দুবাইয়ে সম্পদের পাহাড় সুদানে গণহত্যায় অভিযুক্ত আরএসএফ নেতাদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৪১ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
দুবাইয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন আরএসএফ নেতা হামদান দাগালো/ ফাইল ছবি: গালফ নিউজ, এএফপি

দুবাইয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন সুদানে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত প্যারামিলিটারি বাহিনীর নেতারা। মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা ‘দ্য সেন্ট্রি’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।

তদন্তে দেখা গেছে, সুদানের আধাসামরিক বাহিনী ‘র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (আরএসএফ)-এর নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো—যিনি ‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত—তার পরিবারের সদস্য, নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের (১৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ড) বেশি মূল্যের ২০টি বিলাসবহুল সম্পত্তি কিনেছে।

সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে চলা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের ফলে বর্তমানে দেশটিতে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির ৫ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের জরুরি সাহায্যের প্রয়োজন এবং অন্তত ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ চরম ক্ষুধার সম্মুখীন।

আরও পড়ুন>>
সুদানের মাটিতে গণহত্যার চিহ্ন, আকাশ থেকে দেখা যায় রক্তের দাগ
সুদানে আরএসএফের তাণ্ডব: খুন-ধর্ষণ-নির্যাতনের ভয়াবহ অভিযোগ
সুদানে বিদ্রোহীদের চীনা ড্রোন-কামান দিচ্ছে আরব আমিরাত: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা

দ্য সেন্ট্রির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফ নেতাদের পরিবার এবং সম্পদের জন্য একটি ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হয়ে উঠেছে। ধারণা করা হয়, এই সম্পদের বেশিরভাগই সুদান থেকে পাচার করা সোনা থেকে অর্জিত। ২০১৭ সালে হেমেদতি দারফুরের বৃহত্তম সোনার খনি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর তার পরিবার সোনা রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক সংস্থাগুলোর একটি নেটওয়ার্ক পাচার করা সোনাকে নগদ ডলারে রূপান্তর করতে আরএসএফ নেতাদের সহায়তা করেছে। মূল্যবান এই ধাতুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলো দুবাই, যেখানে বর্তমানে সোনার দাম রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে।

দ্য সেন্ট্রির জ্যেষ্ঠ তদন্তকারী নিক ডোনোভান বলেন, অস্ত্র সরবরাহ করার পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে তাদের আধাসামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের অংশবিশেষ দুবাইয়ে পরিচালনা করার সুযোগ দিচ্ছে। আমাদের তদন্ত বলছে, দাগালো পরিবার আমিরাতে তাদের সম্পদের জন্য নিরাপদ স্বর্গ খুঁজে পেয়েছে।

আরএসএফের প্রধান বিদেশি মদতদাতা হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও ভাড়াটে সেনা সরবরাহের ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও দেশটি তা অস্বীকার করে আসছে।

ফাঁস হওয়া রিয়েল এস্টেট রেকর্ডের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আরএসএফ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও হেমেদতির পরিবারের মালিকানাধীন সম্পত্তির মূল্য প্রায় ৭৪ লাখ পাউন্ড। এছাড়া আরএসএফ সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মালিকানাধীন সম্পত্তির মূল্য আরও ১ কোটি ৩ লাখ পাউন্ড।

হেমেদতির আত্মীয়রা দুবাইয়ের মেইদান রেসকোর্সের কাছে একটি সুরক্ষিত এলাকায় বিলাসবহুল ছয় বেডরুমের ভিলা কিনেছেন। এই ভিলাগুলো কেনা হয়েছে আমিরাতে নিবন্ধিত ‘প্রডিজিয়াস রিয়েল এস্টেট ম্যানেজমেন্ট সুপারভিশন সার্ভিসেস’-এর মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে দুবাইয়ের সোনা ব্যবসার যোগসূত্র রয়েছে এবং আরএসএফকে অর্থ ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের দায়ে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ফোন রেকর্ড এবং পাসপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাগালো পরিবারের আত্মীয়রা ওই সুরক্ষিত এলাকাতেই বসবাস করছেন। এছাড়া তদন্তে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার ছয় মাস পর হেমেদতির স্ত্রী দুবাইয়ের ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ ক্লাবের কাছে প্রায় ৬ লাখ ২৭ হাজার পাউন্ড দিয়ে একখণ্ড জমি কিনেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত মুস্তফা ইব্রাহিম আবদেল নবী মোহাম্মদ—যিনি দাগালো পরিবারের আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত—দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারে ৫ লাখ ১৬ হাজার পাউন্ড মূল্যের একটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক বলে জানা গেছে।

তবে দাগালো পরিবার নির্দিষ্ট কোনো সম্পত্তির মালিকানার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং দাবি করেছে, তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ বৈধভাবে অর্জিত। তারা আরও জানায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা গবাদি পশু ব্যবসার মতো বৈধ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত।

মুস্তফা ইব্রাহিম দ্য সেন্ট্রিকে জানিয়েছেন, তিনি আরএসএফের আর্থিক উপদেষ্টা নন, বরং ২০১৭ সাল থেকে তিনি ‘আর্থিক পরিচালক’ হিসেবে কাজ করছেন যখন আরএসএফ সুদানের আইনের অধীনে একটি বৈধ সংস্থা ছিল। তিনি আরও দাবি করেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি এমন কোনো কাজে লিপ্ত হননি যা সুদানের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বরাবরের মতোই আরএসএফকে অস্ত্র বা অর্থ সহায়তা দেওয়ার দাবি ‘স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান’ করেছে।

আরএসএফ বর্তমানে হেমেদতি এবং তার দুই ভাই আবদেলরহিম ও আলগোনির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাদের সবার ওপরই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত বছর এল ফাশের শহরে আরএসএফের হামলার ধরন ছিল ‘গণহত্যামূলক’। গত সপ্তাহে প্রকাশিত পৃথক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থনপুষ্ট কলাম্বিয়ান ভাড়াটে যোদ্ধাদের একটি নেটওয়ার্ক এল ফাশের পতনের সময় আরএসএফকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছিল।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।