মোদী থেকে আম্বানি

এপস্টেইন ফাইলসে যাদের নামে ভারতে তোলপাড়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৯ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নরেন্দ্র মোদী ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু/ ফাইল ছবি: জিপিও

যুক্তরাষ্ট্রে সাজাপ্রাপ্ত কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের বিপুলসংখ্যক গোপন নথি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত এসব নথিতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধনকুবেরদের নাম উঠে এসেছে। সেই তালিকায় রয়েছেন নরেন্দ্র মোদীসহ ভারতের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও।

মোদী-আম্বানির যোগাযোগ

গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ভারতীয় শিল্পপতি অনিল আম্বানির সঙ্গে এপস্টেইনের একাধিক ই-মেইল ও বার্তা বিনিময় হয়েছে। এসব যোগাযোগ হয়েছিল ২০০৮ সালে এপস্টেইন প্রথমবার যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরবর্তী সময়ে।

নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত হতে যাওয়া ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের বিষয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে মোদীর সঙ্গে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও দুজনের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে।

আরও পড়ুন>>
অবশেষে ৩০ লাখ পৃষ্ঠার ‘এপস্টেইন ফাইলস’ প্রকাশ, চাপে ট্রাম্প প্রশাসন
‘এপস্টেইন ফাইলস’ প্রকাশ: ফেঁসে যাচ্ছেন ট্রাম্প, মাস্ক ও বিল গেটস

এপস্টেইন ফাইলসের তথ্য/ ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে নাচগান করেন মোদী

অনিল আম্বানি ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ভাই। মুকেশ আম্বানিও প্রধানমন্ত্রী মোদীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

নথিতে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে শপথ নেওয়ার প্রায় দুই মাস পর অনিল আম্বানি এপস্টেইনকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি জানান, ‘নেতৃত্ব’ ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে এপস্টেইনের সহায়তা চাইছে। ওই তালিকায় ছিলেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ ব্যানন।

একই সঙ্গে মে মাসে মোদীর সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক নিয়েও এপস্টেইনের পরামর্শ চান আম্বানি। এর দুই সপ্তাহ পর, ২৯ মার্চের আরেক বার্তায় এপস্টেইন লেখেন, ‘ইসরায়েল কৌশল নিয়ে আলোচনা মোদীর তারিখ নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।’ এর দুদিন পর আম্বানি জানান, মোদী জুলাইয়ে ইসরায়েল সফর করবেন এবং এ বিষয়ে ‘ট্র্যাক টু’ যোগাযোগে এপস্টেইনের পরিচিতদের সম্পর্কে জানতে চান।

২০১৭ সালের ২৬ জুন ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেন মোদী। এর পর ৬ জুলাই মোদী ইসরায়েল সফরে যান, যা ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরায়েল সফর। ওই সফরে তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করায় ফিলিস্তিনের কর্মকর্তারা তীব্র সমালোচনা করেন।

সেই বছরই ভারত ইসরায়েল থেকে প্রায় ৭১৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়। এটি ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখা হয়।

নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, মোদীর ইসরায়েল সফরের পর এপস্টেইন ‘জাবর ওয়াই’ নামে এক ব্যক্তিকে ইমেইলে লেখেন, মোদী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বার্থে ইসরায়েলে গিয়ে পরামর্শ নিয়েছিলেন এবং এতে রাজনৈতিকভাবে লাভ হয়েছে। মোদী ট্রাম্পকে খুশি করতে ইসরায়েলে গিয়ে নাচগান করেছিলেন বলেও দাবি করা হয় ইমেইলে।

এরপর, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদীর বড় জয়ের পর এপস্টেইন হোয়াইট হাউজের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে মোদীর বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দেন। ওই সময় নিউইয়র্কে অনিল আম্বানি ও এপস্টেইনের বৈঠকের কথাও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে আম্বানির কোনো সরকারি অনুমোদন ছিল কি না, সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট তথ্য নেই।

নথিতে আরেক বিজেপি নেতার নাম

এপস্টেইন ফাইলসে আরেক ভারতীয় নাম হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি নেতা ও সাবেক কূটনীতিক হারদীপ সিং পুরীর নাম। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এপস্টেইনের সঙ্গে তার একাধিক ই-মেইল আদান–প্রদান এবং নিউইয়র্কে অন্তত তিনবার সাক্ষাতের তথ্য রয়েছে। পুরী অবশ্য ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এসব যোগাযোগ ছিল সম্পূর্ণ পেশাগত ও বিনিয়োগসংক্রান্ত।

সরকারের প্রতিক্রিয়া ও বিরোধীদের দাবি

এপস্টেইন ফাইলসে মোদীর প্রসঙ্গকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফরের বাইরে ইমেইলে থাকা বাকি সব মন্তব্য একজন দণ্ডিত অপরাধীর কল্পনাপ্রসূত কথা মাত্র।

তবে বিরোধী দল কংগ্রেস এসব তথ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। দলের সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এপস্টেইন ফাইলস দেখাচ্ছে কারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রভাব বিস্তার করছে এবং এতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

এপস্টেইন নথি প্রকাশের পর ভারতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, ক্ষমতার কেন্দ্র ও প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।