টেম্পু পাশা : নাইট শিফট

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০৪:৪৩ পিএম, ১৯ জুন ২০১৯

মাংসের টেবিলের উপর হাত-পা ও মুখ বাঁধা মেয়েটি কেমন অসহায় দৃষ্টিতে পাশার দিকে চেয়ে আছে। পাশাও তার দিকে অমন করে চেয়ে আছে, যেমন এক টিনেজার বালক তার ক্রাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। মেয়েটি কী যেন বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু মুখ বাঁধা থাকায় কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আর দেরি না করে জীবন্ত অবস্থায়ই পাশা বড় ধারালো একটি ছুরি দিয়ে মেয়েটির বুকের মাঝখানে বিশাল এক গর্ত করল। রক্ত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পাশা তার হাত টিপে দেখল যে, মেয়েটি এখনো বেঁচে আছে কি-না। সে বুঝল মেয়েটির পালস অনেক দুর্বল। কিন্তু মেয়েটি এখনো জীবিত আছে।

এরপর তার দুই হাত দিয়ে মেয়েটির দেহ থেকে কলিজা, ফুসফুস এবং লিভার বের করে বাজারের থলেতে রাখলো। হঠাৎ করে মেয়েটির চোখ বন্ধ হয়ে এলো। ট্রাকের ভেতর বসা পাশার চোখ হঠাৎ চারদিকে গেল। মেয়েটির দেহ ট্রাকের ভেতর একটি মাংস কাটার টেবিলের উপর পড়ে আছে।

ট্রাকের ভেতর মেয়েটির রক্তে লাল হয়ে আছে। পাশার চোখেমুখেও অনেক রক্ত লেগে আছে। উত্তেজনায় পাশার সারা শরীর যেন কেমন করছে। এ কেমন বিচিত্র অনুভূতি, পাশা ভাবল। পাশার গায়ের জামার উপরেও অনেক রক্ত লেগে আছে। পাশা ভাবল, এভাবে তো বাড়ি যাওয়া যাবে না। বাড়িতে তার স্ত্রী আছে। স্ত্রী দেখে ফেললে বিরাট সমস্যা হয়ে যাবে। হঠাৎ করে সে ভীষণ চিন্তিত হয়ে গেল। সে ভাবছে, কিছু একটা তাকে করতে হবে। কিন্তু কী করবে?

ট্রাকের ভেতর সে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে কিছু পাওয়া যায় কি-না। কিছুক্ষণ পর সে তার একটি পুরনো জামা খুঁজে পেল। স্বস্তির শ্বাস নিল অবশেষে। এরপর একটু তাকাতে সে দেখল তার পরনের প্যান্টটিও রক্তে লাল হয়ে আছে। এবার কী হবে? সে ভাবল। আবার ট্রাকের ভেতর খোঁজা আরম্ভ শুরু করল।

ট্রাকটি একটি বড় অ্যাম্বুলেন্সের মত। হিমায়িত ট্রাকটি দিয়ে পাশা দিনের বেলায় কুইন্সের বিভিন্ন জায়গায় গরুর মাংস ডেলিভারি দেয়।

অনেক খোঁজাখুজির পর অবশেষে তার একটি পুরনো লুঙ্গী বাক্সের মধ্যে দেখতে পেল। কিন্তু লুঙ্গী পরে সে কিভাবে বাড়িতে যাবে বুঝতে পারছে না। নিউইয়র্কে সাধারণত কেউ রাস্তায় লুঙ্গী পরে না। কুইন্সে অনেক বাঙালি থাকলেও সচরাচর কাউকে রাস্তায় লুঙ্গী পরিধান করতে দেখা যায় না। নতুন একটা সমস্যার মধ্যে পড়ল। অবশেষে ভাবল, আজ সে লুঙ্গী পরিধান করেই বাড়ি যাবে।

পরনের প্যান্টটি খুলে সে লুঙ্গী পরল। ট্রাকের ভেতর ঝুলে থাকা কিছু গরুর মাংসের উপরও মেয়েটির রক্ত মিশে আছে। কী করবে, ভাবতে থাকে। পরে কী যেন ভেবে পাশা আর কিছু করে না। পুরান জামা দিয়ে তার শরীরের রক্ত তাড়াতাড়ি করে মুছতে থাকে আর মেয়েটির মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। ধীরে ধীরে মেয়েটির চোখ বন্ধ হয়ে যায়। তা দেখে পাশার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। এরপর মেয়েটির গলার চেইন এবং কানের দুল খুলে তার পকেটে সযত্নে ভরে।

তখন দুপুর দুইটা বাজে। বাড়ি যেতে হবে। সাধারণত দুপুর দেড়টার দিকে বাজার নিয়ে পাশা বাড়ি যায়। তার স্ত্রী তিন্নী রান্না করে পাশাকে তিনটার দিকে খেতে দেয়। ছোটবেলা থেকে পাশা মাংস খেতে খুব পছন্দ করে। হাঁসের মাংস তার সবচেয়ে প্রিয়। তিন্নী কিন্তু একেবারে মাংস খেতে পছন্দ করে না। ছোটবেলা থেকেই তিন্নী প্রাণিদের ভীষণ ভালোবাসে। তাই তিন্নী তার সারাজীবনে মাংস বা ডিমও খায়নি। কিন্তু সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাশার জন্য প্রতিদিনই মাংস রান্না করে। এবং সে অনেক সুস্বাদু করে মাংস রান্না করতে পারে।

পাশা সবই জানে। আর তাই পাশা তিন্নীকে অনেক পছন্দ করে। তাদের বিয়েটি পারিবারিক সম্মতিতে হলেও তিন্নীকে প্রথম থেকেই পাশা অনেক ভালোবাসে। পাশাকেও সে অনেক ভালোবাসে। সংসারের সব কাজ তিন্নী সযত্নে সামলে নেয়। কখনো সে কোন প্রকার অভিযোগ করে না। সবসময় হাসিমুখে থাকতে পছন্দ করে।

পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা তিন্নী, দেখতে অনেক ফর্সা। অন্যদিকে, পাশার উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি। দূর থেকে পাশাকে একটু কালো রঙের দেখা যায়। কিন্তু আসলে সে শ্যামবর্ণের।

বাড়ির দরজা নক করতে লাগল পাশা। কিছুক্ষণ পর তিন্নী এসে দরজা খুলে দিলো।
আজ এত দেরি তোমার? তিন্নী বলল।
ডেলিভারি শেষ করে আসতে দেরি হয়ে গেল। পাশা উত্তর দিলো।
একি? তুমি লুঙ্গী পরে আছ! মানুষ দেখলে তোমাকে কী বলবে?
লুঙ্গী কি ইচ্ছে করে পরি? গরুর মাংস ডেলিভারি দিতে গিয়ে প্যান্টে রক্ত লেগে গেছে।
ও, আচ্ছা। তিন্নী বলে রান্নাঘরের দিকে হাঁটতে লাগল।
মাংসগুলো তাড়াতাড়ি রান্না করে দাও। খুব ক্ষিধে লাগছে, পাশা বলল।

বাড়িতে আসার আগেই পাশা বুদ্ধি করে ট্রাকের ভেতর মেয়েটির কলিজা, ফুসফুস এবং লিভার কেটে ছোট ছোট টুকরা করে নিয়ে এলো। যাতে তিন্নী কিছুতেই বুঝতে না পারে যে মাংসগুলো মানুষের।
কী ব্যাপার! আজ তুমি মাংসগুলোকে কেটে আনলে যে? তোমার না আমার করা মাংসের টুকরা খেতে ভালো লাগে? তিন্নী বলল।
বউয়ের হঠাৎ এমন প্রশ্নে পাশা স্তম্ভিত হয়ে বলল, তুমি তো সংসারের জন্য অনেক কষ্ট কর। তাই এখন থেকে ঠিক করেছি, বাড়িতে আনা সব মাংস দোকান থেকে পিস করে আনবো।
তিন্নী মুচকি একটি হাসি দিলো আর লজ্জাও পেল।
পাশা মনে মনে ভাবল, যাক এবারের মত রক্ষা পেলাম।
আমি যাচ্ছি বাথরুমে, গোসল করতে হবে। পাশা বলল।

তিন্নী পাশার আনা মাংস ধুয়ে মসলা দিয়ে রান্না করা শুরু করল। অন্যদিকে পাশার গোসল করা শেষ।
তোমার রান্না করা শেষ? বড্ড ক্ষুধা লেগেছে আমার। শরীরটি তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে সে বলল।
এই তো প্রায় শেষ। তোমার জন্য খাবার রেডি করছি। তুমি এসে খাবার টেবিলে এসে বসো।
খাবার টেবিলে বসার সময় পাশার ওই মেয়েটির কথা ভীষণ মনে পড়ল। ভাবতেই তার শরীরে কেমন জানি এক বিচিত্র অনুভূতি আসে। এমন এক অনুভূতি যা আগে কখনো হয়নি। এ যেন এক নেশার অনুভূতি। আর পাশা এখনো সে নেশার ঘোরে আছে। কোন কিছুতে তার মন বসছে না।
কী হয়েছে? তোমার না অনেক ক্ষুধা লেগেছে? কতক্ষণ হলো তোমাকে ভাত দিলাম আর তুমি এখনো ভাতে হাতও লাগাওনি। তিন্নী বলল।
পাশা খাবার টেবিলে একটু নজর দিলো। সে দেখল ভাতের সাথে টেবিলে রুই মাছের ঝোল, ডাল আর পালং শাক আছে। কিন্তু মাংস নেই। পাশার ক্ষুধা কেমন জানি চলে গেল। পেটের ক্ষুধা থাকলেও তার মনের ক্ষুধা একেবারে নেই।

মানুষ বড়ই বিচিত্র প্রাণি। তার পেটের ক্ষুধার সাথে মনের ক্ষুধা না লাগলে একদম খেতেই পারে না। তাই মানুষ খাবার সময় শুধু পেটভর্তি করে না, মনও ভর্তি করে।
কী হলো? মাংস কই? সে বলল।
এই তো আনছি। রান্না শেষ করতে হবে তো? নাকি তোমাকে কাঁচা মাংস দিয়ে দেব। তিন্নী মজা করে বলল।

কিছুক্ষণ পর তিন্নী তার হাতে রান্না করা মাংস নিয়ে এলো। মাংস দেখে পাশার চেখে মেয়েটির মুখ ভেসে উঠল। ঘণ্টাখানেক আগের অভিজ্ঞতা যেন আবার তার চোখেমুখে ভেসে উঠল। সারা শরীরে যেন তার উত্তেজনার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সাথে সাথে একের পর এক মাংসের টুকরা পাশা মুখে পুরছে।
এই দেখে তার স্ত্রী তিন্নী মজা করে বলল, কী হলো? তোমাকে আজ দেখে মনে হচ্ছে- তুমি জীবনে মাংস চোখে দেখনি। এমন গপাস গপাস করে কেউ মাংস খায়?
না... তোমার রান্না বলে কথা। খুব দারুণ হয়েছে। সত্যি তোমার রান্নার তুলনা হয় না।
পাশা মনে মনে ভাবল, আসলেই আমি এমন মাংস জীবনে খাইনি। তখন তার জীবনে প্রথমবার একটি মেয়ের মাংস দুর্ঘটনাক্রমে খাবার কথা মনে পড়ে। সে খাওয়া কেমনে পাশাকে আজ মানুষখেকো বানালো, সে কথা তখন তার মনে পড়ে যায়।

প্রায় বারো বছর আগের কথা। পাশা তখন বাংলাদেশে। ত্রিশ বছর বয়সী পাশা ফেনী শহরে টেম্পু চালিয়ে জীবিকা অর্জন করত। লোকে পাশাকে অনেক ভালো বলেই জানে। আচার ব্যবহারে সে অন্য টেম্পুচালকদের মত না। মানুষকে সম্মান করে কথা বলত। তার ভালো আচার-ব্যবহারের জন্য এলাকায় সবাই তাকে ‘টেম্পু পাশা’ নামে জানে। সে তখনো বিয়ে করেনি। বাড়িতে শুধু তার মা আছে। বাবা ছোটবেলায় মারা গেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সে সংসারের হাল ধরে আসছে। এক বোন ছিল। তার বিয়ে হয়ে গেছে। পাশা তার নিজের আয় দিয়ে তার একমাত্র বোনের বিয়ে দিয়েছে। এখন তার সংসারে খরচ বলতে কিছু নেই বললেই চলে। টেম্পু চালিয়ে এখন তার আয়ও মোটামুটি ভালোই হয়। তার উপর টেম্পুটি এখন তার নিজের। তিন বছর আগে তার জমানো টাকা দিয়েই টেম্পুটি সে কিনেছে। গত তিন বছরে নিজের টেম্পু চালিয়ে বেশকিছু অর্থ তার ব্যাংকে জমা আছে।

পাশার এখন টাকার অভাব নেই। তার দিন সুন্দরভাবেই চলে যায়। ফেনী শহরের পাশেই সুন্দল গ্রামে তার বাড়ি। গত বছরে ইট দিয়ে একটি ছোট্ট ঘর তৈরি করেছে। সবকিছু করার পরও কেন জানি তার দেশে মন বসছে না। ছোটবেলা থেকেই পাশার বিদেশ ভ্রমণ করার খুব শখ ছিল। এখনো বিদেশের যাওয়ার জন্য তার অনেক ইচ্ছে করে। কিন্তু বিদেশ তো যাবে পরের কথা, সে কখনো ঢাকা শহরেই যায়নি। তার গ্রামের অনেকেই বিদেশে থাকে। কেউ থাকে সৌদি আরব, কেউ আবার ওমান, আবার কেউবা থাকে লন্ডন। কিন্তু পাশার ইচ্ছা সে একদিন আমেরিকা পর্যন্ত যাবে।

বাপজান, আমরিকা যাওয়া সোজা কথানি। তুই ইচ্ছে করলে আমরিকা যেতে পারবি? পাশার মা রহিমা বেগম বলল।
আম্মা, অ্যাই আমরিকা ছাড়া কোথাও যামু না। যেভাবে হোক অ্যাই আমরিকা যামু। এই বলে পাশা ঘর থেকে হনহন করে বের হয়ে চলে গেল।

পথে দেখা হলো তার ছোটবেলার বন্ধু আরিফের সাথে। সে এখন আমেরিকার নিউইয়র্কে থাকে। সেখানে সে একটি ইয়োলো ক্যাব চালায়। নিউইয়র্কে তার আবার নিজস্ব দুইটি বিশাল বাড়িও আছে। অনেক টাকার মালিক সে। গ্রামে তার বাড়িটা একদম দেখার মত। কয়েক কোটি টাকা দিয়ে সে বাড়িটি বানিয়েছে। তার বাড়িটি দেখার জন্য গ্রামে প্রতিদিন মানুষ আসে। পাশা তার ছোটবেলার বন্ধুকে রাস্তায় পেয়ে আনন্দিত হয়ে বলল-
কিরে তুই কবে আইলি? মেলা দিন তোরে দেহি না। আঙ্গো কথা তো একদম ভুলি গেছিস।
না রে ভুলি নাই। কাজকর্ম নিয়া হগল সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই সবসময় তোগো কথা মনে হইলেও কথা বইলবার সময় হয় না। আরিফ বলল।

তার কাছ থেকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য বিভিন্ন পরামর্শ চাইল। আরিফের কাছ থেকে সে জানতে পারে, কিভাবে সে বিশ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে আমেরিকায় অবৈধ পথ দিয়ে আসে এবং সে আমেরিকায় বৈধতা লাভ করে গ্রিন কার্ডও পায়। এ কথা শুনে পাশার বুকে আশার আলো জমা শুরু করে। তার কাছ থেকে ওই দালালের সব তথ্য চেয়ে নেয় এবং অবৈধ পথে আরিফের আমেরিকা যাওয়ার পুরো ঘটনা শোনে। মনে মনে পাশা ভাবল, সে-ও একদিন হয়তো তার স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় যেতে পারবে।

পরের দিন পাশা দালালের সাথে সরাসরি দেখা করে। দালাল তাকে বলে পঁচিশ লাখ টাকা দিতে হবে। আর টাকা দিলেই সে পাশার আমেরিকা যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দেবে। পাশা সংকটে পড়ল। এতো টাকা একসঙ্গে সে পাবে কোথায়? ব্যাংকে তার দশ লাখ টাকার মত জমা আছে। বাকি টাকা সে পাবে কোথা থেকে? তখন সে ভাবল, তার টেম্পুটি বিক্রি করে দেবে আর পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া তিন বিঘা জমিও বিক্রি করে দেবে। তারপরও যেমন করে হোক সে আমেরিকা যাবেই।

কিছুদিন পর পাশা তার নিজের টেম্পু বিক্রি করে দিলো। এরপর তার জমিটাও বিক্রি করে দিলো। মোট পঁচিশ লাখ টাকা জোগাড় করে সে দালালের হাতে তুলে দিলো। আমেরিকা যাওয়ার দিনক্ষণও ঠিক করে এলো।

বাংলাদেশ থেকে প্রায় ত্রিশ দিন পর বহু কষ্টে, বহু নদী-সমু্দ্র পাড়ি দিয়ে পাশা মেক্সিকোতে পৌঁছল। বহুদিন না খেয়ে বা অল্প খেয়ে পাশাকে থাকতে হয়েছে। বহু দেশের বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বতও তাকে পাড়ি দিতে হয়। এমন কষ্ট হবে আগে জানলে সে জীবনেও আমেরিকায় আসার স্বপ্ন দেখত না। সবসময় ছিল বিভিন্ন দেশের পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়। তার উপর ছিল বন-জঙ্গলের হিংস্র প্রাণিদের হাতে মৃত্যুর ভয়। জলপথে তো কষ্টের সীমাই নেই। দিনের পর দিন না খেয়ে ছিল সাগরের গভীরে। ছোট্ট জাহাজের ভেতরে ঝড়-তুফানের মধ্যে জীবন নিয়ে খেলতে হয়েছে। ছোট্ট জাহাজে এত মানুষ ছিল যে, জাহাজটির অতিরিক্ত একটি তিল ধারনের ক্ষমতাও ছিল না। সাগরের মধ্যে ঝড়-তুফান এলে মনে হতো, বুঝি জাহাজটি এখনই ডুবে যাচ্ছে।

যা হোক, মেক্সিকোতে পৌঁছে সে স্বস্তির নিশ্বাস নিল। ভাবে এই বুঝি কষ্টের দিন শেষ। মেক্সিকো পার হলেই তো স্বপ্নের আমেরিকা। মেক্সিকোতে পৌঁছার পর দালালরা পাশাসহ আরও অনেককে দুর্ধর্ষ মেক্সিকান মাদক পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পাশা জিজ্ঞেস করলে ওরা পাশাকে বলে, ওদের কাজ শেষ এবং এখন মাদক পাচারকারীরা তাদের আমেরিকায় পৌঁছে দেবে। এরপর সবাইকে নিজ নিজ মত ব্যবস্থা করতে হবে।

পাঁচ দিন হয়ে গেল মাদক পাচারকারীদের কোন খবর নেই। ওদের সবার হাতে থাকে বিশাল বিশাল অস্ত্র-শস্ত্র। কারো সাথে কোন কথা নেই। অন্যদিকে পাশার শরীরটি তেমন ভালো নেই। গত কয়েকদিন তারা পাশাকে ঠিকমত খেতে পর্যন্ত দেয়নি। দুই দিনে একবার খেতে দেয়। পাশা ক্ষুধার জ্বালায় এখন চটপট করছে। কিন্তু কী করবে? মনে মনে সে ভাবছে আমেরিকা একবার পৌঁছলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন একটু কষ্ট সহ্য করতে হবে।

কিছুক্ষণ পর একদল মাদক পাচারকারী অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে তাদের সবাইকে দলবেঁধে নিয়ে গেল। বন-জঙ্গলের ভেতরে ঘণ্টা পাঁচেক হাঁটার পর পাশা দেখল যে, আর হাঁটার জায়গা নেই। মনে হয় পৃথিবীর শেষপ্রান্তে তারা চলে এসেছে। সবাই ওখানে থামল। অন্যদিকে পাশা তো পেটের ক্ষুধায় অস্থির।

তিনজন মাদকসেনা মাটির ভেতর কোদাল দিয়ে গর্ত করে কী জানি খুঁজছে। পাশাও অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আবার তার মনে ভয়ও করছে। পাশা চিন্তা করছে কী কারণে এরা মাটিতে গর্ত করছে। সবাইকে যদি ব্রাশফায়ার করে মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। তাদেরই বা কী করার আছে? পাশা মনে মনে সেটা ভাবছে। আর তার কলিজা দুরদুর করে কাঁপছে। সব মাদকসেনার হাতে বড় বড় সবধরনের আগ্নেয়াস্ত্র আর রাম দা’র মত ধারালো অস্ত্র। ভয়ে পাশা তার ক্ষুধার কথা একদম ভুলে যায়। পাশার মতো অন্য সবাই ওই মাদকসেনাদের মাটি খুঁড়তে দেখে ভয়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে। সবাই ভাবছে, মাদকসেনারা হয়তো তাদের জন্য কবর খুঁড়ছে।

চলবে…

এসইউ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :