নারীমনের রোগ হিস্টেরিয়া


প্রকাশিত: ০৫:১৬ এএম, ০৪ এপ্রিল ২০১৬

চিকিৎসাবিজ্ঞানে হিস্টেরিয়া একসময় ছিল শুধুমাত্র নারীর রোগহিসেবে অতি পরিচিত একটি রোগ। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসকরা একে রোগ হিসেবে মানতে নারাজ। সাধারণভাবে, আধুনিক চিকিৎসাবিদগণ হিস্টেরিয়াকে রোগনির্ণয়ের সাধারণ শ্রেণি হিসেবে ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়ে তার পরিবর্তে ব্যবহার করছেন সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত শ্রেণিসমূহ। যেমন: সোমাটাইজেশন ডিসর্ডার। ১৯৮০ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিকভাবে রোগনির্ণয়ে হিস্টেরিক্যাল নিউরোসিস কনভার্শন টাইপকে পরিবর্তন করে কনভার্শন ডিসর্ডার  করেছে।

হিস্টেরিয়া বলতে সাধারণ অর্থে বোঝায় নিয়ন্ত্রণহীন  আবেগের আধিক্য। হিস্টেরিয়ার সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের  চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপার সম্পর্কিত। এই চাওয়া-পাওয়াগুলোর সাথে যে বাস্তবের সম্পর্ক থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই, কাল্পনিকও হতে পারে। এই চাওয়া-পাওয়াগুলো বাস্তবিক বা কাল্পনিক যাই হোক না কেন ভুক্তভোগী কিন্তু সত্যিকার অর্থেই নিজেই বুঝতে পারে না তার সমস্যাটি কী। অর্থাৎ এরা যে ভান করে এমনটা বলা যায়না। এই হিস্টেরিয়ায় ভুক্তভগীদের সমন্ধে এখনও আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত ধারণা বিদ্যমান। যেমন : ডাক্তাররা  বলেন- ও অভিনয় করছে, স্যালাইন দাও, ইঞ্জেকশন দাও, নাকে নল দাও। আমাদের সমাজে প্রচলিত অপবিশ্বাস এবং  কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে যে, রোগীকে জ্বিন-ভূতে ধরেছে অথবা বাতাস লেগেছে।

হিস্টেরিয়ার কারণ :
জর্জ টেলর নামের একজন চিকিৎসক ১৮৫৯ সালে দাবী করেন যে, প্রতি চারজনে একজন মহিলা হিস্টেরিয়ার রোগী। সাধারণত ভয়, দুশ্চিন্তা, হতাশা, মানসিক চাপ, মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিন যাবৎ অসুখে ভোগা এমনকি কারো মৃত্যশোক বা প্রেমে প্রত্যাখান থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে বংশগত কারণ, ভুল পারিবারিক শিক্ষা, যৌন সংক্রান্ত মানসিক চাপ, যৌন বিকৃতিও এর জন্য দায়ী।

হিস্টেরিয়ার লক্ষণ :
জন বেয়ার্ড নামের আরেকজন চিকিৎসক হিস্টেরিয়ার লক্ষণ হিসেবে ৭৫ টি সম্ভাব্য লক্ষণের তালিকা করেন এবং শেষে লেখেন যে তার তালিকা এখনো অসম্পূর্ণ (!)। তারপরও আমরা প্রচলিত যেসব লক্ষণ দেখতে পাই তা হলো- ঘুমঘুম ভাব, হতাশা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট (যদি ও কিছুক্ষণ পর তা ভালো হয়ে যায়), মাথাব্যথা, হাত-পা এ ব্যথা, দাঁত খিচ দিয়ে রাখা, গলায় কিছু আটকে গেছে এমন বলা, কোনো কারণ ছাড়াই অট্টহাসি দেয়া বা কান্না করা। সর্বোপরি হিস্টেরিয়ার ভুক্তভোগীরা আদর ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে যায় এবং অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। আগে হিস্টেরিয়ার সাথে খিচুনী রোগ কে গুলিয়ে ফেলত মানুষ। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যানে এ দুটির মাঝে পার্থক্য করা সম্ভব। খিচুনীর রোগীরা সত্যিকারে  অজ্ঞান হলেও এরা হয় না। এরা ঘুমের মধ্যেও জেগে থাকে, দাঁত দিয়ে জিহ্বা কাটেনা, ব্যথা দিলে তা অনুভব করে, শ্বাসকষ্ট নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। এর কোনটিই খিচুনী রোগের ক্ষেত্রে ঘটে না।

ফকির, কবিরাজ, ওঝা দিয়ে এদের অপচিকিৎসা করা হয় বলে প্রতিদিন কু-চিকিৎসা ও অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে হাজার হাজার নারী। রোগীর মধ্যে লক্ষণ যতই তীব্র আকার ধারণ করুক না কেন তা নিয়ে ভয় পাবার কিছু নেই। হিস্টেরিক্যাল  উপসর্গগুলো- রোগীকে বারবার আশ্বস্তকরণ,পরামর্শ এবং অভিভাব্যতা ইত্যাদি দিয়ে দূর করা। যেসকল শারীরিক ও মানসিক  চাপজনিত পরিস্থিতিতে উপসর্গগুলো বাড়ে, সেগুলোকে আস্তে আস্তে বশে আনতে হবে।

Doctor
ডাঃ শাহ মোঃ এজাজ উল হক
মেডিকেল অফিসার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার।


এইচএন/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।