ফিনল্যান্ডে ইউরোপের প্রথম ‘পূর্ণাঙ্গ’ লিথিয়াম খনির কার্যক্রম শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:০৭ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে প্রথমবারের মতো ফিনল্যান্ডে পূর্ণাঙ্গ লিথিয়াম উৎপাদন চক্র (খনি থেকে শোধনাগার) চালু হয়েছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে গর্তের মতো বিস্তৃত একটি জায়গায় ভাঙা পাথর ও আকরিকভর্তি ট্রাক চলাচল করছে, যা ইউরোপের জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।

আধুনিক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরিতে লিথিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, যা এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকেই এর গুরুত্বকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তেলের ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করছেন।

বর্তমানে বিশ্বে লিথিয়ামের বড় অংশের সরবরাহ আসে চীন থেকে। এ কারণে অন্যান্য দেশগুলো নিজেদের উৎস তৈরি করতে দ্রুত উদ্যোগ নিচ্ছে।

ইউরোপের পর্তুগাল ও চেক প্রজাতন্ত্রসহ আরও কয়েকটি দেশে লিথিয়ামের মজুত থাকলেও, ফিনল্যান্ডের এই প্রকল্পটি প্রথম যেখানে খনি, কনসেনট্রেটর থেকে শোধনাগার- সবকিছুই মাত্র ৪৩ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। এ তথ্য জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হান্নু হাউতালা।

এপ্রিলের শেষদিকে এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ফিনল্যান্ডের ছোট্ট পৌর এলাকা কউস্টিনেনের সিভাজারভি উন্মুক্ত খনিতে ধুলার মেঘ উড়তে দেখা যায়। সেখানে স্পোডুমিন আকরিক উত্তোলন করা হচ্ছিল, যার মাত্র ১ শতাংশে লিথিয়াম অক্সাইড থাকে।

প্রায় ৭৮৩ মিলিয়ন বা ৭৮ কোটি ৩০ লাখ ইউরো (প্রায় ৯২০ মিলিয়ন বা ৯২ কোটি ডলার) ব্যয়ের এই প্রকল্প থেকে ব্যাটারি মানের লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপাদন করা হবে, যা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য অপরিহার্য।

খনির পাশে দাঁড়িয়ে হান্নু হাউতালা বলেন, এটির উন্নয়ন ঘটাবে এবং এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অঞ্চল থেকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাবে।

আগামী দুই বছরের মধ্যে খনিটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হবে বলে জানানো হয়েছে।

এরপর ট্রাকের মাধ্যমে আকরিক নিয়ে যাওয়া হবে কাছাকাছি নতুন একটি কনসেনট্রেটর প্ল্যান্টে। সেখানে বালুর মতো ঘন পদার্থ তৈরি হবে, যা পরে রিফাইনারিতে নিয়ে গিয়ে ব্যাটারি মানের লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইডে রূপান্তর করা হবে।

হাউতালা বলেন, এই লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইড ইউরোপের ব্যাটারি শিল্পে সরবরাহ করা হবে। তবে এই মুহূর্তে কোনো গ্রাহকের নাম প্রকাশ করতে পারেননি তিনি।

আরও ছয়টি খনি স্থাপনের পরিকল্পনা

ফিনল্যান্ডের ভূগর্ভে ইউরোপের অন্যতম বড় লিথিয়াম মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশেষজ্ঞ বো ল্যাংব্যাকা। তিনি বলেন, এই অঞ্চলে বিশেষ ধরনের গ্রানাইট রয়েছে, যেখানে এই স্পোডুমিন খনিজ পাওয়া যায়। পাশাপাশি চাহিদা বাড়ায় অন্য কোম্পানিগুলোও এখানে খনিজ অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার খনিশিল্প প্রতিষ্ঠান সিবানিয়ে-স্টিলওয়াটার ২০২১ সাল থেকে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে ও বর্তমানে তাদের মালিকানা প্রায় ৮০ শতাংশ। ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ফিনিশ মিনারেলস গ্রুপের মালিকানা ২০ শতাংশ, আর বাকি অংশ রয়েছে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে।

খনি পরিদর্শনে এসে সিবানিয়ে-স্টিলওয়াটারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড স্টুয়ার্ট বলেন, তুলনামূলকভাবে ছোট এই খনিটি প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও এটি ইউরোপে তাদের প্রথম বড় বিনিয়োগ।

কেলিবার প্রকল্পটি ৫০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। সিভাজারভি খনির পাশাপাশি আরও ছয়টি খনি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় চার হাজার জনসংখ্যার কউস্টিনেন শহরে এই প্রকল্প নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বলে জানান স্থানীয় সঙ্গীত শিক্ষক পিলভি ইয়ারভেলা।

পিলভি ইয়ারভেলা বলেন, কর্মসংস্থানের দিক থেকে এটি ইতিবাচক। তবে মানুষ পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন।

উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপ

এই প্রকল্পে প্রায় ৩০০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাউতালা। এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ের নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। কোক্কোলা বন্দরের কাছে নতুন লিথিয়াম রিফাইনারি প্ল্যান্ট এলাকায় আপাতত কম কার্যক্রম দেখা গেছে।

রিফাইনারির প্রযুক্তি পরিচালক সামি হেইক্কিনেন জানান, তারা এরই মধ্যে পানি দিয়ে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছেন। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ তারা প্রথম ব্যাগ প্যাক করতে পারবেন। চূড়ান্ত পণ্যটি দেখতে সাদা চিনির দানার মতো হবে, যা ৫০০ বা ১০০০ কেজির ব্যাগে সংরক্ষণ করা হবে।

শোধনাগার পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন ব্যাটারি মানের লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইড উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন হাউতালা।

বিশেষজ্ঞ বো ল্যাংব্যাকার মতে, এই উৎপাদন ইউরোপের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করবে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লিথিয়াম আমদানি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সূত্র: এএফপি

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।