৯৬টি দুধের বিষয়ে করা রিপোর্টে সন্দেহ আছে : হাইকোর্টকে বিএসটিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৪ পিএম, ১৫ মে ২০১৯

বাজারে প্রাপ্ত দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া রয়েছে এই রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএসটিআই। বুধবার বিএসটিআইর আইনজীবী হাইকোর্টকে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় দুধের নমুনা সংগ্রহ করেছিল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরি সেটি সঠিক হয়নি।

তবে শুনানিতে গণমানুষের জন্য নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে তাদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারকে সতর্ক করে আদালত বলেছেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে আদালত কাউকে ছাড় দেবে না।

পরে এ রিপোর্টের যথার্থতা যাচাইয়ে ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির এক গবেষককে ২১ মে আদালতে হাজির হতে বলা হয়। একই সাথে আগামী এক মাসের মধ্যে দুধ পরীক্ষা করে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বুধবার (১৫ মে) দুধ ও দইয়ে ভেজাল নিয়ে শুনানিকালে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক। বিএসটিআইর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট সরকার এম আর হাসান মামুন। নিরপাদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. ফরিদুল ইসলাম।

বুধবার শুনানির শুরুতেই দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব আদালতকে বলেন, ‘আমাদের হাতে তো রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট না আসলে অ্যাকশনে যাওয়ার সুযোগ নেই।’

এসময় আদালত বলেন, কোন কোন দুধ বা দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যের কোম্পানির ভেজাল আছে আমরা তা চিহ্নিত করতে চাই।

এসময় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সাব স্ট্যান্ডার্ড বলতেই যে হার্মফুল এমন কিন্তু নয়। তাই ঢালাওভাবে সব দুধ বা দইয়ের বিষয়ে বললে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’

আদালত বলেন, ‘এই যে রিপার্টগুলো (যার ওপর ভিত্তি করে আদালত আদেশ দিয়েছিল) তা কি আপনারা দেখেন না? দেখার পর কি আপনাদের বিবেক জাগ্রত হয় না? আপনারা একটু কি টেস্ট করে দেখবেন না?’

আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম বলেন, গত সপ্তাহে আমরা ১৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছি। আমাদের একটু সময় দরকার। আদালত বলেন, কতদিন সময় দরকার। আইনজীবী জানান এক মাসের মধ্যে সব টেস্ট করে রিপোর্ট দিতে পারবো বলে আশা করি।

এ পর্যায়ে বিএসটিআই’র আইনজীবী সরকার হাসান মামুন বলেন, ‘প্রফেসর শাহনীলা ফেরদৌসী (নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রধান) যে রিপোর্ট করেছেন, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। ওই রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া (মেথট কী ছিল) সেটা সম্পর্কে আমাদের জানা নেই। বিএসটিআই তো একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ডকে মেইনটেইন করে পরীক্ষা করে রিপোর্ট করে। উনি (শাহনীলা ফেরদৌসী) তো ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করে রিপোর্টটি করেছেন। এখানে তো সারা দেশের সামগ্রিক চিত্র নাও উঠে আসতে পারে। আর এই সকল রিপোর্ট গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আতঙ্কের তৈরি হয়।

আদালত বলেন, এটা বলতে হবে যে মিডিয়াতে এই সকল ভেজাল বিষয় উঠে আসার কারণেই আমরা বিষয়গুলো জানতে পারি। তাই মিডিয়াকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। তারা বিষয়গুলো সামনে না নিয়ে আসলে তো আমরা জানতেই পারতাম না। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না। মানুষের স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে জীবন থেকে লাভ কী? এসব ব্যাপারে কোনো ছাড় দেব না।

বিচারক বিএসটিআই’র আইনজীবীকে বলেন, ‘আপনারা কবে রিপোর্ট দেবেন, কতদিন সময় লাগবে?’ আইনজীবী ‘এক মাস’ সময় চাইলে আদালত তখন জানতে চান প্রতিবেদনে কী থাকবে?

জবাবে বিএসটিআই'র আইনজীবী বলেন, আমরা যাদের লাইসেন্স দিয়েছি তাদের নাম, তাদের উৎপাদিত দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট এবং পরীক্ষায় ভেজাল পেলে সেক্ষেত্রে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরব।

এরপর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল ইসলামের কাছে আদালত জানতে চান, তাদের প্রতিবেদন দিতে কত সময় লাগবে? আইনজীবী বলেন, ‘আমরা একটা ডিটেইল রিপোর্ট দেব। আমাদের এক মাসের মতো সময় লাগবে।’

তখন আদালত প্রতিবেদন দিতে বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ২৩ জুন পর্যন্ত সময় দিয়ে ওইদিন মামলাটির পরবর্তী আদেশের জন্য দিন নির্ধারণ করেন।

এছাড়া হাইকোর্ট বলেন, কোন কোন কোম্পানির দুধ ক্ষতিকর, তা জানতে চায় সাধারণ মানুষ। ক্ষতিকর দুধের তালিকা তৈরি করুন। এর আগে দুধে সিসা ঠেকাতে উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত কড়া নজরদারি বাড়ানোর বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা হাইকোর্টে পেশ করে বিএসটিআই।

আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনের বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক জানান, বাজার থেকে সংগৃহীত কাঁচা তরল দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই সীসা ও অ্যান্টিবায়েটিক অনুজীব পাওয়া গেছে। প্যাকেটজাত দুধের ৩১টি নমুনার মধ্যে ১৮টিতেই ভেজাল পাওয়া গেছে। এছাড়া উচ্চমাত্রার বিভিন্ন রাসায়নিক পাওয়া গেছে দুধ ও দইয়ে। কোন কোন কোম্পানি দুধে এই ভেজাল বা রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর সঙ্গে জড়িত, প্রতিবেদনে তাদের নাম-ঠিকানা না দেয়ায় আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সেই তালিকাও দাখিলের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এর আগে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারাদেশে গরুর দুধ, দুই এবং গো-খাদ্যে কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক, সিসা রয়েছে তা নিরূপণের জন্য একটি জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ১৫ দিনের মধ্যে খাদ্য সচিব, মৎস্য ও প্রাণি সচিব, কৃষি সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সকল সদস্য, কেন্দ্রীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমন্বয় কমিটি এবং বিএসটিআই চেয়ারম্যানকে জরিপের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গাভীর খোলা দুধের ৯৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৯৬ শতাংশ দুধেই রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর অনুজীব।

এফএইচ/এসএইচএস/এমএস