রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরব কেন সুচি
দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র থেকে যখন হাজার হাজার রোহিঙ্গা অধিবাসী নৌকায় ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তখন সারা বিশ্বব্যাপী এই মানবিক ট্রাজেডি ব্যাপক সাড়া ফেলে। সমুদ্রে ভাসমান নারী ও শিশুদের উদ্ধারে অনেকে উচ্চকণ্ঠেও আওয়াজ তুলেছেন। কিন্তু একটি বিষয় বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে তা হলো শান্তিতে নোবেল পাওয়া মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী আং সাং সুচির নিরবতা।
এতো কিছু হওয়ার পরেও তিনি কিভাবে নিশ্চুপ থাকতে পারেন -তা নিয়ে বিশ্বে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। নিজের দেশের সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে কিভাবে চুপ করে থাকেন শান্তিতে নোবেল পাওয়া এই নারী?
এই ব্যাপারে গত ১৮ মে সুচির মুখপাত্র গণমাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান। মানবিক কারণে তারা দেশে প্রবেশ করে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যার সমাধান করার কথা বলেন তিনি।
তবে এই ব্যাপারে তাদের দলের উপর মহল থেকে পরিস্কার কিছুই বলা হয়নি। ২০১৩ সালে মুসলিম-বৌদ্ধ সংঘর্ষের সময় আং সান সুচি নিজেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনিচ্ছার কথা স্বীকার করেন। তিনি ভীতু ছিলেন তার যেকোনো মন্তব্য সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার আরো তীব্রতর হতে পারে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গা সংখ্যা ঘনিষ্টতা থাকায় বৌদ্ধ-রোহিঙ্গা দ্বন্দ্ব ছিলো।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এখন বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ বিস্তার লাভ করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে জাতিগত দ্বন্ধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
জাতীয়তাবাদীরা আং সান সুচিকে মুসলমানদের জন্য ত্রাণকর্তা হিসেবে পেশ করতে চেষ্টা করছে। এদিকে দেশের নব্বই ভাগ বৌদ্ধ-রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোন প্রকারের আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তারা মনে করে এই সমস্যার সমাধান হলে ছয় মাসের মধ্যে গণন্ত্রের হত্যা করে সেনা শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
আং সাং সুচির ঘনিষ্ট এক সূত্র বলছে, চলমান সমস্যা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতারা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তিনি বলেন, মুসলমানদের প্রতি সরকারের পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং বিশ্বাস নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সামলানোর একটি কৌশল মাত্র।
কিছু পর্যবেক্ষকদের মতে, আং সাং সুচি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কথা বলা তাদের রাজনৈতিক স্বর্থের মধ্যে পড়ে না।
অস্ট্রেলিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মিয়ানমার রিচার্স সেন্টারের পরিচালক নিকোলাস ফারিলি মনে করেন, সুচির এই রাজনৈতিক কৌশল, নির্বাচনী ভোটা সংখ্যা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
এই ইস্যুতে যেকোনো নেতিবাচক সিদ্ধান্ত ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির অনেকগুলো মুসলিম ভোট কমে যেতে পারে, যার কারণে সুচি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখনো চুপ রয়েছেন বলে মনে করেন নিকোলাস।
রোহিঙ্গাদের ভোটের তুলনায় বৌদ্ধদের ভোটের সংখ্যা অনেক বেশি কাজেই রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বলে ভোট হারাতে চাচ্ছে না এনএলডি।
ফলে এনএলডির নেতারা মনে করেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কোন কঠোর এবং বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পর গত মঙ্গলবার দেশটির গ্লোবাল নিউ লাইট নামের একটি প্রত্রিকায় প্রথম সরকারের নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকার সমালোচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রী ই হুটাটে বলেন, বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড এবং মালোয়েশিয়ায় যে সব রোহিঙ্গা নাগরিক প্রবেশ করেছে বা যারা সাগরে ভাসমান রয়েছে তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে মিয়ানমার সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, যে সব রোহিঙ্গা নাগরিকত্বের প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র দেখাতে পারবে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
অন্যদিকে, আং সাং সুচি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখনো নিরবতা বজায় রেখেছেন। আসন্ন নির্বাচনে নিজের জায়গা ঠিক রাখতে এ ধরনের নিরবতা ধরে রেখেছেন সুচি, এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এসকেডি/আরএস/আরআইপি