নিজের খোঁড়া গর্তে যেভাবে আটকা পড়েছেন ট্রাম্প
যদি কথায় যুদ্ধ জেতা যেত, তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান সংঘাত অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত।
কিন্তু যে যুদ্ধ দেড় মাসের বেশি স্থায়ী হবে না বলে ধারণা করা হয়েছিল, সেটি এখন ১০ম সপ্তাহে গড়াচ্ছে, আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনো এর থেকে বের হওয়ার কোনো স্পষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
ট্রাম্প এখন নিজেরই তৈরি দুটি বড় ফাঁদে আটকে আছেন—একটি ভূরাজনৈতিক, অন্যটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব এবং শান্তি প্রস্তাব না মানার অবস্থান তাকে এমনভাবে আটকে রেখেছে যে, গ্রহণযোগ্য সামরিক মূল্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। ৩০ শতাংশের ঘরে নেমে আসা জনপ্রিয়তা, গ্যাসের দাম গড়ে ৪.৫০ ডলারের বেশি এবং যুদ্ধবিরোধী জনমত বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সুযোগও কমে যাচ্ছে।
ফলে ট্রাম্প এখন কার্যত আটকে আছেন—তিনি বারবার শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির আশাবাদী কথা বলছেন এবং কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সামরিক কৌশল পরিবর্তন করছেন।
সর্বশেষ আশা হলো পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা নথি নিয়ে আলোচনা, যা যুদ্ধ শেষ করার পথ খুলতে পারে এবং পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বড় বিষয়গুলো সমাধানের সময়সূচি নির্ধারণ করবে।
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, শতাব্দীপ্রাচীন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব, জটিল পারমাণবিক আলোচনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো একটি এক পাতার নথি দিয়ে সমাধান করা কঠিন।
ইরান বর্তমানে তাদের জবাব পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিছু সূত্র বলছে, আলোচনাগুলো এখন পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ করার সবচেয়ে কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
ওয়াশিংটন থেকে এই যুদ্ধ ঘিরে কৌশলগত বিভ্রান্তি, হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব দেখা যাচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার প্রায় আকস্মিকভাবে বলেন, অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ। এরপর তিনি আবার ট্রাম্প ঘোষিত আরেকটি অভিযানের পক্ষে কথা বলেন, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রজেক্ট ফ্রিডম স্থগিত হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই সিলভার বুলেট কৌশল (একটি বড় পদক্ষেপে ইরানকে নতি স্বীকার করানো) এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
প্রথমে ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা, পরে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ, এরপর নৌ অবরোধ—কোনোটিই ইরানকে ভাঙতে পারেনি।
ইরান তাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো ভাঙন দেখা যায়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত স্থল অভিযান ও ইরানের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞ ইয়ান লেসার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও তা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত কৌশলগত ফল অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। কারণ ইরান এখনো পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে পুরোপুরি সরে আসার ইঙ্গিত দেয়নি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি করছে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে পুরোপুরি খোলা ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সমাধান অত্যন্ত জরুরি—কারণ যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চিত কৌশল এবং স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
সূত্র: সিএনএন
এমএসএম