দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

মালিতে বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ক্ষমতা দখল না অন্য কিছু?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৪৮ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মালির সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন সদস্য/ ফাইল ছবি: মালি সশস্ত্র বাহিনী

গত গ্রীষ্মে মালির সামরিক ঘাঁটি ও প্রতিবেশী বুরকিনা ফাসোর প্রধান শহরগুলোতে একের পর এক হামলা চালায় আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারা। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, তারা সিরিয়ার সেই গোষ্ঠীগুলোর মতো হতে চায়, যারা বাশার আল-আসাদের সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা নিয়েছিল।

যদিও এসব হামলায় তারা কিছু সাফল্য পেয়েছিল এবং ‘ঘোস্ট আর্মি’ বা ‘ভূতুড়ে সেনাবাহিনী’ নামে পরিচিতি পায়, তবুও জামায়াত নুসরাত উল-ইসলাম ওয়া আল-মুসলিমিনের (জেএনআইএম) পক্ষে পুরোপুরি মালির সামরিক সরকারকে হারানো কঠিন বলেই মনে করা হয়। কারণ, সরকারকে রক্ষা করতে রাশিয়ার ভাড়াটে সৈন্যরাও রয়েছে।

কতটা ঝুঁকিতে সরকার?

চলতি সপ্তাহে খুব কম মানুষই মনে করছেন, ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলকারী সেনা কর্মকর্তা আসিম গোইতার শাসন খুব বেশিদিন টিকবে। যদিও বেশিরভাগ বিশ্লেষক এখনো বিশ্বাস করেন, বিদ্রোহী ও তাদের অংশীদাররা সম্ভবত সরাসরি ক্ষমতা দখলের চেয়ে সরকারের কাছ থেকে নিজেদের দাবি আদায় বা ছাড় পাওয়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দেবে।

আরও পড়ুন>>
মালিতে দেশজুড়ে হামলা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা নিহত
মালিতে কোণঠাসা রাশিয়ার ভাড়াটে সৈন্যরা
মালিতে দেশজুড়ে সশস্ত্র হামলা কারা চালালো?

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মালিতে যে মাত্রার সহিংসতা দেখা গেছে, তা সাহেল অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলটি একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান, চরমপন্থা, মানবিক সংকট এবং যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের নেওয়া সকল সন্ত্রাসবিরোধী ও শান্তি রক্ষা মিশন ব্যর্থ হয়েছে। এরপর থেকে কোনো বিদেশি শক্তিই সেখানে জড়াতে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি।

এ সপ্তাহে জেএনআইএম এবং মালির তুয়ারেগ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মিত্ররা যে যৌথ অভিযান শুরু করেছে, তা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সমন্বিত। তারা সরকারি বাহিনী এবং তাদের রুশ সহযোগীদের ওপর অতর্কিত হামলা, গাড়ি বোমা, ড্রোন এবং প্রথাগত অস্ত্রের সাহায্যে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে অন্যতম হলেন মালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদিও কামারা, যিনি কাতি সামরিক শহরের নিজ বাসভবনে একটি আত্মঘাতী হামলায় প্রাণ হারান। সামরিক গোয়েন্দা প্রধানও এই হামলায় নিহত হয়েছেন।

হামলা হয় বামাকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনী পালিয়ে যাওয়ার পর এবং রুশ ভাড়াটে যোদ্ধারা আত্মসমর্পণ করলে জেএনআইএম যোদ্ধা ও তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ শহর কিদালের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই পরাজয়ের ফলে তিন বছর আগে মালি জান্তার পাওয়া একটি বড় প্রতীকী বিজয় ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাহেল প্রজেক্ট ডিরেক্টর জঁ-হার্ভে জেজেকুয়েল এই পরিস্থিতিকে ‘সংঘাতের একটি বড় ধরনের বিস্তার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গত কয়েক বছর ধরে মালির প্রধান শহরগুলোতে হামলা চালানোর যে কৌশল নিচ্ছিল, এটি তার একটি নতুন ধাপ।

কেন বাড়ছে সহিংসতা?

সহিংসতার এই নতুন ঢেউয়ের পেছনে গভীর কিছু কারণ রয়েছে। সাহেল অঞ্চলটি চরমপন্থার বিস্তারের জন্য সব ধরনের উপাদানে পূর্ণ: চরম দারিদ্র্য, অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং কয়েক দশকের সংঘাতের ইতিহাস, যার ফলে সেখানে অস্ত্রের বিশাল মজুত তৈরি হয়েছে। গত বছর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটেছে মাত্র পাঁচটি দেশে, যার মধ্যে তিনটি দেশই সাহেল অঞ্চলে অবস্থিত।

আরেকটি প্রভাবক হলো সামরিক বাহিনী এবং রুশ ভাড়াটে যোদ্ধাদের চালানো অত্যন্ত নির্মম দমন-পীড়ন নীতি এবং সর্বোপরি জনগণের মৌলিক সেবা ও নিরাপত্তা দিতে সরকারের ব্যর্থতা। একের পর এক দেশে বিদ্রোহীরা এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়েছে। তারা জনগণকে সুরক্ষা ও মৌলিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে এবং কঠোর নিয়ম ও কর্তৃত্ব মেনে নিতে বাধ্য করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।

তাদের অভিযানের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। কারণ জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে তরুণদের নিয়োগ দেওয়া যায় এবং প্রভাব বিস্তারের জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা যায়। রাস্তা এবং নদীপথের নিয়ন্ত্রণ থাকলে যাতায়াতের ওপর কর বসানো যায় এবং লাভজনক চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

সামনে কী হবে?

জার্মানির কনরাড এডেনাউয়ার ফাউন্ডেশনের সাহেল প্রোগ্রাম পরিচালক উলফ ল্যাসিং বামাকো থেকে জানান, জেএনআইএমের মূল লক্ষ্য হলো মালির ভেতরে একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল গড়ে তোলা, যা তাদের ‘নিজস্ব রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসন’ তৈরি করতে সাহায্য করবে—যেমনটা সিরিয়ায় আল-শারা এবং এইচটিএস করেছিল আসাদ সরকারকে উৎখাতের চূড়ান্ত অভিযানের আগে।

তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে এই রণকৌশলগত জোট আল-কায়েদার সেই কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বিদ্রোহীদের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত বিজয়ের পর এই জোট টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।

ল্যাসিংয়ের মতে, জেএনআইএম এবং অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো সব জায়গার শাসনব্যবস্থার ভিত্তি পরীক্ষা করে দেখছে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না বামাকোর পতন হবে... জেএনআইএম হয়তো বড় বড় শহরগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না, কিন্তু তারা সরকারকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে এবং তাদের মতাদর্শ মেনে নিতে ও আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে পারে।’

তার কথায়, ‘জেএনআইএম দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে খেলছে। তারা কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব আরও ক্ষয় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।