তিস্তার উজানে বাঁধ নির্মাণে রুখে দাঁড়িয়েছেন লেপচারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:২১ এএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৮

একদিকে সুউচ্চ কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়া, অন্যদিকে বইছে তিস্তার খরস্রোত। চারদিকে শান্ত সবুজের সমাহার।

এটাই কাঞ্চনজঙ্ঘা রিজার্ভড বায়োস্ফিয়ার অঞ্চল। লেপচা উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত বাসস্থান।

ওই বায়োস্ফিয়ারেরই একটা অঞ্চল জোংগু। সেখানেই হিগিয়াথাং গ্রামে বাস মায়াল্মিত লেপচার।

jagonews24

তিনি বলছিলেন, ‘এই কাঞ্চনজঙ্ঘা, আর এখান দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, রঙ্গীত -এই নদীগুলো হল আমাদের প্রাণ। আমাদের কাছে অতি পবিত্র এই অঞ্চল। আমরা মনে করি কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফ দিয়ে আমাদের শরীর তৈরি আর মৃত্যুর পরে এই নদী বেয়েই পূর্বপুরুষদের কাছে পৌঁছে যায় আমাদের আত্মা।’

তার মতো হাজার চারেক লেপচা উপজাতির মানুষ ওই সংরক্ষিত এলাকায় থাকেন। বাকিরা সিকিমেরই অন্যান্য অঞ্চলে বা দার্জিলিং, নেপাল বা পশ্চিমবঙ্গের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন।

jagonews24

আইন অনুযায়ী লেপচাদের জন্য সংরক্ষিত এই এলাকায় অন্য কেউ স্থায়ী বসতি গড়তে পারে না। কেউ জমিও কিনতে পারে না।

কিন্তু তাদের সেই সংরক্ষিত এলাকাতেই হাজির হয়েছে এক বিপদ। যার বিরুদ্ধে বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রতিবাদে নেমেছেন লেপচা সম্প্রদায়।

তিস্ত আর রঙ্গীতের মতো নদীগুলোতে যেভাবে একের পর এক বাঁধ দেয়া হচ্ছে, তাতে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এই লেপচা জনজাতি।

jagonews24

মায়াল্মিতের কথায়, ‘এসব নদী আমাদের প্রাণ, আমাদের জীবন। যেভাবে বাঁধ দেয়া চলছে, তাতে নদী আটকিয়ে যাবে। এই জল দিয়েই আমরা ধান চাষ করি, মাছ ধরি নদীতে, ফুল-ফলের বাগান করি। আমাদের তো জীবনটাই স্তব্ধ হয়ে যাবে। আমাদের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে।’

সিকিমে এখনও পর্যন্ত ২০টি বাঁধ দেয়া হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য। তার মধ্যে শুধু তিস্তার ওপরেই ইতোমধ্যে চারটি প্রকল্প তৈরি হয়েছে, আরও দুটি তৈরি হওয়ার অপেক্ষায়।

সেই প্রকল্পেরই অন্তর্গত তিস্তা-৪ প্রকল্পটি, যা থেকে ৫২০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।

jagonews24

লেপচা জনজাতিদের একটি সংগঠন এই বাঁধগুলিরই বিরোধিতা করছে বেশ কয়েক বছর ধরে।

জোংগুরই আরেকটি গ্রাম পাসিংডাঙ্গে থাকেন গিৎসো লেপচা। অনেকদিন ধরেই তিনি তিস্তা-৪ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই লড়ছেন।

গিৎসো লেপচা বলেন, ‘কতগুলো বাঁধের জন্য তিস্তা প্রায় শুকিয়ে গেছে। আমাদের বলা হয় যে, এগুলো রান অফ দা রিভার প্রকল্প। কিন্তু আসলে তারা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে সুরঙ্গ দিয়ে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নদীর জল নিয়ে যাচ্ছে। ভূ-বৈজ্ঞানিকরা বার বার বলেছেন- হিমালয় সবথেকে কম বয়সী পর্বতমালার একটা। এখনও তৈরি হচ্ছে। যদি আপনি বর্ষার সময়ে আসেন, দেখতে পাবেন কত জায়গায় ভূমি ধস হয়েছে। সেটা থেকেই বোঝা যায়- এই পাহাড় কতটা নাজুক। এরকম একটা জায়গায় যদি বড় আকারের নির্মাণ কাজ চালতে থাকেন, তাহলে খুব স্বাভাবিক যে গোটা অঞ্চলে আরও বড় বিপদ নেমে আসবে।’

jagonews24

তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যেই তিস্তাকে অনেক জায়গায় আটকিয়ে দেয়া হয়েছে, শেষ জলধারাটা বাঁচিয়ে রাখতেই আমরা লড়াই করছি।’

জাতীয় জলবিদ্যুৎ নিগম, যারা তিস্তার ওপরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি তৈরি করছে, তারাও এই বিপদের সম্বন্ধে অবহিত। তাদের দারি এজন্য আগে থেকেই বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে তারা।

নিগমের চেয়ারম্যান বলরাজ যোশীর বলেন, ‘লেপচা সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য আমরা প্রকল্পের জায়গাটাই বদল করে দিয়েছি। আর এটা রান অফ দা রিভার প্রকল্প, তাই এর জন্য বড় জলাধার প্রয়োজন নেই। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর জলপ্রবাহকে আটকিয়ে রাখা হয়, আর বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেই সেটা আবারও নদীতে ফেরত পাঠানো হয়।’

তবে বলরাজ যোশী এটাও স্বীকার করেন যে, তিস্তার ওপরে আগে যেসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হয়েছে, তার ফলে সেই সব জায়গায় নদী বেশ অনেকটাই শুকিয়ে গেছে।

উত্তরপূর্ব ভারত নদীগুলিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই গবেষণা করছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কল্পবৃক্ষ -এর সদস্য নীরজ বাঘোলিকর।

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরেই জলস্রোত আবারও নদীর প্রবাহে ফিরিয়ে দেয়া হয়, সেটা ঠিক। কিন্তু তিস্তার ওপরে এতগুলো বাঁধ তৈরি হয়েছে যে কোনো না কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জলপ্রবাহ বন্ধ থাকছেই। একটা প্রকল্প থেকে পানি ছাড়ার পরে অন্য প্রকল্পে আটকানো হচ্ছে। তাই গোটা নদীতেই তার প্রভাব পড়ছে।’

jagonews24

মায়াল্মিত আর গিৎসোদের কথায়, ‘আমরা কখনই উন্নয়নের বিরুদ্ধে নই। তবে যদি উন্নয়নই চান, তবে আমাদের ভাল রাস্তা, পরিবহন ব্যবস্থা - এসবের মতো বিষয়গুলোর সমাধান করুন আগে’

তিস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে মায়াল্মিত বলছিলেন, ‘এখানকার সমাজের প্রত্যেকটা লোকই উন্নয়ন চায়। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না।’

পরিবেশবিদ ইসাক কিহিমকরের কথায়, ‘আমরা এটা বুঝি যে সিকিমে জলবিদ্যুৎ তৈরির প্রভুত সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নদীটা থেকে যদি শুধুই শুষে নেন সবকিছু, তা কী করে হয়! তিস্তার ওপরে একের পর এক বাঁধ তৈরি হয়েছে। আর কত বাঁধ দেবেন ওই একটা নদীতে?’

বিবিসি

এমবিআর/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :