নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

দু’মাসে ইরান যুদ্ধ: শাঁখের করাতে ট্রাম্প, হামলা না সন্ধি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৪৬ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬
এআই

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখনো প্রধান পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা নির্ধারিত হয়নি। এই পরিস্থিতিতে একাধিক কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যা নির্ধারণ করবে মার্কিন বাহিনী কতদিন যুদ্ধক্ষেত্রে থাকবে এবং কী ধরনের ঝুঁকি নিতে হবে। তবে সিদ্ধান্ত যাইহোক তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর হবে না বলে এই বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইরানের নতুন নেতৃত্বকে ভিন্ন ধরনের এবং যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত বলে উল্লেখ করেন। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধের লক্ষ্য সীমিত করে একটি সমঝোতামূলক সমাধানের পথ খোঁজা হতে পারে।

তবে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। ফলে কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হয়েছে।

সামরিক বিকল্প ও ঝুঁকি

মার্কিন বাহিনীর ৪ হাজারের বেশি মেরিন এবং ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন অঞ্চলটিতে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মাধ্যমে ট্রাম্প খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনা দখল, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইরানের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত ধবংস কিংবা নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন।

তবে এসব পদক্ষেপের ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, খার্গ দ্বীপ দখল করলে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে মার্কিন উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। একইভাবে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখাও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ছাড়া সম্ভব নয়।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা

ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে তাদের সার্বভৌম জলসীমা হিসেবে দাবি করেছে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ওপর উচ্চ ফি আরোপের কথা বলেছে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এই প্রণালী ইরানের সম্মতিতে বা আন্তর্জাতিক জোটের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা হবে।

পাল্টা হামলার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো-যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্র বা তেলক্ষেত্র ধ্বংস করা হলে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে এবং ইরান পাল্টা হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অনুরূপ স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে।

রবার্ট এস লিটওয়াক বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই মার্কিন বাহিনীকে ধ্বংস নিশ্চিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানে রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বললেও এখন লক্ষ্যগুলো কিছুটা সীমিত করা হয়েছে।

মার্কো রুবিও চারটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন:

১) ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী ধ্বংস

২) ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানো

৩) সামরিক উৎপাদন অবকাঠামো ধ্বংস

তবে পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ নির্মূলের বিষয়টি তার তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিটি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো এখনো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত

মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ইরান আলোচনা করতে আগ্রহী হলেও বাস্তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক নির্ধারিত হয়নি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার জানিয়েছেন, শিগগির তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা আয়োজন করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি চীনের সমর্থন পেতে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। এছাড়া পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজছেন।

অর্থনৈতিক চাপ ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসন আরব দেশগুলোর কাছ থেকে যুদ্ধের ব্যয় বহনে সহায়তা চাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে এসে স্পষ্ট হচ্ছে—কূটনৈতিক সমাধান এখনো বেশ ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে, আর সামরিক পদক্ষেপের প্রতিটি সিদ্ধান্তই বড় ধরনের ঝুঁকি বহন করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এখন ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা রয়েছে তা হচ্ছে-

১) যুদ্ধের লক্ষ্য সীমিত করে দ্রুত একটি সমঝোতায় যাওয়া

অথবা

২) আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো

দুই ক্ষেত্রেই বেশ বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষতি, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সম্ভাবনা। দীর্ঘ মেয়াদি সংঘাতে জড়ালে তা মার্কিন অর্থনীতির জন্য এক অসহনীয় চাপ হয়ে উঠবে।

কেএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।