আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
জেন-জির একুশের চেতনা
৫২’র সেই উত্তাল ফেব্রুয়ারি কেবল ইতিহাস নয়, বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদের অবিনাশী বীজমন্ত্র। আজকের দিনে দাঁড়িয়েও ‘একুশ’ আমাদের শিখিয়ে যাচ্ছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার চিরন্তন দর্শন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাবনায় উঠে এসেছে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার এবং প্রযুক্তির যুগে শিকড়কে আঁকড়ে ধরার নতুন অঙ্গীকার। রবিউল ইসলাম শাকিল তুলে ধরেছেন এই প্রজন্মের তরুণদের অর্থাৎ জেন-জির একুশের চেতনা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে ভাবনা-
ভাষার বিকৃতি রুখে দিই, শুদ্ধ বাংলার প্রদীপ জ্বালি
নাজমুস সাদায়াত সিফাত
ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, ২য় বর্ষ
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের জাতীয় চেতনার এক অনন্য অধ্যায়। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে অকুতোভয় শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার। যা শুধু মুখের ভাষা নয়, আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু যে ভাষার জন্য প্রাণ দিলো রফিক, শফিক, সালাম, বরকত-বিশ্বায়ন ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে আমরা কি আদৌ তার মূল্যায়ন করতে পারছি! পৃথিবীতে ভাষার জন্ম কীভাবে হয় তা কেউ জানে না। কিন্তু এর মৃত্যু কীভাবে হয় তা সবাই জানে। দৈনন্দিন জীবনে শুদ্ধ, প্রমিত ও নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা চর্চা মাধ্যমে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। অন্যথায় একদিন আমরা হয়তো নিজের অজান্তেই হারিয়ে ফেলবো স্বকীয়তা!
একুশ মানে মাথা নত না করা
সুচরিতা সূচনা
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ৪র্থ বর্ষ
ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে কেবল একটি মাস নয় এটি স্মৃতি, সংগ্রাম ও স্বপ্নের সমবায়। এটি ভাষার মর্যাদা রক্ষায় মানুষের অদম্য সাহসের প্রতীক। একুশ আমাদের শিখিয়েছে ভাষা মানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, তখন ছাত্রসমাজ বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল। সেই সাহসের পথ ধরেই জন্ম নেয় জাতীয় চেতনার , যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার আন্দোলনকে ত্বরান্তিত করে। ফেব্রুয়ারি মানেই শহীদ মিনারে অর্পিত ফুল, প্রভাতফেরির গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ একটি গানের চেয়ে বেশি, একটি অঙ্গীকার। কিন্তু একুশের আসল শক্তি কেবল স্মরণে নয়, চর্চায়।
রক্তরাঙা বর্ণমালার মিছিলেই জন্মেছিল এক স্বাধীন মানচিত্রের স্বপ্ন
মিশকাতুল জান্নাত সাবা,
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি, ১ম বর্ষ
আমার চোখে একুশে ফেব্রুয়ারি হলো সেই মুহূর্ত, যখন একগুচ্ছ বর্ণমালার দাবিতে একটি শোষিত জাতির সুপ্ত জাতীয়তাবাদ প্রথমবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়েছিল। ১৯৫২-র সেই উত্তাল রাজপথেই মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রের বীজ বপন করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি অনুভব করি, একুশের সেই জাতীয়তাবোধ কেবল অতীত ইতিহাস নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করার এক চিরন্তন রাজনৈতিক দর্শন। সেই লড়াকু চেতনা আজও আমাদের ধমনিতে স্পন্দিত হয়, যা আমাদের শিখিয়েছে ভাষার মর্যাদা আর ভৌগোলিক স্বাধীনতা আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
মায়ের ভাষায় কথা হোক সবার, একুশ কাটুক বৈষম্যের আধার
সাইম আল রাফি
পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, ১ম বর্ষ
১৯৫২ সালের সেই অবিনাশী আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে স্বাধিকার আদায়ে আপসহীন থাকার অদম্য মন্ত্র। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তারুণ্যের অন্যতম প্রধান দর্শন হওয়া উচিত বিপন্ন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার সুরক্ষা এবং বিলুপ্তি রোধে সক্রিয় হওয়া। আমি বিশ্বাস করি, মাতৃভাষার প্রতি টান আমাদের সংকীর্ণ করে না, বরং উদার ও বিশ্বজনীন হতে শেখায়। নিজ ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি পৃথিবীর প্রতিটি অনন্য ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই হলো ‘একুশে’র প্রকৃত আন্তর্জাতিক রূপ। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠুক এমন এক বহুভাষিক ও বৈষম্যহীন পৃথিবী, যেখানে প্রতিটি কণ্ঠস্বর তার নিজস্ব ভাষায় সগৌরবে ধ্বনিত হবে।
ফেব্রুয়ারি ছাপিয়ে ভাষার শুদ্ধ চর্চা হোক বছরজুড়ে
আয়শা সিদ্দিকা
নৃবিজ্ঞান, ১ম বর্ষ
আমার কাছে একুশ মানে কেবল পঞ্জিকার একটি লাল তারিখ কিংবা ভোরে খালি পায়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ নয়; একুশ আমার অস্তিত্বের প্রতিদিনকার স্পন্দন। ২০২৬ সালের এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে আমি বিশ্বাস করি, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কেবল ফেব্রুয়ারি মাসের সাময়িক আবেগে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমরা যারা ছাত্রসমাজ, আমাদের কাঁধেই বর্তায় এই ভাষার মর্যাদা রক্ষার গুরুভার। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় আমরা ফেব্রুয়ারি মাস গেলেই ভাষার শুদ্ধতার কথা ভুলে যাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল বানানে লেখা কিংবা অপ্রাসঙ্গিক বিদেশি শব্দের মিশ্রণে বাংলাকে বিকৃত করা এখন অনেকের কাছে অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ৫২’র সেই উত্তাল দিনগুলোতে আমাদের পূর্বসূরিরা রক্ত দিয়েছিলেন যেন আমরা বুক ফুলিয়ে বাংলায় কথা বলতে পারি এবং শুদ্ধভাবে লিখতে পারি।
ভাষার চর্চা হোক বছরের প্রতিটি দিন। শ্রেণিকক্ষের পাঠ থেকে শুরু করে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা কিংবা অন্তর্জাল দুনিয়ায় নিজের মতামত প্রকাশ সবখানেই যেন বাংলার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ অটুট থাকে। অন্য ভাষা শিখতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু নিজের মায়ের ভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়। ২০২৬ সালের এই বাংলাদেশে আমরা যেন আমাদের প্রাণের বর্ণমালাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি স্তরে এবং আমাদের প্রাত্যহিক যাপনে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে পারি, এটাই হোক এবারের একুশের শপথ।
আরও পড়ুন
বাংলার নৃশংস গণহত্যার ইতিহাস জানেন কি?
সামাজিক মাধ্যমে বাংলা ভাষার বিকৃতি নিয়ে কি ভাবছেন তরুণরা?
কেএসকে