মালাক্কা প্রণালিতে টোল বসানোর ইঙ্গিত ইন্দোনেশিয়ার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:২৭ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
সিঙ্গাপুর বন্দরের কাছে মালাক্কা প্রণালিতে নোঙর করা ট্যাংকার ও অন্যান্য বড় জাহাজ/ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ তারিখে তোলা ছবি/ এএফপি

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক টেলিভিশন সম্প্রচারিত বৈঠকে বলেন, হরমুজ প্রণালি অনেক দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে, তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলে। আর এর নিয়ন্ত্রণ একটি দেশের হাতে। কিন্তু আমরা কি বুঝতে পারি, পূর্ব এশিয়ার ৭০ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা এবং ৭০ শতাংশ বাণিজ্য ইন্দোনেশিয়ার প্রণালিগুলোর মধ্য দিয়ে যায়?

৮ এপ্রিলের ওই বৈঠকে প্রেসিডেন্টের সামনে বসা ছিলেন তার স্পষ্টভাষী অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া। ২২ এপ্রিল তিনি একটি অবকাঠামো বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সরাসরি প্রসঙ্গ টেনে বলেন, জাহাজগুলো মালাক্কা প্রণালি দিয়ে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই চলাচল করছে।

তিনি বলেন, এটা ঠিক কি না, আমি নিশ্চিত নই। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়া শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইশ, যদি মালাক্কা প্রণালিতেও এমনটা করা যেত!

প্রাবোও যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন, তা পুরোপুরি নির্ভুল না হলেও তিনি সঠিকভাবেই ইঙ্গিত করেছেন যে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর ওপর অবস্থান করছে। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্য ইকোনমিস্টের মডেলিং বলছে, যদি মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রায় ২১ শতাংশকে বিকল্প পথে যেতে হবে, ফলে জাহাজগুলোর যাত্রাপথ গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বেড়ে যাবে।

আর যদি ইন্দোনেশিয়ার সব প্রণালি যেমন সুন্দা প্রণালি, লোমবোক প্রণালি ও মাকাসার প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ প্রভাবিত হবে ও জাহাজগুলোকে গড়ে ৭ হাজার ৮০০ কিলোমিটার ঘুরপথে চলতে হবে।

মালাক্কা প্রণালিতে টোল আরোপের প্রস্তাব এটি প্রথম নয়। ২০০০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুরা আশ্রয় নিয়ে কনটেইনার জাহাজ ও তেলবাহী জাহাজ আক্রমণ করত। নিজেদের উপকূল পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে না পেরে ইন্দোনেশিয়া তখন প্রস্তাব দেয়, প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি নেওয়া হবে, যা নিরাপত্তা জোরদারে ব্যয় করা হবে।

তবে সে সময় এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সিঙ্গাপুর, কারণ প্রণালির দক্ষিণ প্রান্তে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর থাকায় তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করেছিল।

সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে অবাধ যাতায়াতের অধিকার বজায় রাখার ওপর জোর দেয়। শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়।

এরপর ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও পরে থাইল্যান্ড একসঙ্গে প্রণালীতে আকাশপথে টহল শুরু করে। ফলে জলদস্যুতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

তবে সিঙ্গাপুরের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা করে আসছেন, অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইন্দোনেশিয়া, বিশেষ করে আরও দৃঢ় অবস্থানের কোনো প্রেসিডেন্টের অধীনে, আবারও টোল আরোপের বিষয়টি সামনে আনতে পারে।

সম্প্রতি ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার শক্তিশালী নৌবাহিনী না থাকলেও, ইরান যেভাবে স্বল্পমূল্যের একমুখী ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করেছে, তা দেখিয়েছে- সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী নৌবাহিনী সবসময় অপরিহার্য নয়।

তবে আপাতত বিষয়টি আলোচনার বাইরে রয়েছে। ২২ এপ্রিল সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা স্পষ্ট করে বলেন, এই জলপথে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের অধিকার সবার জন্য নিশ্চিত। আমাদের এলাকায় টোল আরোপ বা পথ বন্ধ করার কোনো প্রচেষ্টায় আমরা অংশ নেবো না।

এর জবাবে ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনো বলেন, ইন্দোনেশিয়া প্রণালীটি উন্মুক্তই রাখবে। আমরা এমন অবস্থানে নেই যে এটা করতে পারি। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়া তার ১৭ হাজার দ্বীপের মধ্যবর্তী জলসীমার স্বীকৃতি পাওয়ার বিনিময়ে প্রণালীগুলো দিয়ে নির্দোষ যাতায়াতের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তার ভাষায়, আমরা এমন একটি দেশ, যাকে আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে সমুদ্র আইন মানতেই হবে।

তবে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্ব ক্রমেই আন্তর্জাতিক আইনের ওপর কম নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন ইন্দোনেশিয়ার এই প্রতিশ্রুতি অনেকের জন্য খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। কারণ একবার যখন এমন একটি ধারণা প্রকাশ্যে আসে, তাও এত গুরুত্বসহকারে, তখন ধারণা করা হচ্ছে- মালাক্কা প্রণালিতে টোল আরোপের বিষয়টি আবারও শিগগিরই আলোচনায় ফিরে আসতে পারে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।