ভাঙছে ন্যাটো? বিকল্প সুরক্ষায় ইউরোপের গোপন প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৭ পিএম, ২০ মে ২০২৬
পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো/ ছবি: এক্স@মার্ক রুটে

ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ন্যাটো জোটকে ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পর কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ন্যাটোর বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে গোপনে আলোচনা শুরু করেছে। রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে সন্দেহ এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোপের নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে নতুন চিন্তা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ন্যাটো ছাড়া ইউরোপ কীভাবে যুদ্ধ বা সংকট পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা নিয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছেন।

দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে ন্যাটো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত এই সামরিক জোটের কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই ন্যাটো নিয়ে তার অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র পোল্যান্ডে চার হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে। এর আগে জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের কথাও জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। পাশাপাশি ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।

আরও পড়ুন>>
ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ বন্ধুত্বে ফাটল, ন্যাটোয় ভাঙনের সুর
জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহার, ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাখ্যা চায় ন্যাটো
যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কী?

এই সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে। কারণ এত দিন তাদের ধারণা ছিল, মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমলেও নিজেদের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে।

ন্যাটো নিয়ে উদ্বেগের নতুন মাত্রা

ন্যাটো জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর অনুচ্ছেদ-৫ বা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা। কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের তার সহায়তায় এগিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকেই এই নীতির প্রতি নিজের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বারবার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। এর ফলে ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বিভিন্ন ন্যাটো দেশের সামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, কিছু দেশ এখন এমন পরিস্থিতির পরিকল্পনা করছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র শুধু সাহায্য না করা নয়, বরং ন্যাটোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করতেও বাধা দিতে পারে।

একজন সুইডিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড সংকট ছিল আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। তখনই বুঝেছি, আমাদের একটি প্ল্যান বি প্রয়োজন।’

যদিও এসব আলোচনা প্রকাশ্যে হচ্ছে না। কারণ কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে যুক্তরাষ্ট্র আরও দ্রুত ন্যাটো থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটোর কমান্ড কাঠামো

শুধু অস্ত্র বা সেনা সংখ্যা বাড়ালেই ন্যাটোর বিকল্প তৈরি সম্ভব নয়। কারণ ন্যাটোর সবচেয়ে বড় শক্তি এর সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থা।

সাধারণ সামরিক জোটে প্রতিটি দেশ আলাদাভাবে অংশ নেয়। কিন্তু ন্যাটো ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। পুরো জোট পরিচালনার দায়িত্ব থাকে একজন সর্বাধিনায়কের হাতে। এই পদটি পরিচিত ‘সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার ইউরোপ’ বা স্যাকিউর নামে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দায়িত্বে থাকেন একজন মার্কিন জেনারেল।

এই কাঠামোর মাধ্যমে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যোগাযোগ ও সমন্বয় সম্ভব হয়।

ব্রাসেলসের নিরাপত্তা বিশ্লেষক লুইস সিমোন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বই জোটকে একত্রে ধরে রাখে। এটি না থাকলে প্রতিরোধ ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নতা দেখা দিতে পারে।’

কী হতে পারে ইউরোপের ‘প্ল্যান বি’

ন্যাটোর বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জয়েন্ট এক্সপিডিশনারি ফোর্স (জেইএফ)।

২০১৪ সালে যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি ন্যাটো সদস্য দেশ এই জোট গঠন করে। বর্তমানে এতে প্রধানত বাল্টিক ও নর্ডিক অঞ্চলের ১০টি দেশ রয়েছে।

এই জোটের বিশেষত্ব হলো, ন্যাটোর মতো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বাধ্যবাধকতা এখানে নেই। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো কাঠামো অকার্যকর হলে জেইএফ একটি বিকল্প হতে পারে। কারণ এর নিজস্ব গোয়েন্দা, পরিকল্পনা ও যোগাযোগ সক্ষমতা রয়েছে।

তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জেইএফে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি নেই। আবার, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট ঘাটতি এবং সামরিক সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা নিয়েও মিত্রদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা রসিকতা করে বলেন, ‘যুক্তরাজ্য হলো সবার প্রিয় ধনী চাচার মতো, যে ‘ডাউনটন অ্যাবি’ সিন্ড্রোমে ভুগছে—আভিজাত্যের ভান ধরে রাখলেও পকেটে পর্যাপ্ত টাকা নেই।’

ইউরোপের সামনে নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি ইউরোপকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এত দিন ইউরোপের প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি। কিন্তু এখন ইউরোপকে হয় বিদ্যমান ন্যাটো কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে, নয়তো বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, উত্তর ইউরোপের বাল্টিক, নর্ডিক অঞ্চল এবং পোল্যান্ডকে কেন্দ্র করে নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ে উঠতে পারে। কারণ এসব দেশের রাশিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রায় একই ধরনের।

সম্ভাব্য প্রভাব

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা পরিবেশ আমূল বদলে দিয়েছে। সেই যুদ্ধের পর ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেয়। ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয়ও বেড়েছে।

কিন্তু ন্যাটো নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা ইউরোপের নিরাপত্তা কৌশলে আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তার সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনে, তাহলে ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যে প্রতিরোধব্যবস্থা সংকটের সময়ে পাশে থাকবে কি না, তা নিয়েই যদি সন্দেহ তৈরি হয়, তবে সেটি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে কাজ করা কঠিন। আর সেই কারণেই ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপের বিকল্প নিরাপত্তা পরিকল্পনা এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।