জলবায়ু সংকটে বিশ্ব
২০২৬ সালে ধেয়ে আসছে ভয়াবহ বন্যা
২০২৬ সালে বিরূপ আবহাওয়ার এক রুদ্রমূর্তি দেখতে যাচ্ছে বিশ্ব। একদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে দানা বাঁধছে শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’, অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছে বৃষ্টির ধরন। এর ফলে আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এ বছর এশিয়া থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও আমেরিকা মহাদেশের বড় একটি অংশ ভাসতে পারে নজিরবিহীন বন্যায়।
বন্যার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশ ও অঞ্চল
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর মডেল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে বিশ্বের প্রধান তিনটি মহাদেশে বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি হবে:
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: জনজীবনের বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশ: এ বছর ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের মধ্যে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে এরই মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন জেলায়। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ৩০ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও উজান এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে সুরমা–কুশিয়ারা, ধনু–বাউলাই ও ভূগাই–কংসসহ প্রধান নদীগুলোর পানি বাড়তে পারে। এতে নেত্রকোণা জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারত: বর্ষা মৌসুমে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম, মেঘালয় এবং উত্তর ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। এছাড়া মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের মতো বড় শহরগুলো অতিবৃষ্টির কারণে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
পাকিস্তান: সিন্ধু নদের অববাহিকায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও বিধ্বংসী বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও হিমবাহ গলার ফলে খাইবার পাখতুনখোয়া ও সিন্ধু প্রদেশে মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশগুলোতে অতিবৃষ্টির ফলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে জাকার্তা ও ব্যাংকক সংলগ্ন নিচু এলাকাগুলোতে।
আফ্রিকা মহাদেশ: মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
নাইজেরিয়া: বছরের দ্বিতীয়ার্ধে নাইজার ও বেনু নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ৩২টি রাজ্যের একটি বিশাল অংশ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পূর্ব আফ্রিকা (কেনিয়া, উগান্ডা ও ইথিওপিয়া): ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাবে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অস্বাভাবিক বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাম্বিয়া: এই দেশগুলোতে কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলো অতিবৃষ্টির কবলে পড়তে পারে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা: উপকূল ও নগরে হানা
ব্রাজিল: দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (মিনাস গেরাইস ও সাও পাওলো) রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও মাটি ধসে প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র: আটলান্টিক ও উপসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ‘হাই টাইড ফ্লাডিং’ বা জোয়ারজনিত বন্যার দিন সংখ্যা এ বছর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
পেরু ও ইকুয়েডর: এল নিনোর সরাসরি প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভারী বর্ষণ ও উপকূলীয় বন্যার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
ইউরোপ: দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডস: ইউরোপের এই দেশগুলোতে ২০২৬ সালের শুরুতে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা এবং শহরগুলোতে জলাবদ্ধতার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
জার্মানি ও বেলজিয়াম: ইউরোপের এই অংশে রাইন ও দানিয়ুব নদীর পানি উপচে বড় ধরনের বন্যার শঙ্কা প্রকাশ করেছে ইইউর জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা। বৃষ্টির ধরন পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলগুলোতে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে।
কেন এই রুদ্রমূর্তি?
বিশেষজ্ঞরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রধানত তিনটি কারণকে দায়ী করছেন:
সুপার এল নিনো: ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়ে ‘সুপার এল নিনো’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়ে কোনো অঞ্চলে চরম খরা, আবার কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টি দেখা দেয়।
আর্দ্র বায়ুমণ্ডল: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডল এখন অনেক বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে। এর ফলে অল্প সময়ে বিশাল পরিমাণ বৃষ্টি ঝরছে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘রেইন বোম্ব’।
পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ: এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জলাশয় ভরাট করে শহর গড়ে তোলায় সাধারণ বৃষ্টিও দ্রুত ভয়াবহ বন্যার রূপ নিচ্ছে।
প্রয়োজন প্রস্তুতির
এসব বন্যায় কেবল প্রাণহানিই নয়, দেখা দিচ্ছে তীব্র খাদ্য সংকট। দুর্যোগে দক্ষিণ এশিয়ায় ধান ও গমের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, ২০২৬ সাল হতে যাচ্ছে প্রকৃতির এক চরম পরীক্ষার বছর। সময়মতো প্রস্তুতি নিতে না পারলে এই বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অনেক দেশের জন্যই কঠিন হয়ে পড়বে।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, বিবিসি, ডব্লিউএমও, ডেইলি টাইমস
কেএএ/