গুমের সময় দিন ও রাতের কোনো ধারণা ছিল না হুম্মাম চৌধুরীর কাছে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:১৬ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০২৬
হুম্মাম কাদের চৌধুরী/ফাইল ছবি

গুম থাকার সময় হুম্মাম কাদের চৌধুরীর কাছে দিন ও রাতের কোনো ধারণা ছিল না। কখন সকাল, কবে ঈদ, তা বুঝতেন খাবারের ধরন দেখে। সকাল হয়েছে কি না সেটি টের পেতেন খাবারে রুটি দিলে। ঈদের দিন চিনেছেন বিরিয়ানি পেয়ে। সেলের বাইরে মাঝেমধ্যে তিনি লোকজনকে হিন্দিতে কথা বলতে শুনেছেন।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের অভিযোগে এ মামলা হয়েছে। এতে আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাকে।

ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

৪২ বছর বয়সী হুম্মাম চৌধুরী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী। তিনি ট্রাইব্যুনালে জানান, আওয়ামী লীগের আমলে গুমের যে সংস্কৃতি ছিল, তিনি তার একজন ভুক্তভোগী।

তার জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট সকালে সাত থেকে আটজন সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে রাস্তা থেকে জোর করে বংশাল থানায় নিয়ে যান। সেখান থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে তাকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। রাত ১১টার পর ভাঙা একটি মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে পৌঁছানোর পর তার চোখ বেঁধে দেওয়া হয়। তবে গাড়ির শব্দ ও গতিপথ থেকে তিনি বুঝতে পারেন, তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছে তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে অন্য একটি দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জমটুপি পরিয়ে একটি সেলে বন্দি করা হয়। সেখানে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অস্বীকার করলে মারধর শুরু হয়।

এরপর হুম্মাম চৌধুরীকে আরেকটি সেলে নেওয়া হয়, যেখানে কাপড় খুলে ছবি তোলা হয়। প্রতিবাদ করলে ঝুলিয়ে রাখার হুমকি দেওয়া হয়। শেষে একটি পুরোনো টি-শার্ট ও প্যান্ট দেওয়া হয় এবং তার ঘড়ি ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এই সেলেই তিনি সাত মাস কাটান। সেলের ভেতরে ছিল একটি চৌকি, একটি টেবিল ও একটি প্লাস্টিকের চেয়ার। টেবিলের নিচে লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল ‘সিটিআইবি’।

তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় কিংবা বাথরুমে নেওয়ার সময়ও তার চোখ বাঁধা এবং হ্যান্ডকাফ ও জমটুপি পরানো হতো। নির্যাতনের ফলে তার শরীরে ঘা ও ফোঁড়া হয়। একপর্যায়ে সেলের ভেতরেই তার ফোঁড়ার অস্ত্রোপচার করা হয়। এতে অজ্ঞান হয়ে পড়ার পর জ্ঞান ফিরলে তিনি সেলের মেঝেতে রক্ত ও ব্যবহৃত গজ পড়ে থাকতে দেখেন।

হুম্মাম চৌধুরী বলেন, তাকে যে ওষুধ দেওয়া হতো তা সাধারণত মোড়ক ছাড়া দেওয়া হতো। একদিন ভুল করে মোড়কসহ ওষুধ এলে সেখানে ‘ভিআইপি-১’ লেখা দেখতে পান। তখন তিনি বুঝতে পারেন, এটি তার কোড নাম।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাঝেমধ্যে তাকে ইনজেকশন দেওয়া হতো। যার ফলে সারা শরীর জ্বলে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতো। বারবার ইনজেকশন দেওয়ার কারণে তার হাত কালো হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে শিরার মাধ্যমে কেমিক্যাল পুশ করা হতো। সেই ব্যাগে লেখা ছিল, ‘ডিফেন্স মেডিসিন, নট ফর সেল।’

হুম্মাম চৌধুরী জানান, খাবারের মাধ্যমে দিনের হিসাব রাখতেন। রুটি এলে বুঝতেন নতুন দিন শুরু হয়েছে। একদিন বিরিয়ানি দেওয়া হলে বুঝতে পারেন, সেটি ঈদের দিন। প্রথম দুই মাস দেয়ালে পেরেক দিয়ে দাগ কেটে দিন গুনলেও পরে তা বন্ধ করে দেন। জানালাগুলো ছিল কালো রঙে রাঙানো, ফলে বাইরে আলো আছে কি না বোঝার উপায় ছিল না।

সেলের দেয়ালে আগের বন্দিদের লেখা বার্তা দেখেছিলেন তিনি। এক জায়গায় লেখা ছিল, ‘আপনাকে কতদিন এখানে রাখা হবে তা কেউ আপনাকে বলবে না।’ অন্য পাশে আঁকা ছিল বাংলাদেশের পতাকা। নিজের বন্দিত্বের চিহ্ন হিসেবে তিনি দেয়ালের এক কোণে নিজের ইনিশিয়াল ‘এইচকিউসি’ এবং অপহরণের তারিখ লিখে রাখেন।

তিনি বলেন, আজানের শব্দ ও শীতকালে ওয়াজ মাহফিলের আওয়াজ শুনতে পেতেন। একদিন একাধিক ফাইটার জেটের শব্দ শুনে তার মনে হয়েছিল, হয়তো সেদিন ১৬ ডিসেম্বর।

মুক্তির দিন তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি ফুটপাতে বসিয়ে হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান। চোখ খুলতে নিষেধ করে বলা হয়, তিন মিনিট অপেক্ষা করতে। পরে বুঝতে পারেন, তিনি ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায় আছেন, যা তার বাসা থেকে কয়েক রাস্তা দূরে।

বাসায় পৌঁছালে দারোয়ান তাকে চিনতে পারেনি। ওজন কমে যাওয়া, লম্বা চুল ও দাঁড়ির কারণে তার চেহারা বদলে গিয়েছিল। তবে বাড়ির পোষা কুকুর তাকে চিনে ফেলে।

পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, তাকে আটকের সময় সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম, ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর এবং মুক্তির সময় প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন। তাকে মুক্তি দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২ মার্চ।

হুম্মাম চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি তার বন্দি থাকার জায়গা পরিদর্শনের সুযোগ পান। জেআইসির কোড নাম ছিল আয়নাঘর। সেখানে গিয়ে তিনি নিজের সেল শনাক্ত করতে পেরেছিলেন, কারণ দেয়ালে তখনো তার লেখা ইনিশিয়াল ও অপহরণের তারিখ ছিল।

জবানবন্দির একপর্যায়ে তিনি বলেন, বন্দিত্বকালে জিজ্ঞাসাবাদের সময় কোনো বিদেশিকে দেখেননি। তবে সেলের বাইরে কয়েকবার হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন। একদিন একজন আরেকজনকে বলছিল, ‘ইহাপে সাকাকা বেটা হায়।’ আরেকদিন একজন ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করছিল, ‘কিয়া আপ ভাত খায়ে গা, আপকে লিয়ে ভাত বানায়া হায়।’

জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরার জন্যে আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। গত ১৮ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচার শুরু হয়।

এফএইচ/একিউএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।