৭ মার্চ ভাষণ: রচিত হয় স্বাধীনতার পটভূমি

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৪১ এএম, ০৭ মার্চ ২০২৬
৭ মার্চ ১৯৭১, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন

নাহিদ হোসাইন
‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ বজ্রকণ্ঠে এই বাক্যগুলো উচ্চারণ হয়েছিল সেদিন। যা শুনতে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান) জড়ো হয়েছিলেন লাখ লাখ বাঙালি। বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।

আঠারো মিনিট স্থায়ী এ ভাষণে তিনি নির্যাতিত বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারই আহ্বানে নিরস্ত্র বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর। তাই এ ভাষণের যেমন ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে; তেমনই রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

ছোটবেলা থেকে এই ভাষণ শুনেই বড় হয়েছি। প্রতিবছর আজকের এই দিনে প্রথম প্রহর থেকে মাইকে বাজানো হয় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি। যে ভাষণ শুনে জেগে উঠেছিল সেদিন সাত কোটি মানুষ। ৭ মার্চ ইতিহাসের একটি অনন্য দিন। ৫৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ কণ্ঠে উজ্জীবিত হয়েছিল রেসকোর্স ময়দানের লাখো মানুষ।

আরও পড়ুন
যেভাবে অর্জিত হলো বাংলা ভাষা

৩ মার্চ পল্টনের ছাত্রসমাবেশে ঘোষণার পর জাতির জীবনে ৭ মার্চ আসে রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমি থেকে। বেলা ১১টা থেকে রেসকোর্স ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রিকশা, বাস, পায়ে হেঁটে, যে যেভাবে পেরেছে, সেভাবেই অংশ নিল সেদিন। জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ গাছের ওপরে উঠে পড়েছিল।

বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, সামরিক আইন প্রত্যাহার, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অত্যাচার-হত্যার কথা উল্লেখ করে ইয়াহিয়ার ডাকা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য চারটি শর্ত দেন। ১. সামরিক আইন তুলে নিতে হবে। ২. সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ৩. নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণের তদন্ত করতে হবে। ৪. জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

শর্তগুলো একদিকে যেমন ছিল অধিকার আদায়ের, অন্যদিকে ছিল পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ। ভাষণটি শোনার সময় খেয়াল করেছি, তার প্রতিটি শব্দচয়ন, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা, শরীরী ভাষা, বাচনভঙ্গি সবকিছুই ছিল গোছানো, অভিনব। পুরো ভাষণে একবারের জন্যও মনোযোগ হারাইনি।

বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি যখন বললেন, ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ তখন সবার রক্তে তখন জেগে ওঠে স্বাধীনতার নেশা। সেসময় মাঠজুড়ে ছিল নীরবতা, লাখো মানুষ একাগ্রচিত্তে শুনেছিল প্রতিটি শব্দ। ৭ মার্চের ভাষণ যে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিল, সেই আলোর পথে বীর বাঙালি পৌঁছেছে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে।

একদিকে তিনি উল্লেখ করেছেন, ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, ছয় দফা, ’৭০-এর নির্বাচন, স্বাধীনতাকামী মানুষের কথা। অন্যদিকে যুদ্ধ করার কৌশলও শিখিয়ে দিয়েছেন এভাবে, ‘তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’

আরও পড়ুন
বাংলার নৃশংস গণহত্যার ইতিহাস জানেন কি?

৭ মার্চের ভাষণটির তুলনা করা যায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পিটস, মার্টিন লুথার কিংয়ের ভাষণের সঙ্গে। আর আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণের সঙ্গে। আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে যখন ভাষণ দিয়েছিলেন, তখন গেটিসবার্গ ও তার আশপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না, যতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল সেদিনের ৭ মার্চের ভাষণ। একপ্রকার বলা যায়, শত্রুর এলাকায় বসে জনগণকে আহ্বান করেছিলেন শুত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার। কতটা সাহস, তেজোদীপ্ত মনোভাব, দৃঢ়চেতা হলে এই কাজ করা যায়; এখন হয়তো তা কল্পনা করা যায় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ যেন একই পথের পথিক। ১৯৭১ সালের এপ্রিল নিউজ উইক ম্যাগাজিন তাদের কভার স্টোরিতে বঙ্গবন্ধুকে ‘পোয়েট অব পলিটিকস’ বলে আখ্যায়িত করে। সেই ১৯ মিনিটের ভাষণে প্রকাশ পায় বঙ্গবন্ধুর সৃজনশীলতা, সবাইকে জাগিয়ে তোলার এক জাদুকরি মন্ত্র।

৭ কোটি মানুষকে এক করতে ৭ মার্চের ভাষণ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সেদিন তার ভাষণের মতোই পরে ৭ কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাখা যায়নি, বীর বাঙালি ছিনিয়ে এনেছেন স্বপ্নের স্বাধীনতা। ৭ মার্চের বলিষ্ঠ কণ্ঠের ভাষণ আজো অনুপ্রেরণা জোগায়। স্বাধীনতার পটভূমি হয়ে দাঁড়ায় এই ভাষণ।

লেখক: শিক্ষক, ব্লু বার্ড স্কুল

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।