তদন্ত প্রতিবেদন জমা, এবার কী হতে পারে বিসিবিতে?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:২০ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০২৬

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে জমা পড়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান মিডিয়ায় কথাও বলেছেন। তদন্ত কমিটি প্রধানের মিডিয়ায় কথা বলার পর থেকে ঘুরেফিরে দুটি প্রশ্নই সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এক. তদন্ত প্রতিবেদনে আসলে কী আছে? কাউকে কি অভিযুক্ত করা হয়েছে? তদন্ত কমিশন মুখে যতই বলুক, কারও বিপক্ষে সরাসরি অভিযোগ আনা হয়নি- আসলেই কি বিসিবি নির্বাচন নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি সব অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর কারও বিপক্ষে অভিযোগ তোলেনি?

দ্বিতীয় কৌতূহলী প্রশ্ন হলো, তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা এনএসসিতে জমা পড়ার পর কী হবে? এখন এনএসসি কী সিদ্ধান্ত নেবে?

কারও বিপক্ষে সরাসরি অভিযোগ না তোলা হলেও বিসিবির নির্বাচন নিয়ে যাদের বিপক্ষে অভিযোগের তীর ছোড়া হয়েছে, তাদের কি কিছুই হবে না? তারা কি নিস্তার পেয়ে যাবেন? এই তদন্ত প্রতিবেদনের পর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কী সিদ্ধান্ত নেবে?

অবশ্য এনএসসি চেয়ারম্যান ও ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক এরই মধ্যে জানিয়েছেন যে, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির কাছে তুলে ধরা হবে এবং সেই রিপোর্ট দেখে ও পড়ে আইসিসিই সিদ্ধান্ত জানাবে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এগোবে।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন এনএসসিতে জমা পড়ার পর তা নিয়ে কথা বলেছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চেয়ারম্যান ও ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক।

আজ রোববার পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে ক্রীড়ামন্ত্রী এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রধান আমিনুল হক বলেন, ‘ইতিমধ্যে সকালবেলা তদন্ত কমিটি এসে প্রতিবেদন জমা দিয়ে গেছে এবং আমরা এরপর তাৎক্ষণিকভাবে এখানে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একটি মিটিং ডেকেছিলাম। সেই মিটিংয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা করেছি এবং আইসিসিকে তদন্ত রিপোর্টটি অবগত করার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো, ইনশাল্লাহ।’

এখন প্রশ্ন হলো- কী সেই সিদ্ধান্ত? আইসিসিকে রিপোর্ট সম্পর্কে অবগত করার পর এনএসসি কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে মুখিয়ে আছেন কোটি ক্রিকেট অনুরাগী।

তাদের সে কৌতূহল মেটাতে বলা যায়, বিসিবির নির্বাচনের অসচ্ছতা, অনিয়ম এবং সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি যে প্রতিবেদন এনএসসিতে জমা দিয়েছে, তা আইসিসিকে দেখিয়ে এবং আইসিসির মতামত নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং তদন্ত কমিটির কেউ সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ না করলেও ভেতরের খবর, বিসিবি পরিচালক পর্ষদ নির্বাচনে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং সরকারি হস্তক্ষেপের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

তাদের রিপোর্টে তা উল্লেখও আছে এবং সেগুলো আইসিসির কাছে তুলে ধরার পর আইসিসিই হয়তো বিসিবির নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ, অস্বচ্ছ ও সরকারি হস্তক্ষেপে পরিপূর্ণ বলে অভিহিত করবে। তখন বর্তমান পরিচালক পর্ষদের ভাগ্য ঝুলে যাবে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নিজেদের ও বিসিবির গঠনতন্ত্র মেনে তখন বিসিবির বর্তমান পরিচালক পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে এবং অস্থায়ীভাবে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের নির্দেশ দিতে পারে এবং সেটা এনএসসির ২০১৮ সালের সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ধারায় লেখা আছে।

সেখানে অস্বচ্ছ, অনিয়ম আর সরকারি হস্তক্ষেপে ভরা নির্বাচনকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে বোর্ড ভেঙে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করার এখতিয়ার রাখে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে নির্বাচনি প্রক্রিয়াটা আরও পরিশুদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

আগামীতে যাতে বিসিবি নির্বাচন আরও সুষ্ঠু, নিয়মনীতি মেনে এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় এবং বিসিবির ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলো সবরকম প্রভাবমুক্ত ও সুন্দর করার জন্য বেশ কিছু গাইডলাইন বা পরামর্শ সুপারিশ আকারে দিয়েছে কমিটি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুপারিশের মধ্যে বিসিবির বর্তমান গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে বলে তদন্ত কমিটির প্রধান উল্লেখ করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করেছি। এই সুপারিশের মধ্যে গঠনতন্ত্র সংশোধনের ব্যাপারটা আছে।’

তদন্ত কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান যখন এমন কথা বলেছেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে বিসিবির বর্তমান নির্বাচনি প্রক্রিয়া মোটেই সন্তোষজনক নয় এবং তদন্ত কমিটিও সে প্রক্রিয়ায় সন্তুষ্ট নয়।

তদন্ত কমিশন মনে করে এতে করে বিসিবি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে। সে প্রভাব বিস্তার রোধে কিছু পরামর্শ সুপারিশ আকারে দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

আর সেটাই অনেক বড় বার্তা। তার মানে বিসিবির গঠনতন্ত্রেই কিছু ফাঁকফোকর আছে, যার কারণে প্রভাবমুক্ত নির্বাচন সম্ভব হয়নি। আর সেই প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতেই বিসিবিকে গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কাজেই বলা যায়, আগামীতে বিসিবির গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে আরও সুন্দর করার বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

সব মিলিয়ে গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা যথেষ্ট। আর সেই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও সরকারের প্রভাবমুক্ত রাখতে সবার আগে একটি অস্থায়ী আহ্বায়ক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় হাত দিতে পারে এনএসসি।

তার মানে ধরে নেওয়া যায় যে অচিরেই এই বোর্ড পরিচালক পর্ষদ ভেঙে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সে আহ্বায়ক কমিটিতে থাকেন কারা। সেই আহ্বায়ক কমিটির কাজ হবে ৯০ দিনের মধ্যে বিসিবিতে একটি নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা।

যেহেতু আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে বর্তমান বোর্ডের অধীনে ঢাকার ক্লাবগুলো প্রিমিয়ার লিগ খেলতে রাজি নয়, তাই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আইসিসিকে দেখিয়ে আইনের ভেতরে থেকে এনএসসি শিগগির বোর্ড পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে উদ্যোগী হতে পারে।

যাতে করে বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগে ওই আহ্বায়ক কমিটির অধীনে ক্লাবগুলো প্রিমিয়ার লিগ খেলতে রাজি হয় এবং মে মাসের মধ্যে অন্তত সিঙ্গেল লিগ হলেও প্রিমিয়ার লিগ আয়োজন করা সম্ভব হয়- সে চেষ্টা করার কথাই শোনা যাচ্ছে জোরেশোরে।

পাশাপাশি এ কমিটি সরে গেলে বিভিন্ন জেলা, বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়েও লিগ আয়োজনে ব্রত হবে জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সংগঠকরা। সব মিলিয়ে বলা যায়, আমিনুল ইসলাম বুলবুলের এই পরিচালক পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ও ভেঙে যাওয়া এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার।

অবশ্য যে হারে পদত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে বিসিবিতে, তাতে এমনিতেই বোর্ডের ভাগ্য অনিশ্চিত মনে হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। আর ৫-৭ জন পদত্যাগ করলে এমনিতেই বোর্ড ভেঙে যাওয়ার প্রশ্ন দেখা দেবে।

তখন অনিবার্যভাবেই আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সেই আহ্বায়ক কমিটিই একটি স্বচ্ছ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে গঠিত হবে।

এআরবি/আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।