গত ১ যুগে যে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০১:৫৫ পিএম, ১৭ মে ২০২০

আবহাওয়া অধিদফতর ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে ২০০৭ সাল থেকে। এর আগে একটা সময় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের নামকরণ হতো না। তাই ২০০৭ সালের নভেম্বরে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা হয় ‘সিডর’। তারপর থেকে গত ১ যুগে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে বাংলাদেশে। এতে প্রাণহানিসহ মালামালের ক্ষতিও হয় ব্যাপক। জেনে নেই সেসব ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে—

storm

সিডর: ২০০৭ সালের ৯ নভেম্বর একটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সৃষ্টি হয়। ১১ নভেম্বর সামান্য দুর্যোগের আভাস পাওয়া যায়। এর পরের দিনই এটি ঘূর্ণিঝড় সিডরে পরিণত হয়। ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টার পর বাংলাদেশের পাথরঘাটায় বালেশ্বর নদীর কাছে উপকূল অতিক্রম করে। ঝড়ের তাণ্ডবে উপকূলীয় জেলাসমূহে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ঝড়ো হাওয়াসহ বিপুল পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়। বাংলাদেশের প্রায় ৬ লাখ টন ধান নষ্ট হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণির মৃত্যু হয়। প্রায় ৯ লাখ ৬৮ হাজার ঘর-বাড়ি ধ্বংস এবং ২১ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। এতে প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার গৃহপালিত পশু ও হাঁস-মুরগি মারা যায়।

storm

নার্গিস: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে একটি হলো নার্গিস। ২০০৮ সালের মে মাসে এটি মিয়ানমারে আঘাত হানে। এতে প্রাণ হারায় ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ৪ লাখ ৫০ হাজার ঘর-বাড়ি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়। এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়লেও তেমন বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি।

storm

আইলা: ২০০৯ সালে উত্তর ভারত মহাসাগরে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড় আইলা। ঘূর্ণিঝড়টি জন্ম নেয় ২১ মে ভারতের কলকাতা থেকে ৯৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে। আঘাত হানে ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাংশে। এর ব্যাস ছিলো প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডরের থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। সিডরের মতোই আইলা প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় নিয়ে উপকূল অতিক্রম করে। তবে পরে বাতাসের বেগ ৮০-১০০ কিলোমিটার হয়ে যাওয়ায় ক্ষয়-ক্ষতি সিডর থেকে তুলনামূলক কম হয়েছে।

মহাসেন: ২০১৩ সালের মে মাসের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণাংশে নিম্নচাপজনিত কারণে উৎপত্তি ঘটে মহাসেনের। কার্যত স্থির থাকলেও ১০ মে তারিখে ঘণিভূত অবস্থায় চলে যায়। পরবর্তীতে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে রূপান্তরিত হয়। ১৪ মে এটি উত্তর-পূর্বাংশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কার্যত জনজীবন অচল হয়ে পড়ে।

storm

কোমেন: ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে ৫-৭ ফুট উচ্চতার ঘূর্ণিঝড় কোমেন আঘাত হানে। এটি এমন একটি অস্বাভাবিক গ্রীষ্মপ্রধান ঝড়; যেটি বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলে উৎপন্ন হয়েছিল। এটি বঙ্গোপসাগরের উত্তরে প্রবাহিত হওয়ার সময় একই দেশকে আঘাত করে চলে গিয়েছিল। ২০১৫ সালে এ তান্ডবের সময় কোমেন মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ভারতে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিল।

রোয়ানু: ২০১৬ সালের ২১ মে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলে ৪-৫ ফুট উচ্চতার ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু আঘাত হানে। রোয়ানু একটি ছোট ঘূর্ণিঝড়, যা ২১ মে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে এবং ভারতে আংশিক আঘাত হানে। পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ১৩৫ কিলোমিটার দূরে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর উৎপত্তিস্থল। ধারণা করা হয়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ব্যাপ্তি ছিল দুটি বাংলাদেশের সমান আকৃতির।

মোরা: ২০১৭ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোরা আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে কক্সবাজার উপকূলের শতাধিক বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত হয়। বেশ কিছু গাছপালা উপড়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে উত্তাল হয় সাগর। ঘূর্ণিঝড়টি সোমবার থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার উপকূল ছুঁয়ে চট্টগ্রাম, হাতিয়া ও সন্দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়। আক্রান্ত জেলাসমূহে হাজার হাজার কাঁচা ঘর-বাড়ি ধ্বংস হয়। কক্সবাজারে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়। টেকনাফের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। জমির ফসল এবং চাষিদের জমাকৃত লবণ নষ্ট হয়ে যায়। দু’জন নারীসহ তিন জন এবং রাঙামাটিতে দু’জন মারা যায়।

storm

ফণী: ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র নাম দেয় বাংলাদেশ। এর অর্থ সাপ (ফণা আছে যার)। ফণী ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল ভারতীয় মহাসাগরে সুমাত্রার পশ্চিমে গঠিত একটি ক্রান্তীয় নিম্নচাপ থেকে সৃষ্টি হয়। ৩০ এপ্রিল তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশে মোট ৮৯ জনের মৃত্যু হয়।ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়, যার বেশিরভাগই হয় উড়িষ্যায়।

বুলবুল: ২০১৯ সালের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গের উপকূল ঘেঁষে প্রথম আঘাত হানার পর বুলবুল প্রায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসে। কিন্তু বুলবুলের পূর্ব এবং পশ্চিম দু’দিকেই তিন কোণার মতো অবস্থানে ছিল সুন্দরবন। সুন্দরবনের গাছপালার কারণে বুলবুল বেশ দুর্বল হয়ে যায়।

এসইউ/জেআইএম