প্রেস টিভি’র অনুসন্ধান
ইরান ও ফিলিস্তিন যুদ্ধের অদৃশ্য স্থপতি মার্কিন ‘প্যালান্টির’ প্রযুক্তি
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বিপজ্জনক অস্ত্র গুলি বা ড্রোন নয় বরং অ্যালগরিদম। আর এই অ্যালগরিদম ডেটা নিয়ন্ত্রণ করছে প্যালান্টির টেকনোলজি। এই কোম্পানিটি একসময় ‘পশ্চিমকে রক্ষা’ করার আদর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে প্যালান্টির এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম ও বৈশ্বিক নজরদারির একটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
প্যালান্টির কী?
প্যালান্টির একটি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানি যা মূলত ডেটা অ্যানালিটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি করে।

সহজভাবে বললে প্যালান্টির এমন সফটওয়্যার বানায় যা বিশাল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতে সাহায্য করে-বিশেষ করে সরকার, সামরিক বাহিনী ও বড় কোম্পানির জন্য এটি কাজ করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) এবং গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ছাড়াও বিভিন্ন বড় কর্পোরেশন এর প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে।
প্যালান্টির গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার হচ্ছে- গোথাম (গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা) এবং ফাউন্ড্রাই (ব্যবসা ও ডেটা বিশ্লেষণ)।
এই কোম্পানিটি একদিকে একটি বেসরকারি করপোরেশন অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বিশাল সামরিক চুক্তি, যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যালগরিদম-নির্ভর সিদ্ধান্ত, এবং নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তারের মাধ্যমে এটি আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে।
যুদ্ধের অদৃশ্য স্থপতি ‘প্যালান্টির’
প্যালান্টিরের সিইও অ্যালেক্স কার্প একবার সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমাদের পণ্য মানুষ হত্যায় ব্যবহৃত হয়।’
প্রচলিত প্রতিরক্ষা কোম্পানির মতো ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি না করলেও প্যালান্টির এমন সফটওয়্যার তৈরি করে যা বলে দেয় কোথায় আঘাত করতে হবে এবং কাকে লক্ষ্য বানাতে হবে।

প্যালান্টির অর্থনৈতিক শক্তি
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্যালান্টিরকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি দেয় যা এটিকে সামরিক ডিজিটাল অবকাঠামোর প্রধান সরবরাহকারী বানিয়ে তোলে। এই ধরনের সরকারি চুক্তি কোম্পানিটির দ্রুত আয় বৃদ্ধি ও প্রভাব বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যালগরিদম
গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধে প্যালান্টিরের প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে। গাজায় এই কোম্পানির কার্যক্রম বিতর্কিত হওয়ার মূল কারণ বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ। তবে ইউক্রেনে এটি প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই দুটি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি একই শুধু ব্যবহারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

‘প্রথম এআই যুদ্ধ’ ও ইরান
২০২৬ সালে কথিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’–তে প্যালান্টিরের সফটওয়্যার ব্যবহার করে হাজার হাজার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। আগের তুলনায় কয়েক হাজার মানুষের কাজ এখন কয়েক ডজন সৈন্য করতে পারে।
একই সঙ্গে লক্ষ্য শনাক্ত করতে সময় হ্রাস পেয়ে ঘণ্টা থেকে মিনিটে নেমে এসেছে। এতে মানবিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরান প্রথমবারের মতো প্যালান্টিরকে সামরিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর অর্থ-যদি সফটওয়্যার যুদ্ধ পরিচালনা করে, তাহলে সেই সফটওয়্যারের অবকাঠামোও আক্রমণের লক্ষ্য হতে পারে।
দেশীয় ব্যবহারে বিস্তার
প্যালান্টিরের প্রযুক্তি শুধু যুদ্ধেই নয়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নজরদারিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। পুলিশের ডাটাবেস বিশ্লেষণ
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকদের তথ্য পর্যবেক্ষণে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কেএম