পশ্চিমবঙ্গ কি তাহলে গুজরাট বা উত্তর প্রদেশ মডেলে চলবে?
ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে দলটি। ২০১৬ সালের বিধানসভায় কোনো আসন না পাওয়া দলটি ২০২৬ সালে এসে ২০০টির বেশি আসনে জয়লাভ করলো। বিজেপির নির্বাচনি প্রচারণার কেন্দ্রে ছিল হিন্দুত্ববাদ। অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের বাদ দিয়ে হিন্দুদের একত্রিত করা। এই নীতি প্রয়োগ করে গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশ ও আসামে ক্ষমতা ধরে রেখেছে বিজেপি। যার নেতৃত্বে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে গুজরাট বা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে বিজেপি যে হিন্দুত্ববাদের আদর্শ বাস্তবায়ন করছে একই নীতি পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োগ করা হবে কি না? অর্থাৎ সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্মীয় রীতি পালন করতে পারবে কি না, তাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হবে কি না? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হবে কি না? বিশেষ করে মুসলিমদের ক্ষেত্রে গুজরাট ও উত্তরপ্রেদেশে যে দমননীতি চালানো হয় তা পশ্চিমবঙ্গেও ফিরে আসবে কি না?
ভারতের সাম্প্রদায়িক ইতিহাসে বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা দুটি অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা। তাদের দাবি ছিল, মসজিদটি হিন্দু দেবতা রামের জন্মস্থানের ওপর নির্মিত হয়েছিল। মসজিদ ধ্বংসের পর ভারতজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। এ ঘটনা ভারতের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
এর এক দশক পর, ২০০২ সালে গুজরাটে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে। গোদরাতে ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনায় ৫৯ জন করসেবক নিহত হওয়ার পর মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা শুরু হয়। সরকারি হিসেবে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
ওই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আজকের ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিরোধীরা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
গোদরা শহরে মুসলিমরা এখনো নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে কোনো মুসলিম যুবক পুলিশের হাতে আটক হলে স্থানীয় কেউ বা কোনো আইনজীবী তাকে সহায়তা করার সাহস পান না।
গুজরাট হলো নরেন্দ্র মোদীর নিজ রাজ্য। রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার পরীক্ষামূলক কৌশল প্রথম গুজরাটেই প্রয়োগ শুরু করে বিজেপি। অনেকেই মনে করেন মোদীর গুজরাট মডেল ছিল সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে, যা পরে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার পথে মোদী হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনাকে সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলার নামে সহিংসতার প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বিজেপি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয় বলেও অনেকে মনে করেন।
সেই একই মডেল সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির কেন্দ্রস্থল পশ্চিমবঙ্গেও কয়েক বছর ধরে অনেকটাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে বিজেপি। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান লক্ষ্যই হলো হিন্দু মুসলিমকে ভাগ করে দেওয়া। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহদের প্রায় প্রতিটি বক্তব্যে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিশেষ করে তাদের বাহিরাগত বা রোহিঙ্গা বলে উল্লেখ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ মুসলমানরা এক সময় দখল করে নেবে বলেও উসকানি দেওয়া হয়।
নির্বাচনে জয়ের পর তাদের পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নেতা তথা অন্যতম মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারি তো বলেই ফেললেন এই জয় হিন্দুদের জয়। মুসলিমরা বিজেপিকে ভোট দেয়নি।
শুধু যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েই বিজেপি নেতারা সীমাবদ্ধ থাকছেন তাই নয়। এরই মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মুসলিমের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। যার সমালোচনা ভারতজুড়ে চলছে।
নির্বাচনের আগে অমিত শাহ হুমকি দিয়ে বলেন, মুর্শিদাবাদে হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে যে বাবরি মসজিদের নির্মাণ কাজ চলছে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মুসলমানদের স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
কলকাতার নিউমার্কেট চত্বরের হক মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয় এবং মাংসের দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কলকাতা নিউমার্কেট চত্বরের বিভিন্ন ছোট ছোট ব্যবসায়ী এবং রাস্তার হকারদের দোকানও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত থানার অন্তর্গত নোয়াপাড়া অঞ্চলের ‘মসজিদবাড়ি রোডের’ নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘নেতাজি পল্লী রোড’। পাশাপাশি বারাসাতের ‘সিরাজ উদ্যান’ পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শিবাজী উদ্যান’।
জানা গেছে, বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরই মঙ্গলবার (৫ মে) বারাসাতের ময়না অঞ্চলে মসজিদ বাড়ির রোড নামে একটি গেটের সামনে জড়ো হন বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা। তাদের মধ্যে কয়েকজন একটি মই নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে ‘মসজিদ বাড়ি রোড’ লেখা নামফলক ভাঙতে শুরু করেন। নামফলক ভাঙার পরে বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা সেখানে ‘নেতাজি পল্লী রোড’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন। জোরপূর্বক নাম লেখার পর বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা উচ্চস্বরে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেন।
এই ধরনের সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ভারতের উত্তরপ্রদেশে। যেখানে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়না। কথায় কথায় মুসলমানদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ধ্বংষ করে দেওয় হয়। শুধু বাড়ি নয়, অনেক ধর্মীয় স্থাপনাও তাদের বুলডোজার থেকে রেহাই পায় না।
শুধু মাংস খাওয়ার অভিযোগে সংখ্যালঘুদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। প্রদেশটিতে নারীদেরও কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রায়ই লোমহর্ষক ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হলেন যোগী আদিত্যনাথ। যিনি উগ্রহিন্দুত্ববাদী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেই আদিত্যনাথও এবার পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন বিজেপির হয়ে প্রচারণা চালাতে।
ভারতের আরেকটি রাজ্য আসাম। যেখানে পশ্চিমঙ্গের মতোই লাখ লাখ মুসলিমদের নাম ভোটের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেখানে তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিজেপির হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তার রাজ্যেও সংখ্যালঘুরা গুজরাট, উত্তরপ্রদেশের মতো হত্যাচারের শিকার হচ্ছেন।
পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে মুসলিমবিরোধী প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে কাজ করে বলে বিশ্লেষকদের মত। নির্বাচনি প্রচারে প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ বিজেপি নেতারা মুসলিমদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবেও আখ্যা দেন এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে হিন্দু ভোট একত্রিত করার আহ্বান জানান।
মাছ ও মাংসভিত্তিক খাদ্যসংস্কৃতির জন্য পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে নিরামিষবাদ চাপিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গ কী গুজরাট বা উত্তরপ্রদেশ মডেলে চলবে। সেই প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।
এমএসএম