ইতালির সংকট যুক্তরাজ্যে: ওয়েলকাম টু ব্রিটালি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৩৮ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

‘ব্রিটানিয়া আনচেইনড’ নামে একটি রাজনৈতিক বইয়ের অন্যতম দুই লেখক ছিলেন লিজ ট্রাস ও কোয়াসি কোয়ার্টেং। ২০১২ সালে প্রকাশিত এ বইয়ে তারা ইতালির সংকটকে যুক্তরাজ্যের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। স্ফীত জনসেবা, ধীর প্রবৃদ্ধি, দুর্বল উত্পাদনশীলতা: ইতালি ও অন্যান্য দক্ষিণ ইউরোপীয় দেশগুলোর এসব সমস্যা যুক্তরাজ্যেও উপস্থিত ছিল। কিন্তু ১০ বছর পরে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ট্রাস ও সদ্য পদত্যাগকারী অর্থমন্ত্রী কোয়ার্টেং ইতালির সঙ্গে সেই তুলনাকে আবারও অনিবার্য করে তুলেছেন।

হতাশাজনক প্রবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য যুক্তরাজ্যকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং বন্ড মার্কেটের চাপেও আটকা পড়েছে দেশটি। তাই তো দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, ওয়েলকাম টু ব্রিটালি, অর্থাৎ ব্রিটালিতে (ব্রিটেন+ইতালি) স্বাগতম।

অবশ্য দুই দেশের মধ্যে তুলনা যথাযথ নয়। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার ছিল জি৭ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় মন্থরতম। তবে ইতালির অবস্থা ছিল আরও খারাপ। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি তুলনামূলক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং বয়সে নবীন। ইতালির সমস্যাগুলো আংশিকভাবে ইউরোপীয় জোটের ভেতরে থাকার কারণে, আর যুক্তরাজ্যেরগুলো আংশিকভাবে জোটের বাইরে থাকার ফল।

দুই দেশের বন্ডের দায় তুলনা করাও বিভ্রান্তিকর। যুক্তরাজ্যের দেনা কম, রয়েছে নিজস্ব মুদ্রা ও নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইতালির তুলনায় যুক্তরাজ্যের ঋণখেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্য ইতালির অনেক কাছাকাছি চলে গেছে; বিশেষ করে তিনটি দিক থেকে।

প্রথমত এবং স্পষ্টতই, ইতালির কুখ্যাত রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্তরাজ্যকেও সম্পূর্ণরূপে সংক্রমিত করেছে। ২০১৫ সালের মে মাসে জোট সরকারের সমাপ্তির পর থেকে যুক্তরাজ্যে চারজন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় বসেছেন- ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন ও লিজ ট্রাস। ইতালির দশাও একই।

jagonews24পদত্যাগ করেছেন কোয়ার্টেং, চাপের মুখে ট্রাসও। ছবি সংগৃহীত

দেশ দুটি আগামীতেও পায়ে পা মিলিয়ে চলতে পারে। জর্জিয়া মেলোনি ইতালির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ট্রাসের ভবিষ্যত কী হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

যুক্তরাজ্যে মন্ত্রিত্বের আয়ু এখন মাসে গণনা করতে হয়। গত জুলাইয়ের পর থেকে দেশটিতে চারজন অর্থমন্ত্রী দেখা গেছে। মাত্র ৪৩ দিন দায়িত্বপালনের পর এ সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও।

বিশৃঙ্খলা বাড়ায় রাজনীতির ওপর জনগণের আস্থা কমে গেছে। ২০১০ সালে ৫০ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক সরকারের ওপর আস্থাশীল ছিলেন। এখন তা ৪০ শতাংশেরও কম। এই পরিসংখ্যানে ইতালির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ব্যবধান ১৭ শতাংশ পয়েন্ট থেকে মাত্র চারে নেমে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, ইতালি যেমন ইউরো-জোন সংকটের সময় বন্ড বাজারের হাতের পুতুল হয়ে উঠেছিল; এখন যুক্তরাজ্যেও তেমনটি শুরু হয়েছে। রক্ষণশীলরা বর্ধিত ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের স্বপ্ন তাড়া করতে গিয়ে ছয় বছর কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে উল্টো নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তারা।

ব্রাসেলস ও বার্লিনের সঙ্গে ঝামেলার পর ২০১১ সালে ইতালির ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন সিলভিও বার্লুসকোনি। বাজারের ওপর প্রণোদনাবিহীন ট্যাক্সছাড় প্যাকেজের প্রতিক্রিয়ার জেরে ব্রিটিশ রাজকোষের চ্যান্সেলরের দায়িত্ব থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন কোয়াসি কোয়ার্টেং।

এই মুহূর্তে প্রভাবশালী বন্ড ব্যবসায়ীরাই ব্রিটিশ সরকারের নীতি নিয়ন্ত্রণকারী। নতুন ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বেশিরভাগ ট্যাক্সছাড় বাদ দিয়েছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সরকারের জ্বালানি-মূল্য গ্যারান্টি স্কিম নতুনভাবে সাজানো হবে। বাজেটের অবশিষ্ট ঘাটতি পূরণের জন্য তাকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তা অবশ্যই বাজারের কথা মাথায় রেখেই নিতে হবে।

ইতালিতে প্রেসিডেন্সি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিবিদদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন যুক্তরাজ্যেও একই অবস্থা। এসব প্রতিষ্ঠান আগেও নির্বাচিত এমপিদের জন্য বাধা ছিল, কিন্তু এখন সেটি আরও শক্ত ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

jagonews24ট্রাস সরকারের মূল পরিকল্পনাগুলো বদলে দিয়েছেন জেরেমি হান্ট। ছবি সংগৃহীত

তৃতীয়ত, ব্রিটেনের নিম্ন-প্রবৃদ্ধি সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত। ইতালীয় সরকারকে কোনো কিছু বাস্তবায়নের জন্য যেমন সংগ্রাম করতে হয়, যুক্তরাজ্যের ক্ষণস্থায়ী প্রশাসনের ক্ষেত্রেও সেটাই বাস্তব। নেতা ও সরকার ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকলে নীতির পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।

আপাতত, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বন্ড বাজারকে হয়তো শান্ত করতে পারে। তবে এটি নিজ থেকে প্রবৃদ্ধি বাড়াবে না। জেরেমি হান্ট একটি মধ্যমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনার মাধ্যমে হিসাবের বইগুলোতে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছেন। পরিকাঠামোতে খরচ কমিয়ে অর্থ সঞ্চয় করা বন্ড বাজারের জন্য ভালো হবে। কিন্তু এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করবে না।

এই বিষয়গুলো ধীরে ধীরে আরও বেশি ‘ব্রিটালিয়ান’ হয়ে উঠছে। কনজারভেটিভ এমপিরা আজ দ্বিধান্বিত। ফ্র্যাকিং ইস্যুতে ভোট এবং আরও পদত্যাগের গুঞ্জনে তাদের ভেতর বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আবার তাদের প্রধানমন্ত্রী কতদিন টিকে থাকতে পারেন, তা নিয়েও রয়েছে আলোচনা। বলা হচ্ছে, লিজ ট্রাস ক্রমেই ল্যারি নামে বিড়ালটির মতো হয়ে উঠছেন। অর্থাৎ, ডাউনিং স্ট্রিটে বসবাস করেন ঠিকই, কিন্তু কোনো ক্ষমতা নেই।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।