একসঙ্গে জন্ম নেওয়া ৫ প্রিম্যাচিউর শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলো
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যায় একসঙ্গে জন্ম নেওয়া পাঁচ প্রিম্যাচিউর ও স্বল্প ওজনের শিশুকে সফলভাবে সুস্থ করে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মা-বাবা ও স্বজনদের হাতে শিশুদের তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বিএমইউ’র উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী এ ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘বিরাট সাফল্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং নিওনাটোলজি বিভাগের চিকিৎসক ও নার্সদের দক্ষতা ও আন্তরিক সেবার প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, নিওনাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান এবং ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তাবাছসুম পারভীন উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামালসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
নিওনাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, গত ৫ এপ্রিল ৩০ বছর বয়সী এক মায়ের গর্ভে ৩৩ সপ্তাহ বয়সে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে পাঁচ শিশুর জন্ম হয়। নবজাতকদের মধ্যে ছিল দুই কন্যা ও তিন পুত্র। মাল্টিপল জেস্টেশনের কারণে পুরো গর্ভাবস্থাই শুরু থেকেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
জন্মের পরপরই অপরিণত অবস্থা ও শ্বাসকষ্টের কারণে পাঁচ শিশুকেই এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। জন্মের সময় শিশুদের ওজন ছিল যথাক্রমে ১৪২০ গ্রাম, ১২৫০ গ্রাম, ১৪১০ গ্রাম, ৯৮৫ গ্রাম এবং ১৬২৫ গ্রাম। কয়েকজন শিশুর ওজন ছিল অত্যন্ত কম। তাদের মধ্যে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, বুক দেবে যাওয়া এবং গ্রান্টিং-এর মতো শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দেয়।
চিকিৎসকরা জানান, শিশুদের চিকিৎসায় শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো, সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া, সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত হাত ধোয়া নিশ্চিত করা এবং ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) চালুর ওপর। জন্মের পরপরই পাঁচ শিশুকেই সিপ্যাপ সাপোর্ট দেওয়া হয়। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ধাপে ধাপে খাবার বৃদ্ধি এবং মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করার ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের শ্বাসকষ্ট কমে আসে।
এনআইসিইউ সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে পরিবারকেও সংক্রমণ প্রতিরোধ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস অনুসরণ করায় সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখা সম্ভব হয়েছে।
শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল হলে তাদের জন্য ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার শুরু করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শে রাখার এই পদ্ধতি শিশুদের ওজন বৃদ্ধি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মা-শিশুর বন্ধন উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জন্মের পাঁচ দিন পর, ৯ এপ্রিল পরিকল্পিত আর্লি ডিসচার্জের অংশ হিসেবে শিশুদের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে ফলো-আপ কেয়ার চলতে থাকে। ৩০ দিন বয়সে ফলো-আপে দেখা যায়, পাঁচ শিশুরই ওজন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তখন তাদের ওজন দাঁড়ায় যথাক্রমে ১৭০০ গ্রাম, ১৫২০ গ্রাম, ১৬৪৫ গ্রাম, ১২১৫ গ্রাম এবং ১৮২৫ গ্রাম। বর্তমানে সবাই সুস্থ রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের মধ্যেও সময়মতো এনআইসিইউ কেয়ার, বুকের দুধ খাওয়ানো, সিপ্যাপ ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার নিশ্চিত করা গেলে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রিম্যাচিউর নবজাতকদেরও সফলভাবে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
এসইউজে/এমএএইচ/