জানেন কি? আপনার পানির ৯৮% মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে পারে শজনে বীজ
পৃথিবীর অন্যতম পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত শজনে গাছ, যাকে অনেকেই ‘মিরাকল ট্রি’ বা অলৌকিক গাছ বলে থাকেন। এর ঔষধি গুণের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই এটি সমাদৃত। তবে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে আরও চমকপ্রদ তথ্য। এই গাছ পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতেও অত্যন্ত কার্যকর।
শজনে বীজের নির্যাস পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিকের মতোই কার্যকর- এমনটাই জানিয়েছেন ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী। তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের এপ্রিলে।
গবেষণার সহ-লেখক ও আদ্রিয়ানো গনসালভেস দোস রেইস জানান, হাজার বছর ধরে পানি পরিশোধনে শজনে গাছ ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিশরীয় সভ্যতাতেও এই গাছের ব্যবহার দেখা যায়। তিনি সাউ পাউলো স্টেট ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক।
গবেষকরা গত এক দশক ধরে শজনে বীজ নিয়ে কাজ করছেন, বিশেষ করে এটি কীভাবে ‘কোয়াগুল্যান্ট’ বা এমন এক পদার্থ হিসেবে কাজ করে, যা পানির ক্ষুদ্র কণাগুলোকে একত্র করে বড় দানায় পরিণত করে, ফলে সেগুলো সহজে ফিল্টার করা যায়। পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বাড়তি উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় তারা এই বীজের সম্ভাবনা যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা, যার আকার এক ইঞ্চির ২৫ হাজার ভাগের এক ভাগ (প্রায় ১ মাইক্রোমিটার) পর্যন্ত হতে পারে। এটি প্লাস্টিক দূষণের একটি ভয়াবহ অংশ।
গভীর সমুদ্র থেকে শুরু করে উঁচু পাহাড় পর্যন্ত- পৃথিবীর সর্বত্র এই ক্ষুদ্র কণাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে। খাদ্য ও পানিতে এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষিত কলের পানির ৮৩ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এমনকি, এটি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করেছে- মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ ও হৃদপিন্ডতেও এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে প্রাণির ওপর গবেষণায় দেখা গেছে এটি প্রজনন সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর নজর দেন, কারণ এগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক ও পানিতে বেশি পাওয়া যায়।
গবেষকরা প্রায় ১৮.৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে পরীক্ষা চালান, যা মানুষের চুলের গড় পুরুত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এতে দেখা যায়, শজনে বীজের নির্যাস ব্যবহার করে ফিল্টার করলে কলের পানি থেকে ৯৮.৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করা সম্ভব। এই দক্ষতা বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক অ্যালুমিনিয়াম সালফেট বা ‘অ্যালাম’-এর প্রায় সমতুল্য। এমনকি, ক্ষারীয় পানিতে শজনে বীজ আরও ভালো কাজ করেছে।
শজনে বীজ ব্যবহারের বড় সুবিধা হলো এটি নবায়নযোগ্য, সহজে পচনশীল, কম বর্জ্য তৈরি করে ও বিষাক্ততার ঝুঁকি কম। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম উচ্চ মাত্রায় বিষাক্ত হতে পারে ও স্নায়বিক রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ম্যাথিউ ক্যামপেন নামে এক গবেষক বলেন, প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক ফিল্টারিংয়ের বিকল্প তৈরি করা সস্তা ও টেকসই সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি এতে অ্যালুমিনিয়াম খননের প্রয়োজন কমবে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
তবে প্রাকৃতিক এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শজনে বীজ দিয়ে প্রায় ১০ লিটার পানি পরিশোধন করা যায়। গবেষকদের মতে, বড় শহরের পানি শোধনাগারে এটি ব্যবহার করতে হলে বিপুল পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হবে। তাই এটি ছোট সম্প্রদায় বা যেখানে রাসায়নিক সহজলভ্য নয়, সেখানে বেশি কার্যকর হতে পারে।
আরেকটি সম্ভাব্য সমস্যা হলো- বেশি বীজ ব্যবহার করলে পানিতে জৈব বর্জ্য বাড়তে পারে, যা পরে অপসারণ করতে হবে।
গবেষকরা বলছেন, সজনে বীজের নির্যাস কীভাবে ভেঙে যায়, পিভিসি কণার কী হয় ও এই পদ্ধতি বড় পরিসরে কতটা কার্যকর ও সাশ্রয়ী হবে, তা জানতে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এছাড়া অন্যান্য ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানো প্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
ন্যানো প্লাস্টিক আরও ক্ষুদ্র, যা মানুষের চুলের গড় প্রস্থের প্রায় এক হাজার ভাগের এক ভাগ এবং এগুলো সহজেই মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।
তবে গবেষক আদ্রিয়ানো গনসালভেস দোস রেইস আশাবাদী, শজনে বীজ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক অপসারণেও কার্যকর হবে ও এ নিয়েই ভবিষ্যৎ গবেষণা চলছে। ম্যাথিউ ক্যামপেন বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করার সমাধান এখন খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষের শরীরে এর উপস্থিতি বাড়ছেই ও এই প্রবণতা আগামী কয়েক দশকেও বদলাবে না।
সূত্র: সিএনএন
এসএএইচ