান না। এতে প্রকৃত ভোটারের অনুপস্থিতির সুযোগে জালভোট সহজ হয়। আবার মৃত ব্যক্তির ভোটও দিয়ে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে বহুবার। ভোটকেন্দ্রে বিরোধী দলের এজেন্ট বা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক না থাকলে জালভোটের অভিযোগ বেশি উঠে আসে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জালভোটের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নির্বাচন মানেই জালভোট বিতর্ক এমন একটি ধারণা সমাজে গড়ে ওঠে। কিছু নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আবার কোথাও কোথাও ভোট শুরুর আগেই অধিকাংশ ভোট পড়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ শুধু বিরোধী দলের মুখে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচন নিয়ে অনাস্থা তৈরি করেছে।
ভাবছেন জালভোট হলে কি সমস্যা হবে? জালভোটের প্রভাব কিন্তু পড়ে আপনার আমার, সমাজ, রাষ্ট্রের সবক্ষেত্রে। জালভোট শুধু একটি নির্বাচনী অনিয়ম নয়, এর প্রভাব অনেক গভীর। এতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়: প্রকৃত ভোটের প্রতিফলন না ঘটলে জনগণের শাসনের ধারণা ভেঙে পড়ে। ভোটার আগ্রহ কমে যায়: মানুষ বিশ্বাস হারালে ভোট দিতে চায় না। রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে: জালভোটের অভিযোগ থেকেই সংঘর্ষ, সহিংসতার জন্ম হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে
তবে জালভোট রোধে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভুয়া ভোটার ঠেকাতে ছবি ও তথ্যসহ ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ইভিএম চালু করা হয়েছে। কাগজের ব্যালটের বদলে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন চালু করা হয়, যাতে একাধিকবার ভোট দেওয়া কঠিন হয়।
জালভোট দেওয়ার আইন ও শাস্তি সম্পর্কে জানেন কি?
নির্বাচনী আইনে জালভোটকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তি বা আইন থাকলেই যথেষ্ট নয় মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ৭৩ থেকে ৮৭ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত অংশে ভোটকেন্দ্র এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শাস্তি বর্ণনা করা আছে।
ভোটকেন্দ্রে বেআইনি আচরণ ও অপরাধের জন্য নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে অনধিকার প্রবেশের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। ভোটের মাঠে দায়িত্বরত নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম অপরাধ বিবেচনা করে শাস্তির বিধান নিশ্চিত করবেন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, (১) যদি কোনো ব্যক্তি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্বাচনে সুবিধা প্রদান বা বাধাগ্রস্ত করিবার উদ্দেশ্যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তির সাহায্য গ্রহণ বা প্ররোচিত করেন বা সাহায্য গ্রহণ বা প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন।
(২) ভোট দেওয়ার যোগ্য নন বা অযোগ্য জানা সত্ত্বেও কোনো নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন বা ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট পেপার চান।
(৩) একই ভোটকেন্দ্রে একাধিকবার ভোট প্রদান করেন বা ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট পেপার চান।
(৪) একই নির্বাচনে একাধিক ভোট কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন বা ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট পেপার চান। (৫) ভোট চলাকালে কোনো ভোটকেন্দ্র হতে ব্যালট পেপার সরিয়ে ফেলেন।
অথবা (৬) জ্ঞাতসারে এসব কাজ করার জন্য কোনো ব্যক্তিকে প্ররোচিত করেন বা তার সাহায্য চান-তাহলে তিনি বেআইনি কাজের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন এবং তিনি সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডে ও অর্থদন্ডে দণ্ডিত হবেন।
ভোটার হিসেবে আপনার ভূমিকা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জালভোট ঠেকাতে শুধু রাষ্ট্র বা নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। ভোটারদের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া, অনিয়ম দেখলে প্রতিবাদ করা, ভোটাধিকার নিয়ে সচেতন থাকা। এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জালভোট আসলে শুধু ভোট চুরির ঘটনা নয়, এটি মানুষের কণ্ঠ চুরির নাম। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার শর্ত। জালভোটের অভিযোগ যত দিন থাকবে, তত দিন প্রশ্ন উঠবে ভোটের ফল কার, জনগণের না ক্ষমতার?
আরও পড়ুন
ইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তি
ভোটার আইডি কার্ড অনলাইন কপি ডাউনলোড করবেন যেভাবে
কেএসকে