পরিবার ছাড়া যেমন কাটছে প্রবাসীদের ঈদ
একমাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিম উম্মাহ আনন্দ ও উৎসবের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে বইছে ঈদের আমেজ। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সবাই যখন ব্যস্ত, তখন প্রবাসীদের জন্য এই সময়টি অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে এক নীরব বেদনার গল্প। এই বিশেষ দিনে ‘পরিবার ছাড়া যেমন কাটছে প্রবাসীদের ঈদ’- আয়োজনের মাধ্যমে তা তুলে ধরেছেন মোহাম্মদ সোহেল রানা।
পরিবার ছাড়া ঈদ করা সত্যিই অনেক কঠিন
দেলোয়ার হোসেন সাগর দীর্ঘ আট বছর ধরে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে থাকেন। জীবিকার তাগিদে তিনি সেখানে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন। প্রবাস জীবনের এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি মাত্র একবার পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সুযোগ পেয়েছেন—যা তার স্মৃতিতে আজও গভীরভাবে গেঁথে আছে।
তিনি বলেন, পরিবার ছাড়া ঈদ উদযাপন করা সত্যিই অনেক কঠিন। ঈদ এলেই দেশের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। চারদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সেই আনন্দ যেন প্রবাসে এসে অনেকটাই থেমে যায়। খুব ইচ্ছে করে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের জন্য নিজের হাতে কেনাকাটা করা এবং ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া। ঈদের দিনগুলোতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করা, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া, কিংবা গ্রামীণ মেলায় ঘুরে বেড়ানো—এসব আনন্দের মুহূর্ত আজও ভীষণ মনে পড়ে। বিশেষ করে ঈদের সময় পুরো এলাকায় আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিচিত মানুষদের আগমন—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হতো, যা প্রবাসে থেকে আমি খুব বেশি মিস করি।
এই প্রবাসী আরও বলেন, প্রবাসে ঈদের প্রকৃত আনন্দ যেন কোথাও হারিয়ে যায়। ঈদের নামাজ পড়ে দিনটা একেবারেই সাধারণ দিনের মতো কাটে। অনেক সময় মনে হয়ই না যে আজ ঈদ। অফিস খোলা থাকলে কেউ কাজে চলে যান, কেউ আবার রুমে বসে বা শুয়ে সময় কাটান। অনেকেই পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে নিজেকে খুশি রাখার চেষ্টা করেন।
- আরও পড়ুন
ঈদ ভাবনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপনের বিচিত্র রীতি
গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে চায়ের আড্ডা ভীষণ মিস করি
শোয়েব হোসেন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জামালপুরে সাংবাদিকতা করেছেন, তার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় দশ বছর কেটেছে যমুনা নিউজের সঙ্গে। এখন তিনি প্রবাসে, পর্তুগালের লিসবন শহরে নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। তিনি বলেন, ঈদ তো সবসময়ই আনন্দের—সেটা দেশেই হোক বা প্রবাসে। তবে এই আনন্দের গভীরতা একরকম থাকে না। পরিবার-পরিজনকে ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন একটু ফিকে হয়ে যায়। প্রবাসে থাকা মানুষগুলো ঈদের নামাজ শেষে একসঙ্গে মিলিত হন, গল্প আর আড্ডায় ভাগ করে নেন নিজেদের আনন্দ।
অনেকেই আবার কর্মস্থল থেকে ঈদের ছুটি পান না। কাজ শেষে তারাও যোগ দেন সেই আড্ডায়। দিনের বড় একটা সময় কাটে রান্না করে, আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে। শোয়েব বলেন, মিস করি বাবা আর ছেলেকে নিয়ে তিন প্রজন্মের একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়া। মিস করি মায়ের হাতের সেই মজার রান্না।
দীর্ঘদিন টেলিভিশন সাংবাদিকতার কারণে সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে মিশেছেন তিনি। রোদ-বৃষ্টি কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি—খবরের পেছনে ছুটে চলেছেন নিরলসভাবে। বিশেষ করে ঈদের দিনগুলোতেও সাধারণ মানুষের গল্প তুলে ধরতে কাটিয়েছেন সারাদিন বাইরে। তিনি বলেন, আর সেই কারণেই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাটানো সময় এবং খুব মিস করি সেই চায়ের আড্ডা।
আরও পড়ুন
শৈশবের ঈদ বনাম যৌবনের ঈদ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা
প্রবাস জীবনে আমার প্রথম ঈদ
পিরোজপুরের মিরাজ হাওলাদার বর্তমানে ব্রুনাই প্রবাসী। দেশটির একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘রাজিকিন এন্টারপ্রাইজ’ এর ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন প্রকল্পে তিনি প্রজেক্ট সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন, ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন প্রকল্পে আমার অধীনে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পারদর্শী প্রায় পঁচিশজন দক্ষ সহকর্মী ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিদিনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন একটু অবসর মেলে, তখন অজান্তেই মন ছুটে যায় নিজের দেশ, পরিবার আর মাটির টানে। মা-বাবার স্নেহ, স্ত্রীর ভালোবাসা, সন্তানের হাসি—সবকিছু যেন একসঙ্গে মনে পড়ে, আর মনটা হয়ে ওঠে ব্যাকুল।
আজ সেই অনুভূতি আরও গভীর, কারণ এটি আমার প্রবাস জীবনের প্রথম ঈদ। নিজের জন্মভূমি, পরিবার ও প্রিয় মানুষদের ছেড়ে এই ঈদ উদযাপন করা সত্যিই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। চারপাশে উৎসবের আমেজ থাকলেও হৃদয়ের ভেতরটা যেন নিঃশব্দে কাঁদে।
মিরাজ বলেন, আমার মতো হাজারো প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা এই দিনটিতে পরিবার থেকে দূরে থেকে একাকিত্ব নিয়ে সময় কাটান। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান ছাড়া ঈদের দিনটি প্রতিটি প্রবাসীর জীবনে এক বিষাদময় অধ্যায় হয়ে ওঠে। তবুও এই কষ্টের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর প্রতিজ্ঞা—নিজের পরিবারকে ভালো রাখা, তাদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের স্বপ্ন পূরণ করা।
প্রবাসের ঈদ তাই শুধু আনন্দের নয়; এটি ত্যাগ, দায়িত্ব, ভালোবাসা আর অপেক্ষার এক অনন্য গল্প। হয়তো আমরা দূরে আছি, কিন্তু আমাদের প্রতিটি পরিশ্রম, প্রতিটি নিঃশ্বাস জড়িয়ে আছে আমাদের প্রিয় মানুষগুলোর সুখের সঙ্গে।
সন্তানের প্রথম ঈদে পাশে থাকা হলো না
চাঁদপুরের আব্দুল আজিজ বর্তমানে সৌদি আরবের আল বাহা শহরে থাকেন এবং একটি রেস্টুরেন্টে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি দেশ ছেড়েছেন। এর মধ্যেই তিনি কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছেন। তিনি বলেন, প্রথমবারের মতো প্রবাসে পরিবার ছাড়া ঈদ কাটাচ্ছি। মা-বাবাকে অনেক আগেই হারিয়েছি। তবে আগের ঈদগুলোতে স্ত্রী ও ভাইবোনরা পাশে ছিল। এবার কেউ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়েছি ঠিকই, কিন্তু নেই সেই চেনা পরিবেশ, পরিবারের ব্যস্ততা আর আপনজনদের সঙ্গে ঈদগাহে যাওয়ার আনন্দ। নামাজ শেষে বিশ্রামের সুযোগ না নিয়েই আবার কাজে ফিরতে হয়েছে।
এই প্রবাসী আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে আমার ছোট্ট মেয়েটাকে। এটাই তার জীবনের প্রথম ঈদ। তার পাশে থাকতে না পারার কষ্টটাই সবচেয়ে বেশি। সেই সঙ্গে স্ত্রী ও ভাইবোনদের কথাও বারবার মনে পড়ছে। তবুও চাই, আমার এই ত্যাগের জন্য হলেও আমার পরিবারের সবাই ভালো থাকুক।
আরও পড়ুন
ঈদে বাজি ফাটানো, সংস্কৃতি নাকি অপসংস্কৃতি?
ঈদে অসহায় মানুষের প্রতি কর্তব্য
মায়ের হাতের রান্না আজ সবচেয়ে বেশি মিস করি
রোকন মিয়া বর্তমানে সৌদি আরবের একটি ফার্মেসিতে চাকরি করেন। তার বাড়ি জামালপুরে। প্রায় তিন বছর ধরে তিনি প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, বিদেশে পরিবার ছাড়া ঈদের দিন কাটানো সত্যিই খুব চ্যালেঞ্জিং। এই প্রবাস জীবনের মূল লক্ষ্যই হলো পরিবারকে ভালো রাখা, তাদের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু এই জীবন মানেই একাকীত্ব আর নিরন্তর সংগ্রাম। বিশেষ এই দিনে পরিবারকে খুব বেশি মনে পড়ে, বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্না যা সবচেয়ে বেশি মিস করি।
রোকন বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে গ্রামের মাঠে ঈদের নামাজ পড়া, নামাজ শেষে ছবি তোলা, তারপর একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডায় মেতে ওঠা—এসবই জীবনের সেরা স্মৃতি। ঈদের দিনে ক্রিকেট খেলার আনন্দও ছিল আলাদা। সব মিলিয়ে গ্রামের সেই দিনগুলো এখন খুব বেশি মনে পড়ে।
পরিবার ছাড়া প্রবাস জীবনের দিনগুলো অনেক সময় বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে এখন নিয়মিত ভিডিও কলে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে কিছুটা হলেও সেই শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করি। কাজের ফাঁকে বিশ্রামের সময় দেশকে ভাবা, স্মৃতিগুলো মনে করা—সব কষ্টকে যেন একটু আড়াল করে দেয়, আবার হাসিমুখে পরিবারকে সময় দেওয়ার শক্তি জোগায়।
তিনি বলেন, ঈদের দিন আমরা প্রবাসীরা একসঙ্গে রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকি। নামাজ শেষে সবাই মিলে নিজেদের মতো করে আনন্দ ভাগ করে নেই এবং খাওয়া দাওয়ায় মেতে ওঠি।
এমআইএইচ