চির চেনা কবিতার নগরে জামসেদ ওয়াজেদ
রেজাউদ্দিন স্টালিন
জামসেদ ওয়াজেদ সরল সহজ নির্ভর মানুষ। এ কথা সত্য, যে কোনো লেখকের লেখায় তার চরিত্রের কিংবা ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে। ওর ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটেছে বলে আমার মনে হয়। জামসেদের সাথে আমার পরিচয় একযুগের মতো। এরই মধ্যে তার সাফল্য এবং কাব্য নিবেদন আমাকে ভাবিয়েছে। ঢাকার বাইরে কোনো সাহিত্যের অনুষ্ঠান কিংবা সম্মেলনে গেলে সাথী হিসেবে প্রথম যার নামটি মনে আসে—সে হচ্ছে জামসেদ ওয়াজেদ। ওর কবিতা প্রেম আমাকে মুগ্ধ করে। খুলনার এক তিনতারা হোটেলে ওকে রাত জেগে দীর্ঘ কবিতা রচনার দৃশ্য দেখে আমার ভালো লেগেছিলো। লেখার প্রথম অধ্যায়ে কোনো এক অগ্রজ কবি জামসেদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলো, ‘তোমাকে সনেট লিখতে হবে’। হয়তো অগ্রজ কবি বলতে চেয়েছিলেন একটা শক্ত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে নিজেকে গড়ে তুলতে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে জামসেদের কাব্যস্ফুরণে এই অতি কাঠামোতে পরিচর্যা কিছুটা অন্তরায় হয়েছে। আমি রবীন্দ্রনাথের সাথেই বিমুখতার একটা কারণ পাই এখানে। তিনি আবেগ ও চিন্তার এই গাণিতিক হিসাবকে মেনে নিতে পারেননি।
আমি বিশ্বাস করি, কবিতা হচ্ছে এক বহুমাত্রিক জ্যামিতি যার কেন্দ্র আছে সর্বত্র কিন্তু পরিধি নেই কোনো। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সনেট রচনা বাংলা ভাষার আধুনিকায়নে দুর্দান্ত প্রয়াস। কিন্তু পরবর্তীকালে অনেকে এই প্রয়াস নবায়ন করতে গিয়ে তেমন পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও পথে হাঁটেননি। ত্রিশের দু’একজন হাঁটলেও বেশিদূর এগিয়ে নেননি। বরং চল্লিশের ফররুখ আহমদ, পঞ্চাশের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ সনেট নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। সত্তর, আশি এবং নব্বই দশকেও অনেক কবি এই পথে পা দিয়েছেন। নব্বইয়ের জামসেদই সনেটকে আবক্ষ লালনের শক্তি প্রদর্শন করেছেন। তার ইতোমধ্যে একডজন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। কবিতা চর্চায় নিবেদিত প্রাণ জামসেদ ওয়াজেদ ‘জলছবি’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বর্ধিত কলেবরে প্রকাশ করছেন।
ওর কবিতার সুর আত্মজৈবনিক। কিন্তু আত্ম অনুভবের জায়গা থেকে মাঝে মাঝে তার কবিতা সামষ্টিক চেতনায় পর্যবসিত হয়। একটা উদাহরণ—
‘নিজস্ব উঠোন ভেঙে প্রতিদিন ফিরছি বাড়িতে
যে গৃহ আমার নয় সেই গৃহে কি করে যে থাকি
তবুও পেছন থেকে কারা যেন করে ডাকাডাকি
টান লাগে এ শিখরে টান লাগে আপন নাড়িতে’
ব্যক্তি জীবনের বাঁধা অতিক্রম করে সামাজিক হাওয়ায় যে অদম্য আকুতি তার কবিতায় দেখি তা নিঃসন্দেহে কবির দায়বদ্ধতায় এবং অঙ্গীকারের প্রয়াস। চর্যাপদের ভুষুকু, কাহ্নপা, ঢেন্ডনপা থেকে অদ্যাবধি সব কবিই তো সবদেশ ও স্বভাষার প্রতি মমত্ব প্রদর্শন করেছেন।
জামসেদ ওয়াজেদ ঐতিহ্যবাদী। ধ্রুপদী ধারার নবায়নে তৎপর। সনেট রীতি অষ্টক-ষষ্টকের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে জামসেদ পঞ্চাশ দশকের পথানুসরণ করেছেন। চৌদ্দ মাত্রার চৌদ্দ লাইনের মধ্যে বিধিবদ্ধ প্রথা মানলেও জামসেদ বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েছেন এখানেই তার স্বকীয়তা। আলাদিনের মতো এক বালক সহস্র এক রজনীর স্তব্ধতা ভেঙে কী করে ইতিহাস হলো তা কবিকে আশ্চর্য করে। এক শিশুর ঠোঁটে বিস্ময়ভরা পৃথিবী দেখে কবি। ‘অন্যআলো অন্য গ্রহ’ কবিতা নিশ্চয়ই সনেট এবং কোনো অন্তমিল ছাড়া কবি সাহস দেখান কবিতাটি লিখতে।
‘কবিতার ইতিহাস ধূসরের পরে স্বপ্নময়
ধূলিকণা গায়ে মেখে অন্যআলো অন্যগ্রহে বাস’
পাঠক এই দুটি লাইন থেকে একটা অবধারনায় পৌঁছবেন যে কবিতার ইতিহাসে স্বপ্ন একটা বড় জায়গা নিয়ে আছে। তিনি নিজেকে এক বিপন্ন বাউলের গোত্রভুক্ত করতে চান—সামনে অজানা এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড—তার ইতিহাস কবির কতটুকুই বা আয়ত্তে। লালনের বাড়ি খুঁজতেই তিনি সোনালি সোপান তৈরি করেন।
আরও পড়ুন
বাংলা সাহিত্য জগতের হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র
নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছি: মঈন মুরসালিন
শিল্পের খোলসের বাইরে প্রকৃত বাস্তবতায় সূর্যালোক অন্ধকার মুছে দেবে এ রকম এক প্রপঞ্চে বিশ্বাসী জামসেদ ওয়াজেদ। কারণ তিনি নিশ্চয়ই জানেন, কবি একই সাথে তীর-তীরন্দাজ এবং চাঁদমারী। বাংলাদেশের মাটি মানুষ আর প্রকৃতির চরিত্র বিশ্লেষণ কবিকে শিকড়মুখী করেছে। বৃষ্টি, কাশবন, মাছরাঙা, আমনের ক্ষেত তার চির চেনা এই স্বজনেরা এখন কোথায়? স্বপ্নের যে প্রগতি সরণি তার নিরুদ্দিষ্টতা তাকে কষ্ট দেয়।
‘দিনে ভালো দেখে বটে অন্ধকারে পুরো রাতকানা
সময়ের উল্টোরথে এইভাবে হাঁটছে প্রগতি’
কিন্তু সময়ের রশি ধরে তিনি বন-উপবনে হাঁটেন। জ্বলন্ত মোমের মতো কঠিন সময় পার করেন আর বিশ্বস্ত থাকেন সূর্যের প্রতি। সূর্যই কবি প্রার্থিত সকাল এনে দেবে। বিজ্ঞানময় বিশ্বে নতুন আবিষ্কার মানব সভ্যতাকে কতদূর নিয়ে যাবে? এমন জিজ্ঞাসাও কবির চিত্ত উদ্বেল করে।
‘টেস্টটিউব বেবির কান্না শুনি বাতাসের কানে’
বাতাস সভ্যতার নতুন সৃষ্টি বয়ে আনে এবং প্রতিধ্বনিত করে। সময় এ সমস্ত কিছুর স্বাক্ষী। যেমন রসেটা হরফ কাহিনি, অশোকের শিলালিপি—সেমোটিক জাতিগোষ্ঠীর এইসব উপপাদ্য কবির ঐতিহ্য তিনি তার সমাদর করেন—
‘অশোকের শিলালিপি ঠিক তার পথ বাতলায়’
পথ বলে দেয় কোনদিকে সভ্যতা যাবে। কবি যদিও নিঃসঙ্গ কিন্তু ইয়েটসের পিতার ভাষায়—কবিতা নিঃসঙ্গ মানুষের সামাজিক দলিলের সুরক্ষা, নবায়ন এবং প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছেন। তার এই দায়িত্বের প্রমাণ মেলে—আমার সময়। পাখিগুলো হয়ে যাবে ফুল, সাহসের হাত ধরে, সুদীর্ঘ শরৎ শেষে, শিরোনমের সনেটগুলোতে।
পৃথিবীতে কোনো শিল্পই একশভাগ পূর্ণ নয়। এমনকি গেটে বা রবীন্দ্রনাথও নয়। পরিচর্যার দ্বারা অনুশীলন ও অধ্যবসায় দ্বারা অভিজ্ঞতা অর্জন প্রতিটি কবির জন্য জরুরি। জামসেদ ওয়াজেদের কাব্য আলোচনাতেও কথাটি প্রযোজ্য। ধ্রুপদী রীতির সীমানা ভেঙে উত্তরাধুনিক কাব্যবিশ্বের বাসিন্দা হতে জামসেদের যে প্রচেষ্টা, তা জারি থাকুক। তার জন্মদিনে একজন অগ্রজ হিসেবে এই আমার প্রত্যাশা।
এসইউ