ঈদে বাজি ফাটানো, সংস্কৃতি নাকি অপসংস্কৃতি?

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক খায়রুল বাশার আশিক
প্রকাশিত: ০৭:৫৬ এএম, ২১ মার্চ ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

ঈদ কিংবা নতুন বছর এলেই দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রান্তিক গ্রাম পর্যন্ত বাজি ফাটানোর প্রবণতা দেখা যায়। রাত নামলেই শুরু হয় বিকট শব্দের আতশবাজি। অনেকেই এটিকে উৎসবের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি সত্যিই কোনো প্রথা বা সংস্কৃতির অংশ, নাকি সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা একটি অপসংস্কৃতি?

বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঈদ সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ঈদের মূল সৌন্দর্য ছিল ধর্মীয় আবহ, পারিবারিক মিলন, অতিথি আপ্যায়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতিতে। ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া, শিশুদের ঈদি দেওয়া এসবই ছিল উৎসবের আসল আনন্দ। কোথাও বাজি ফাটানোকে ঈদের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা যায় না। অর্থাৎ ঐতিহ্যগতভাবে ঈদের সঙ্গে বাজি ফাটানোর কোনো গভীর সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় সম্পর্ক নেই।

বরং অনেকের মতে, বাজি ফাটানো একটি অসভ্য অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। কারণ এটি শুধু শব্দদূষণই তৈরি করে না, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। উৎসবের আনন্দের নামে এমন একটি কর্মকাণ্ড যখন অন্য মানুষের অস্বস্তি ও ক্ষতির কারণ হয়, তখন সেটিকে সংস্কৃতি না বলে অসভ্যতা বলা ভুল নয়।

ঈদে বাজি ফাটানো, সংস্কৃতি নাকি অপসংস্কৃতি?

জানা যায়, আতশবাজি মূলত এসেছে অন্য উৎসব বা বৈশ্বিক বিনোদন সংস্কৃতি থেকে। অনেক দেশে নববর্ষ বা বিশেষ উদযাপনে আতশবাজির প্রচলন থাকলেও, আমাদের সমাজে এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়েছে, আধুনিক বিনোদনের প্রভাব এবং শহুরে সংস্কৃতির অনুকরণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন এবং নগর জীবনের প্রভাব গ্রামেও পৌঁছে যাওয়ায় এখন অনেকেই এটিকে উৎসবের আনন্দ প্রকাশের একটি মাধ্যম মনে করছেন। তবে সব দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, বাজি ফাটানোকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব সংস্কৃতির অংশ বলা কঠিন। বরং এটি সময়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া একটি নতুন অভ্যাস, যা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক অসুবিধা ও ঝুঁকি তৈরি করছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, তীব্র শব্দ মানুষের শরীর ও মনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকা ভ্রূণও হঠাৎ তীব্র শব্দে কেঁপে উঠতে পারে। হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, স্ট্রোকের রোগী বা সদ্য অস্ত্রোপচার করা রোগীদের জন্য এই ধরনের বিকট শব্দ অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি শারীরিক জটিলতা বাড়িয়ে দিতে পারে, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন: 

বিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণভাবে একজন মানুষ প্রায় ৬০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ স্বাভাবিকভাবে সহ্য করতে পারে। এর বেশি হলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। অথচ বিভিন্ন ধরনের আতশবাজি বা পটকা ফাটানোর সময় প্রায় ১২০ থেকে ২০০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দ সৃষ্টি হতে পারে। এই মাত্রার শব্দ শুধু শিশু, বয়স্ক ব্যক্তির জন্যই নয় বরং প্রাণীদের জন্যও ভীতিকর ও ক্ষতিকর।

শব্দদূষণের পাশাপাশি বাজি ফাটানোর ফলে পরিবেশ দূষণও বাড়ে। আতশবাজির ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বা ফুসফুসজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় অসাবধানতাবশত আগুন লাগা, পোড়া বা দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটে।

ঈদে বাজি ফাটানো, সংস্কৃতি নাকি অপসংস্কৃতি?

আতশবাজির বিকট শব্দ পাখিদের জন্যও মৃত্যুর কারণ। পরিবেশবিদদের মতে, হঠাৎ তীব্র শব্দে পাখিরা ভয় পেয়ে দিগভ্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় আতঙ্কে দ্রুত উড়তে গিয়ে ভবন, বৈদ্যুতিক তার বা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা যায়। আবার অনেক পাখির হৃৎস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে গিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে রাতের বেলায় আতশবাজির শব্দে বাসায় থাকা পাখিরা আতঙ্কে বাসা ছেড়ে উড়ে যায়, ফলে তাদের ডিম বা বাচ্চাও ক্ষতির মুখে পড়ে। পরিবেশবিদরা বলছেন, মানুষের ক্ষণিকের আনন্দের জন্য এমন শব্দদূষণ প্রকৃতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্রকে ব্যাহত করছে।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, উৎসবের আনন্দ তখনই প্রকৃত অর্থে সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন তা অন্যের জন্য কষ্ট বা বিপদের কারণ না হয়ে সবার জন্য স্বস্তি ও আনন্দ বয়ে আনে। তাই উৎসব উদযাপনে সচেতনতা ও সংযমই হতে পারে প্রকৃত সংস্কৃতির পরিচয়।

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।