হরমুজ প্রণালি কবে আবার বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ‘নিরাপদ’ হবে?
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয় এই প্রণালি দিয়ে।
প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে এবং এতে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা বাড়ছে।
প্রায় ২ হাজার জাহাজ উপসাগরে আটকে রয়েছে, যেগুলো পারাপারের অনুমতির অপেক্ষায়। তবে প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও নৌপরিবহনে নানা বাধা থেকে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরান যে মাইন বসিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তা পরিষ্কার করতে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এ কারণেই মার্চ মাসে সামুদ্রিক বিমা কোম্পানিগুলো প্রণালি দিয়ে যাওয়া ট্যাংকারের জন্য ‘যুদ্ধঝুঁকি’ বিমা বাতিল করে।
হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটছে?
২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের সামরিক বাহিনী প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। প্রণালিটি ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত।
১১ এপ্রিল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় এই প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তেহরান, তবে ওই আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি।
দুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দর ও হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ আটক বা ফিরিয়ে দিচ্ছে, যা তেহরান ‘দস্যুতা’ বলে অভিহিত করেছে।
এর আগে ইরান কিছু ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশের জাহাজ—যেমন ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের জাহাজ—নির্দিষ্ট শর্তে চলাচলের অনুমতি দিতো। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ না তোলা পর্যন্ত সব বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের জন্য প্রণালিটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে, ইরান একটি মানচিত্র প্রকাশ করে দেখিয়েছে কোথায় মাইন পাতা হয়েছে এবং অনুমোদিত জাহাজের জন্য বিকল্প রুটও জানিয়েছে, যা ইরানের উপকূলের কাছাকাছি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছেন, প্রণালিতে মাইন বসানোর চেষ্টা করা যে কোনো নৌযানকে গুলি করে ধ্বংস করতে। একই সঙ্গে মাইন অপসারণ কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বন্ধ হওয়া বৈশ্বিক বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
মাইন পরিষ্কার করতে কত সময় লাগবে?
১১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র মাইন অপসারণ অভিযান শুরু করে। দুটি যুদ্ধজাহাজ এতে অংশ নেয় এবং পরে পানির নিচে চলা ড্রোন যুক্ত হয়।
২১ এপ্রিল মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানান, পুরো প্রণালি থেকে মাইন সরাতে ছয় মাস সময় লাগতে পারে এবং যুদ্ধ শেষ না হলে এ কাজ পুরোপুরি শুরু নাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে মাইন অপসারণ প্রায় অসম্ভব। সামান্য ঝুঁকিও থাকলে বিমা কোম্পানিগুলো জাহাজ চলাচল অনুমোদন দেবে না।
বিমা কোম্পানির জন্য কতটা নিরাপত্তা প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রণালিকে নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে স্থায়ী শান্তি, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, কোনো হামলা বা জাহাজ জব্দ না হওয়া, মাইন অপসারণ এবং নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বজায় থাকাও জরুরি, যাতে বাজারে আস্থা ফিরে আসে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম