সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা : আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো ভালোবাসা

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

মামুন রশীদ

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (জন্ম ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, মৃত্যু ২৩ অক্টোবর ২০১২), বাংলা সাহিত্যের পাঠকের অতি পরিচিত একটি নাম। সাহিত্যের প্রায় সব শাখায়ই নামটি জড়িয়ে রয়েছে। যেখানেই তিনি হাত দিয়েছেন, উঠে এসেছে সোনা। তবে সাহিত্যের সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি পরিচিত কবি পরিচয়ে। তিনি কবি— হ্যাঁ, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণ সাহিত্য, শিশুদের জন্য অসাধারণ সব লেখা যার হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে—সেই সব লেখাকে স্বীকার করে নিয়েই তিনি কবি। ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সম্পাদক, নাট্যকার, কলামিস্ট—এরকম অসংখ্য পরিচয়কে ছাপিয়েই তিনি কবি। যার হাত দিয়ে বেরিয়ে এসেছে পূর্ব-পশ্চিম, সেই সময় এবং প্রথম আলোর মতো দীর্ঘ ঐতিহাসিক উপন্যাস, নিজ নামের বাইরে যিনি নীললোহিত, সনাতন পাঠক, নীল উপাধ্যায় ছদ্মনামেও তুমুল জনপ্রিয়। তারপরও তার বড় পরিচয় তিনি কবি।

বাংলাদেশের মাদারীপুরের কালকিনিতে জন্ম নেওয়া কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান। নানান দেশ ঘুরলেও কলকাতার মায়া ছাড়েননি। ভালোবাসার এই শহরে, রোজ দুপুরে বাবার আদেশে রোজ দুটো করে টেনিসনের কবিতা অনুবাদ করতে করতে কী করে তিনি কবি হয়ে উঠলেন, তা পাঠকের অজানা নয়। প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পায় ১৯৫৮ সালে। একা এবং কয়েকজন, এই নামে পরে তিনি উপন্যাসও লেখেন। আত্মপ্রকাশ নামে প্রথম উপন্যাস বের হয় ১৯৬৬ সালে। অসংখ্য স্মরণীয় রচনার জন্ম দেওয়া, প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় নিজের প্রতিভার পূর্ণ ছাপ রাখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাই তাকে করে তুলেছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

তাঁর আত্মপ্রকাশকালের কবিতাকে বলা হয় ‘অহংকৃত আত্মপ্রচার’। তিনি সেই সময়ের কবি। দেশ বিভাগের অল্প পরে আত্মপ্রকাশ করা কবিরা প্রথম আধুনিকদের উত্তরাধিকারকে আত্মস্থ করে বাংলা কবিতার বিপুল সম্ভাবনার পথ খুলে দিলেন। দেশ বিভাগের পর বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলও দুভাগ হয়ে গেল। সীমান্তের কাঁটাতার বাংলাভাষার মাঝেও দেয়াল তুলে দিল। বাস্তুভিটে থেকে মানুষ উচ্ছেদ হয়ে নিজেদের ঠিকানা বদলে নিল। বাড়ি বদল হলো, রাষ্ট্রের পরিচয় বদল হলো, মসজিদ, মন্দিরকে ঘিরে দাঁড়াল মানুষ। উপাসনালয়ের আশ্রয়ের নামে, ধর্মকে পুঁজি করে কিছু মানুষ সুবিধা আদায়ের পথ খুঁজলো, ভাইয়ের রক্তে লাল হলো মাটি, বিভাজন হলো দেশ, সেই বিচ্ছেদের বেদনা গাঢ় হলো, ফলে নিঃসঙ্গতা, নির্জনতার পাশাপাশি এলো হতাশা, এলো মুক্তির সম্ভবনার কথা। তাই এই সময়ের কবিতা হয়ে উঠলো আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রচারের মাধ্যম।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও দেশভাগের বেদনায় ক্ষত হৃদয় নিয়ে শৈশব, কৈশোরের অভিজ্ঞতা আর স্মৃতিমালা গাঁথলেন। সেই শব্দের সেই মালায় ব্যক্তি আমিকে খুঁজে পেল পাঠক। তাই তাঁর কবিতা হয়ে উঠলো স্মরণীয় পঙক্তির সমাহার। কবিতা ‘মেমোরেবল স্পিস’—এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো তাঁর কবিতায়। ফলে জীবনানন্দ উত্তর বাংলা কবিতার ইতিহাসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো এত বিপুল, স্মরণীয় পঙক্তি রচনার কৃতিত্ব খুব কম কবির ভাগ্যেই জুটেছে। ‘তেত্রিশ বছর কাটল। কেউ কথা রাখেনি’—কেউ কথা না রাখলেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কবিতার সঙ্গে, কবিতার পঙক্তির সঙ্গে পরিচিত না বাংলা কবিতার এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া যাবে না সম্ভবত। প্রথম যৌবনে, হঠাৎ যৌবন পাওয়া কিশোরের মুখে সুনীলের কবিতা থাকবে না, তাও যেন অসম্ভব। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে যত কবি কবিতা লিখেছেন—তাদের মাঝে পাঠকপ্রিয়তায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এগিয়ে থাকলেও কেন যেন আলোচক-সমালোচকদের কলম তাঁর কবিতাকে আকৃষ্ট করেনি।

শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার প্রমুখের কবিতা বিশ্লেষণে, তার শিল্পগুণ বিচারে সমালোচকরা যতটা আগ্রহী সুনীলের কবিতা বিচারে ততটা নয়। তাঁর কবিতা নিয়ে খুব বেশি প্রবন্ধ-নিবন্ধ দুই বাংলার কোথাও লেখা হয়নি। এর কারণ কি সুনীলের কবিতায় তথাকথিত আড়াল নেই বলে? আবেগের এমন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস কোথাও বাঁধা পায় না বলে? না কি তার গদ্য রচনা সম্ভার কবিতাকে ছাপিয়ে গেছে বলে? সুনীলেরর রচনা সম্ভার বিশাল। গদ্য-পদ্য মিলিয়ে তা সাহিত্যের কাছে এক নিবিড় সমর্পণ। কবিতাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেকে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই নিয়েছিলেন—তাই যে বিপুল সম্ভবনা নিয়ে তিনি ‘একা এবং কয়েকজন’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন তারই পূর্ণ রূপ দিয়েছেন পরবর্তীতে।

তিনি কবিতা যাপন করেছেন—তাই আত্মস্বীকৃত তার কবিতাতেই ফুটে ওঠে এর নিটোল বর্ণনা—
‘কবিতা লেখার চেয়ে কবিতা লিখবো এই ভাবনা
আরও প্রিয় লাগে
ভোর থেকে টুকটাক কাজ সারি, যে ঘর ফাঁকা করে
সময়ে সুগন্ধ দিয়ে তৈরি হতে হবে
দরজায় পাহারা দেবে নিস্তব্ধতা, আকাশকে দিতে হবে
নারীর উরুর মসৃণতা তারপর লেখা
হীরক-দ্যুতির মতো টেবিল আচ্ছন্ন করে বসে থাকে
কালো রং কবিতার খাতা
আমি শিস দেই, সিগারেট ঠোঁটে, দেশলাই খুঁজি
মনে ফুরফুরে হাওয়া, এবার কবিতা, একটি নতুন কবিতা…
তবু আমি কিছুই লিখি না
কলম গড়িয়ে যায়, ঝুপ করে শুয়ে পড়ি, প্রিয় চোখে
দেখি সাদা দেয়ালকে, কবিতার স্বপ্নসুখ
গাঢ় হয়ে আসে, মনে মনে বলি, লিখবো
লিখবো এতো ব্যস্ততা কিসের
কেউ লেখা চাইলে বলি, হ্যাঁ, হ্যাঁ ভাই, কাল দেবো, কাল দেবো
কাল ছোটে পরশু কিংবা তরশু কিংবা পরবর্তী সোমবারের দিকে
কেউ কেউ বাঁকা সুরে বলে ওঠে, আজকাল গল্প উপন্যাস
এত লিখছেন
কবিতা লেখার জন্য সময়ই পান না
বুঝি? না?
উত্তর না দিয়ে আমি জনান্তিকে মুখ মুচকে হাসি
ফাঁকা ঘরে, জানালার ওপারে দূর
নীলাকাশ থেকে আসে
প্রিয়তম হাওয়া
না-লেখা কবিতাগুলি আমার সর্বাঙ্গ
জড়িয়ে আদর করে, চলে যায়, ঘুরে ফিরে আসে
না হয়ে ওঠার চেয়ে, আধো ফোটা, ওরা খুনসুটি
খুব ভালবাসে।’

এই ভালোবাসা বা প্রেম আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। তিনি প্রেমিক, সেই প্রেম এক নিবিড় সমর্পণ। যা যন্ত্রণার মাঝে, আস্থার সঙ্গে, বিশ্বাসের সঙ্গে, পরিশীলিত আবেগের মধ্যে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ‘নীরা’ নামের এক নারীর মাঝে। এই নারীর মধ্য দিয়েই পূর্ণ হয়ে ওঠে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাহাকার, আর্তনাদ, আর আত্মজিজ্ঞাসা। প্রেম যেমন সুনীলের কবিতার প্রাণ, আর এই প্রাণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে নীরার মধ্য দিয়ে। তাই তিনি বলেন—
‘নীরা, তোমার মাথায় ঝড়ে পড়ুক
কুয়াশা মাখা শিউলি
তোমার জন্য শিস দিক একটি রাতপাখি
পৃথিবী থেকে যত সুন্দর যদি লুপ্ত হয়ে যায়
তবু, ওরে বালিকা, তোর জন্য আমি এই সব
রেখে যেতে চাই।’
(নীরার জন্য: স্বর্গ নগরীর চাবি)

এই নীরা, কবিতার মায়াবী, সুনীলের মানস সঙ্গিনী কখনো বলিকা, কখনো নারী, কখনো রমনী, কখনো দেবী যার সঙ্গে তাঁর খুনসুটি অসীম অপার। এই নীরা কখনো মায়াবতী, কখনো দয়াবতী, কখনোবা স্বৈরিনী, তাই নীরাকে নিয়েই নীরার জন্যই তাঁর সব:
‘আমার কাঙালপনা দুর্লভ দু’একদিন
নীরাকেও করে তোলে
কিছু দয়াবতী
তীর্থের পুণ্যের মতো সামান্য লাবণ্য ছুঁয়ে দেয়
তীর্থের পুণ্যের মতো? তার চেয়ে কম কিংবা
বেশি নয়?
রত্ন-সিংহাসন আমি এ-জন্মে দেখিনি একটাও
তবুও নীরার জন্য বৈদুর্যমনির সিংহাসন আমি
পেতে রাখি
যদি সে কখনো আসে, সেখানে যে বসবে না
জলে-ভেজা একটি পা
শুধু তুলে দেবে।
নীরা, তুমি জেনে রাখো, সেরকমই সাজানো রয়েছে।’
(মিথ্যে নয়: সোনার মুকুট থেকে)

যে নীরার জন্য সাজানো সব, যে নীরার জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা, সেই নীরাও কিন্তু স্পষ্ট নয়, সেও সত্যিকারের নীরা কি না সে দ্বিধাও উঁকি দেয় কবির মনে। আসলে, ‘সাহিত্যের উপজীব্য সেই মানুষ, যে মানুষকে তার বিরুদ্ধে তার পরিবেশ অহরহ ভাঙাছে, গুঁড়োচ্ছে, মোচড়াচ্ছে, দোমড়াচ্ছে, আর অবশেষে একটা বিস্তৃত চেহারায় টেনে আনছে; যে মানুষকে তার সব অপরিতৃপ্ত বাসনা, সমস্ত অপূর্ণ ইচ্ছা, প্রতি পদে দীর্ণ-বিদীর্ণ, খণ্ড-বিখণ্ড করছে, আর যে মানুষের এই খণ্ড-দীর্ণ রক্তমাংসের অতীতে অবস্থিত এক অমৃত পিপাসু আত্মা অনুক্ষণ জর্জরিত বেদনায় আর্তনাদ করছে।’ (ঐতিহ্য আধুনিকতা ও আহসান হাবীব: হোসেনউদ্দীন হোসেন, পৃষ্ঠা-১, বাংলা একাডেমি, প্রথম প্রকাশ- মে ১৯৯৪)। এই আর্তনাদই নীরাকে স্বতঃস্ফুর্ত করে তুলেছে সুনীলের কবিতায়।

আধুনিক কবির সংশয়বাদী মনোভাব নীরাকে শরীরি করে তুলেছে। নীরা কোনো নিরাকার নারীর মূর্তি নয়, নীরার শরীর আছে, তার ভাষা আছে, অনুভূতি আছে—যদিও কখনো কখনো মানবিক দ্বিধাও ছড়িয়ে পড়ে—নীরাকে তখন শুধু নারী বলে ভাবতে সংশয় কাজ করে—‘নীরা নাম্নী মেয়েটি কি শুধু নারী! মন বিঁধে থাকে/নীরার সারল্য কিংবা লঘু খুশি,/আঙুলের হঠাৎ লাবণ্য কিংবা/ ভোর ভোর মুখ/ আমি দেখি, দেখে দেখে দৃষ্টিভ্রম হয়/এত চেনা, এত কাছে, তবু কেন এতটা সুদূর? (শিল্প: দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়)। প্রথম যুদ্ধের অভিঘাতে যেমন সারা পৃথিবীজুড়েই ভেঙে পড়তে থাকে উনবিংশ শতাব্দীর মূল্যবোধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তা আরও তরান্বিত করে। দুই দুইটি মহাযুদ্ধের প্রভাব- সেইসঙ্গে আঞ্চলিক সংকট, অস্তিত্বের টানাপোড়েনে-শিল্প সাহিত্য কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে। খুঁজে নিতে থাকে নতুন পথ, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য। এর প্রভাবমুক্ত নয় বাংলা কবিতাও।

মহাযুদ্ধ পরবর্তী ঢেউ যেমন তাকে স্পর্শ করেছে, তেমনিভাবে ধর্মের লেবাসে মুড়ে দেশভাগ—যে ভাষায় তিনি আজন্ম কথা বলেছেন, লিখেছেন—পার্শ্ববর্তী দেশে, যে মাটিতে তাঁর জন্ম, সেখানে ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রক্তস্নাত হয়েছে রাজপথ, মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্যেই আরও একটি নতুন দেশের জন্ম। সেইসঙ্গে তার নিজের দেশেও শ্রেণীচেতনার অন্তরালে অপ্রাপ্তিজনিত বেদনার প্রতিফলন তাঁর কবিতাকে স্পর্শ করেছে। ফলে কৃত্রিমতা নয়, আড়াল নয়, বরং লুপ্ত বেদনার অদ্ভুত রূপান্তর তাকে সত্যের অন্বেষায় উদ্বেলিত করে তুলেছে—
‘নীরা, তুমি নিরন্নকে মুষ্টিভিক্ষা দিলে এইমাত্র
আমাকে দেবে না?
শ্মশানে ঘুমিয়ে থাকি, ছাই-ভস্ম খাই, গায়ে মাখি
নদী—সহবাসে কাটে দিন
এই নদী গৌতম বুদ্ধকে দেখেছিল
পরবর্তী বারুদের আস্তরণও গায়ে মেখেছিল
এই নদী তুমি!

হে নিবিড় মায়াবিনী, ঝলমলে আঙুল তুলে দাও
কাব্যে নয়, নদীর শরীরে নয়, নীরা
চশমা-খোলা মুখখানি বৃষ্টিজলে ধুয়ে
কাছাকাছি আনো
নীরা, তুমি নীরা হয়ে এসো।’
(নীরা, তুমি: সোনার মুকুট থেকে)

মুখের ভাষার সঙ্গে কবিতার ভাষার কোন পার্থক্য করেননি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাই তার কবিতা সুখপাঠ্য। কবিতার ভাষার সঙ্গে মুখের ভাষার সেতুবন্ধনের মতোই সুনীল ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে একা সন্ধান করেন জীবনের। মানসিক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে যে সমস্যা সংকুল মনের জানালা খুলে উঁকি দেয় বেদনাঅস্থির মূল্যবোধ—
‘এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?
শেষ বিকেলের সেই ঝুল বারান্দায়
তার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো
যেন এক টেলিগ্রাম, মুহূর্তে উন্মুক্ত করে
নীরার সুষমা
চোখে ও ভুরুতে মেশা হাসি, নাকি অভ্রবিন্দু?
তখন সে যুবতীকে খুকি বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়—
আমি ডান হাত তুলি, পুরুষ পাঞ্জার দিকে
মনে মনে বলি,
যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো—
ছুঁয়ে দিই নীরার চিবুক
এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে আর কোনোদিন
পাপ করতে পারি?

এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি-
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরি
কথাটাই বলা হয়নি
লঘু মরালীর মতো নারীটিকে নিয়ে যাবে বিদেশী বাতাস
আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে সবগুলো সিঁড়ি
থমকে দাঁড়িয়ে আমি নীরার চোখের দিকে…
ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ
সত্যবদ্ধ অভিমান- চোখ জ্বালা করে ওঠে,
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?’
(সত্যবদ্ধ অভিমান: সত্যবদ্ধ অভিমান)

শুধু কি তাই? নীরার হাত ছুঁয়ে, নীরাকে ভালোবেসে আপাত যে স্থিরতার কথা বলা হয়েছে—বাস্তবে সেই স্থিরতা, যা কোনদিনই মধ্যবিত্তের মানস গঠনের জন্য প্রস্তুত নয়, তাকে, তার প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পায়নি। বরং সামাজিক পীড়ন, যুগযন্ত্রণার অস্থিরতা যেভাবে মানুষকে তীব্রভাবে স্পর্শ করেছে, পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে উদ্ভ্রান্ত করেছে, বিষময় করে তুলেছে—সেই অস্থিরতা নীরার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে এসেছে—তাই তাঁর মনে হয়েছে, ‘নীরা/বুকের সিন্দুক খুলে আমাকে কিছুটা দুঃখ বুকের সিন্দুক খুলে, যদি হাত ছুঁয়ে/পাওয়া যেত, হাত ছুঁয়ে, ধূসর খাতায় তবে আরেকটি কবিতা/কিংবা দুঃখ—না থাকার দুঃখ…। ভালোবাসা তার চেয়ে বড় নয়।’ (অপমান এবং নীরাকে উত্তর: আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)। মনস্তত্বের স্বরূপ সন্ধানে যখন মানুষের মন সৌন্দর্য ও নৈতিকতার প্রথাগত ধারণা গ্রহণযোগ্যতা হারায়, তখন যদি অভিজ্ঞতা বলে নীরার মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
‘নীরা, তুমি অমন সুন্দর মুখে তিনশো জানালা
খুলে হেসেছিলে, দিগন্তের মতন কপালে বাঁকা টিপ,
চোখে কাজল ছিল কি? না, ছিল না।
বাসস্টপে তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ—
কেমন সামান্য হয়ে বসেছিলে, দেড় বছর পর আমি আজও আছি
কত লোভহীন—
পাগলামি! স্বপ্ন থেকে নেমে দূর বাসস্টপে এক হেঁটে যাই।’
(এক সন্ধেবেলা আমি: আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)

বাসস্টপে তিন মিনিট, অথচ স্বপ্নে বহুক্ষণ দেখার পর ‘তবুও নীরার মুখ অস্পষ্ট কুয়াশাময়।… নীরার চশমার ফ্রেম সোনালি না কালো?… নীরার চিবুকে কোনো তিল ছিল?’ (কৃতঘ্ন শব্দের রাশি: বন্দি, জেগে আছো)। যদিও ‘নীরার অসুখ হলে কলকাতায় সবাই বড় দুঃখে থাকে’, যদিও ‘নীরার হাসির তোড়ে চিকন ঝর্নার শব্দ ওঠে’। যদিও ‘নীরার মুখের হাসি মুখের আড়াল থেকে বুক, বাহু, আঙুলে ছড়ায়’। যদিও ‘নীরার চোখের জল চোখের অনেক নিচে টলমল’। তবুও নীরার মুখ অস্পষ্ট কুয়াশাময়। কারণ নীরা এ অমিমাংসীত নারীর নাম। বাংলা কবিতার ঐহিত্যের ভেতরেই যেমন সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান, রাধার রূপে যেমন জীবাত্মার পরমাত্মার সন্ধান, তেমনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও নীরার রূপের ভেতর দিয়েই সন্ধান করেছেন অজানার, অসীমের—যার প্রকাশ সমসাময়িক জীবনের বর্ণনার ভেতর দিয়ে। তাই নীরা কখনো সিদ্ধান্ত দেয়, আবার কখনোবা হয়ে ওঠে রহস্যময়। অনন্ত জিজ্ঞাসার মাঝে নীরা শুধু অপাঠ্য বেদনার কথাই বলে না, সে মৃত্যু ও বিভীষিকার মাঝে তুলে ধরে অবিকল মানুষের রূপ।

বাংলা কবিতার ইতিহাসে অসংখ্য স্মরণীয় পঙক্তির রচয়িতা কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

এসইউ/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]