পিআইসিইউ চিকিৎসার নামে শিশুদের গিনিপিগ বানানো হচ্ছে!


প্রকাশিত: ০৫:১০ পিএম, ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৫
ফাইল ছবি : একটি পিআইসিইউ

পেডিয়েট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) চিকিৎসার নামে শিশুদের গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে এক মাস থেকে ১২ বছর বয়সী মুমূর্ষু শিশু রোগীদের পৃথক পিআইসিইউতে রেখে সুচিকিৎসা প্রদান করা অত্যাবশ্যক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিআইসিইউয়ের অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে সরকারি-বেসরকারি উভয় হাসপাতালেই শিশুদের কখনো নবজাতক (নিওনেটাল) আইসিইউ আবার কখনোবা প্রাপ্ত বয়স্কদের (অ্যাডাল্ট) আইসিইউতে অনৈতিকভাবে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি চার বছরের ছোট্ট শিশু কেসপারের মৃত্যুর পর জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেশে পিআইসিইউর অপ্রতুলতা ও অনৈতিক বাণিজ্যের তথ্য বেরিয়ে আসছে। বর্তমানে দেশের সরকারি কোনো হাসপাতালে পিআইসিইউ নেই। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে রাজধানীর হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে পেডিয়েট্রিক আইসিইউ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক আইসিইউ চিকিৎসক জাগো নিউজকে বলেন, আদর্শগতভাবে কোনো মুমূর্ষু শিশুকে পিআইসিইউ ছাড়া অ্যাডাল্ট বা নিওনেটাল আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া মোটেই উচিত নয়। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক, শিশু ও নবজাতক প্রত্যেকের শরীরেই রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা ভিন্নতর হয়। অ্যাডাল্ট আইসিইউতে রাখার ফলে শিশু রোগী সংক্রমিত হয়ে আরো মুমূর্ষু ও শিশুকে নিওনেটাল আইসিইউতে রাখার ফলে সংক্রমিত হয়ে নবজাতক শিশুটির মৃত্যুও হতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিআইসিইউ চিকিৎসা সুবিধার অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে বেপরোয়া বাণিজ্য চলছে। এক শ্রেণির মুনাফালোভী চিকিৎসা ব্যবসায়ী মুমূর্ষু শিশু রোগীদের কখনো প্রাপ্তবয়স্ক (অ্যাডাল্ট) আইসিইউ ও নবজাতক শিশুদের (নিওনেটাল) আইসিইউতে রেখে চিকিৎসাসেবা প্রদানের নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশু রোগীর সুচিকিৎসার স্বার্থে নয়, প্রতিদিন গড়ে চিকিৎসা খরচ বাবদ সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিতেই আইসিইউতে পাঠানো হয়। জানা গেছে, যে সকল শিশুর বয়স এক মাস থেকে ছয় মাস তাদেরকেই নিওনেটাল আইসিইউতে রাখা হয়। শিশুর বয়স একটু বেশি হলে অ্যাডাল্ট আইসিইউতে পাঠানো হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ চিকিৎসক জানান, যখন শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে তখন বাবা-মা আত্মীয়স্বজন যেকোনো মূল্যে শিশুটির প্রাণ বাঁচাতে চান। তখন তারা আইসিইউ বেড চায়। সেটি অ্যাডাল্ট না-কি নিওনেটাল শিশুদের জন্য সেটা বিবেচ্য থাকে না। শুধুমাত্র ব্যবসার জন্যই আইসিইউতে পাঠানোর ঢালাও অভিযোগ সঠিক নয় বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেডিয়েট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্ল্যা বুধবার সন্ধ্যায় জাগো নিউজকে বলেন, মুমূর্ষু শিশু রোগীদের অনেক সময় পিআইসিইউ সাপোর্টে চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অপ্রতুলতার কারণে তাদের তাৎক্ষনিকভাবে সেই সেবা দেয়া সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, শিশুটির প্রাণ বাঁচাতে অনেক সময় চিকিৎসকরা নিরুপায় হয়ে অ্যাডাল্ট ( ৯ থেকে ১০ বছরের শিশু) আইসিইউ ও নবজাতকের চেয়ে কিছুটা বেশি বয়সী শিশুদের নিওনেটাল আইসিইউতে রাখতে বাধ্য হন। কিন্তু আদর্শগতভাবে তা কখনো উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক শিশুর সার্জারি অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। ওই সময় শিশুদের পিআইসিইউ রেখে চিকিৎসা নিতে হয়। যাদের টাকা-পয়সা আছে তারা শিশুদের রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের পিআইসিইউতে নিয়ে যান। আর যাদের টাকা-পয়সা নেই তাদের আল্লাহকে ডাকা ছাড়া উপায় থাকে না।

ঢামেক হাসপাতালের প্রাপ্তবয়স্কদের আইসিইউতে শিশুদের রাখার খবরের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, অনেক সময় নিরুপায় হয়ে শিশুদের অ্যাডাল্ট আইসিইউতে রাখা হয়। যে সকল শিশুর বয়স ৮ থেকে ১০ বছর সেসব শিশুদেরই ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়। এতে বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয় না বলে তিনি দাবি করেন। ঢাকা শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা.আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, তারা পিআইসিইউয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

ঢামেক আইসিইউ প্রধান ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ২০ শয্যার আইসিইউতে এমনিতেই প্রাপ্তবয়স্ক মুমূর্ষু রোগীদের জন্য বেড পাওয়া যায় না। কিন্তু অনেক সময় অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো শিশু রোগীকে ভর্তি করতে হয়। তারা খুব সাবধানতার সঙ্গে শিশুদের অ্যাডাল্ট আইসিইউতে চিকিৎসা দেন বলে জানান।

বাংলাদেশ পেডিয়েট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্ল্যা জাগো নিউজকে বলেন, সত্যি কথা বলতে এতোদিন পেডিয়েট্রিক আইসিইউতে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। নবজাতক ও প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মৃত্যু কম হওয়ায় নজর এড়িয়ে গেছে।

একজন শিশুর মৃত্যুও কাম্য নয় উল্লেখ করে তিনি সরকারিভাবে সীমিত পর্যায়ে সকল সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২/১টি করে হলেও পিআইসিইউ অবিলম্বে স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।

# দেশের একটি সরকারি হাসপাতালেও পেডিয়েট্রিক আইসিইউ নেই
# পিআইসিইউ সংকটে জিবিএস আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু-পঙ্গুত্ব বাড়ছে
# মানহীন আইসিইউ এখন মরণফাঁদ

এমইউ/বিএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]