শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে না পারার দোষ কি মায়ের?
মায়ের বুকের দুধকে নবজাতকের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী খাবার বলা হয়। কিন্তু সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে অসংখ্য নারী এমন সমস্যার মুখে পড়েন, যার সমাধানে চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো বিস্ময়করভাবে পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণে অনেক মা ভুল, অকার্যকর কিংবা মানসিকভাবে ক্ষতিকর পরামর্শের শিকার হচ্ছেন।
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১৩ কোটি নারী সন্তান জন্ম দেন। বর্তমানে জীবিত প্রায় ২০০ কোটি নারী ও কিশোরীর মধ্যে ৯০ শতাংশই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মা হওয়ার সম্ভাবনা রাখেন। সন্তান জন্মের পর অধিকাংশ নারী বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু গবেষণা বলছে, এদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে অন্তত দুজন কোনো না কোনো জটিলতার মুখোমুখি হন।
কারও জন্য বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। আবার কারও ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদনই সম্ভব হয় না। কিন্তু চিকিৎসকের কাছ থেকে অনেক সময় তারা এমন পরামর্শ পান, যা হয় অনুমাননির্ভর, নয়তো বাস্তবে খুব একটা কার্যকর নয়।
অবহেলিত এক চিকিৎসাবিজ্ঞান
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মানবদেহের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা বিশেষায়িত শাখা রয়েছে। হৃদ্যন্ত্রের জন্য কার্ডিওলজি, মস্তিষ্কের জন্য নিউরোলজি, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও রয়েছে বিশেষ বিভাগ। কিন্তু স্তন বা দুধ উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে স্বতন্ত্র কোনো চিকিৎসা শাখা কার্যত নেই।
আরও পড়ুন>>
গর্ভধারণ থেকে প্রসব, এই টেস্টগুলো জরুরি
গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ, কীভাবে কমাবেন
চল্লিশের পর মায়েদের স্বাস্থ্য নিয়ে যা বলছেন চিকিৎসক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘ল্যাকটোলজি’ বা স্তন্যদানবিষয়ক বিশেষায়িত শাখার অভাবই বড় সমস্যা তৈরি করছে।
গবেষণার পরিসংখ্যানও এ বৈষম্য তুলে ধরে। চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রের আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ ‘পাবমেড’-এর চার কোটি পেপারের মধ্যে ‘কম দুধ উৎপাদন’ বিষয়ে গবেষণা রয়েছে মাত্র ১৪ হাজার। বিপরীতে, তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ‘ইরেকটাইল ডিসফাংশন’ (পুরুষাঙ্গের শিথিলতা) নিয়ে গবেষণাপত্র রয়েছে ৩২ হাজারের বেশি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত। তবে অধিকাংশ নারী অন্তত চেষ্টা করতে চান। কারণ বুকের দুধ শিশুকে নানা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।
২০১৬ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, যদি সব শিশু বুকের দুধ পেত, তাহলে প্রতি বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৮ লাখ ২৩ হাজার শিশুর মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হতো।
বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে অনেক সময় দূষিত পানি দিয়ে শিশুখাদ্য তৈরি করা হয়। এর ফলে শিশুরা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
প্রাকৃতিক’ মানেই কি সহজ?
স্তন্যদান করাতে গিয়ে মায়েরা কেন ব্যর্থ হচ্ছেন এবং এর বৈজ্ঞানিক সমাধান কী—তা খোঁজার বদলে চিকিৎসকেরা অনেক সময় বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে তারা আন্দাজে ভুল পরামর্শ দেন অথবা মায়েদের ফর্মুলা মিল্ক খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে খালাস পেয়ে যান। ইউরোপের কিছু দেশে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ নবজাতককে হাসপাতাল ছাড়ার আগেই গুঁড়ো দুধ দেওয়া হয়।
প্রেগন্যান্সি কেয়ার বা গর্ভকালীন সেবায় স্তন্যদান নিয়ে আলাপ করা হয় না বললেই চলে। ধারণা করা হয়, যেহেতু এটি একটি ‘প্রাকৃতিক’ বিষয়, তাই মায়েরা এমনিতেই পারবেন। অথচ সন্তান জন্মদানও একটি প্রাকৃতিক বিষয়, কিন্তু তার জন্য ধাত্রী বা প্রসূতি বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই শূন্যতার সুযোগে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘ল্যাকটেশন কনসালট্যান্ট’ বা স্তন্যদান পরামর্শক। সঠিক তথ্যের অভাবে তারা অনেক সময় কেবল নিজেদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে মায়েদের অবৈজ্ঞানিক পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ভুল পরামর্শ ও মায়ের ওপর দোষ চাপানো
অনেক মা পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদন করতে পারলেও তা শিশুর মুখে টেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। তাদের ক্ষেত্রে ব্রেস্টপাম্প ব্যবহার বা শিশুকে বারবার স্তন্যদানের পদ্ধতি কাজে দিতে পারে। কিন্তু যাদের শরীরে আসলেই পর্যাপ্ত দুধ তৈরি হচ্ছে না, তাদের সমস্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকেরা মনে করতেন, মাত্র পাঁচ শতাংশ মা পর্যাপ্ত দুধ তৈরি করতে পারেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই হার আসলে ১০ থেকে ২০ শতাংশ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, স্তনে কম দুধ উৎপাদনের পেছনে রয়েছে নারীদের হরমোন, জেনেটিক্স, স্থূলতা, ডায়াবেটিস বা অটোইমিউন ডিসঅর্ডারের মতো জটিল জৈবিক কারণ। এগুলো কোনো মায়ের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তবু অনেক মাকে পরামর্শ দেওয়া হয়—দিনে অন্তত আটবার ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহার করুন, শিশুকে আরও বেশি দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
অথচ এই কঠোর নিয়মের পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এত কষ্টের পরেও যখন মায়েরা সফল হন না, তখন তাদের ওপরই দোষ চাপানো হয়। বলা হয়, ‘চেষ্টার অভাব’ ছিল।
অথচ বাস্তবতা হলো, মায়েরা তাদের সন্তানদের প্রতি অবহেলা করেননি; বরং চিকিৎসা বিজ্ঞানই মায়েদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
সুতরাং, স্তন্যদান–সংক্রান্ত সমস্যাকে আর ‘স্বাভাবিক’ বলে ধরে নেওয়া যাবে না। বরং এ ক্ষেত্রকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সময় এসেছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/