সাহিত্য কি শুধু লেখা নাকি জীবন্ত অভিজ্ঞতা
জিয়াউদ্দিন লিটন
সাহিত্য কেবল শব্দের সংমিশ্রণ নয়; এটি মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির এক জীবন্ত আয়না। প্রতিটি রচনা লেখকের অভিজ্ঞতা, দর্শন, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির মিশ্রণে জন্মায়। কিন্তু এই জন্ম কেবল লেখকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পাঠকের মস্তিষ্ক, স্মৃতি এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সেই রচনাকে নতুন অর্থ দেয়। ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে এক ‘সংলাপময় প্রক্রিয়া’, যেখানে লেখক ও পাঠক একে অপরের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে টেক্সটের সম্ভাবনাকে পূর্ণ করে। আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বে দেখা যায়, লেখক ও পাঠকের এই অবিচ্ছিন্ন সংলাপই রচনাকে জীবন দেয় এবং সময়ের সঙ্গে নতুন রূপে বিকশিত করে।
একটি রচনা তৈরি করার সময় লেখক নিজের অভিজ্ঞতা, দর্শন এবং সামাজিক পর্যবেক্ষণকে শব্দে আবদ্ধ করেন। তবে লেখকের দৃষ্টিকোণই শেষ কথা নয়; পাঠক তা নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আবিষ্কার করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘সৃষ্টির পরিপূর্ণতা পাঠকের অনুভবের মধ্যেই সম্পন্ন হয়।’ অর্থাৎ লেখকের রচিত জগৎ তখনই পূর্ণতা লাভ করে; যখন পাঠক তার অন্তর্জগতের আলোকে তা অনুধাবন করেন। পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মননশীলতা সেই রচনাকে নতুন প্রাণ ও অর্থ প্রদান করে।
পাঠক কেবল প্রাপক নয় বরং একটি সাহিত্যকর্মের ‘সহ-স্রষ্টা’। রিডার-রেসপন্স তত্ত্ব প্রমাণ করে, পাঠকের ব্যাখ্যা ও প্রতিক্রিয়াই টেক্সটের পূর্ণ সম্ভাবনা প্রকাশ করে। উলফগ্যাং আইজার বলেছেন, ‘পাঠকই টেক্সটের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেন; তার ব্যাখ্যাই টেক্সটের অনুপস্থিত অংশগুলো পূর্ণ করে।’ ফরাসি তাত্ত্বিক রোলাঁ বার্ত বলেছেন, ‘পাঠকের জন্মের জন্য প্রয়োজন লেখকের মৃত্যু।’ অর্থাৎ লেখকের অভিপ্রায় একমাত্র নয়; পাঠকের চিন্তা ও ব্যাখ্যা সাহিত্যকে চিরন্তন করে। পাঠকের প্রেক্ষাপট, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জ্ঞান মিলিত হয়ে রচনাকে নতুন অর্থ প্রদান করে, যা আগে কখনো বিদ্যমান ছিল না।
মিখাইল বাখতিনের ‘ডায়ালজিক ইমাজিনেশন’ তত্ত্ব দেখায়, প্রতিটি রচনা মূলত সংলাপময়। লেখক একটি শব্দ বা ভাব প্রকাশ করেন, পাঠক তার প্রতিক্রিয়া জানান এবং এই সংলাপের ভেতরেই সাহিত্য নতুন অর্থ ও জীবন লাভ করে। বাখতিন বলেছেন, ‘প্রত্যেক পাঠই একটি নতুন উচ্চারণ; প্রতিটি ব্যাখ্যাই এক নতুন সংলাপ।’ ফলে সাহিত্য কোনো চূড়ান্ত অর্থ বহন করে না বরং এটি পাঠক এবং লেখকের ক্রমাগত সংলাপে বহুমাত্রিক ও বহুভাষিক রূপে বিকশিত হয়।
ডিজিটাল যুগে সাহিত্য আরও গতিশীল হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ, অনলাইন ম্যাগাজিন এবং ই-বুক রিডারের মাধ্যমে সাহিত্য আর সময় ও স্থানের সীমায় আবদ্ধ নয়। লেখক সরাসরি পাঠকের প্রতিক্রিয়া পান এবং পাঠক তাৎক্ষণিকভাবে সেই সংলাপে অংশগ্রহণ করেন। তবে এই মুক্ত পরিবেশ নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে। মনোযোগের ভঙ্গুরতা, দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি, গভীর পাঠের অভাব এবং তথ্যকেন্দ্রিকতা ভাষার সৌন্দর্য হ্রাস করতে পারে। ইগলটন মন্তব্য করেছেন, ‘আধুনিক পাঠক তথ্য সংগ্রহ করেন; রূপান্তরের অভিজ্ঞতা খোঁজেন না।’ তবুও ডিজিটাল মাধ্যম সাহিত্যকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিস্তৃত করেছে, যা নবীন লেখকের জন্য নতুন সৃজনশীল পরিসর খুলেছে এবং পাঠকের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে রচনাকে অনুধাবনের সুযোগ দিয়েছে।
সাহিত্য কেবল ভাবপ্রকাশ নয়; এটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি। পাঠক সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে তার নিজস্ব সময়, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকে পুনঃঅনুধাবন করেন। লেখক একটি প্রশ্ন তোলে, পাঠক সেই প্রশ্নের নতুন ব্যাখ্যা নির্মাণ করে এবং এই প্রক্রিয়ায় সমাজে সংস্কৃতি ও প্রতি সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়। ফলে সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়; এটি সমাজ, মনন এবং বৌদ্ধিক উদ্দীপনার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি লেখক–পাঠকের দ্বিমুখী সংলাপে নিহিত। লেখক শব্দ দেন, পাঠক অর্থ দেন; লেখক দৃশ্য নির্মাণ করেন, পাঠক তা নিজের অভিজ্ঞতার আয়নায় দেখেন। অর্থের জন্ম, বিনাশ ও নবসৃজন অবিরাম প্রবাহিত হয়। এই আন্তঃক্রিয়াত্মক সংলাপ সাহিত্যকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ব্যক্তিগত স্তরে জীবন্ত করে তোলে। সাহিত্য কেবল পাঠ্য নয়, এটি মানব অভিজ্ঞতার গভীর প্রতিফলন।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, সাংবাদিক, কবি ও কাব্যালোচক।
এসইউ