মা

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৩ পিএম, ০৫ জানুয়ারি ২০২১

 

ডা. তনুশ্রী ডাকুয়া

ট্রেনের হুইসেলে ঘুমটা ভাঙলো মারিয়ামের। চোখটা না লেগে কই যাবে? সেই সাতক্ষীরা থেকে ঢাকা কি কম পথ! আরও ঈদের বেলা। ১৪ ঘণ্টা টানা বসার অভ্যাসও তো মারিয়ামদের মতো কাজের মানুষদের নেই।
‘ভাইজান ঢাহা কি চইলা আইসি?’ পাশে বসা মাঝবয়সী এক অপরিচিতকে জিজ্ঞাসা করে মারিয়াম।
‘জ্বী।’ ওপাশ থেকে ছোট্ট উত্তর।

ট্রেন থেকে নেমে কোনোভাবে শুনে শুনে বাস ধরে কোথাও বা হেঁটে পৌঁছে গেছে সে। সে মল্লিক নিবাসের সামনে। একদিন তাকে একাই চলে আসতে হবে এত দূরে, সে কি কখনো ভেবেছিল! কী করবে? নাড়ির টান। না চাইলেও টেনে আনে। সে তার স্বামীর কাছে শুনেছে, এই মল্লিক নিবাসেই ৩ বছর আগে রেখে গিয়েছিল তার চোখের মণিকে। নামও রাখেনি তখন পিচ্চিটার। পরী বলে ডাকতো। কী সুন্দর দেখতে। মায়াভরা চোখ। গ্রামের সবাই বলতো, ‘কিরে মারিয়াম, কার মাইয়া চুরি কইরা আনচ। হাচা কইরা ক দেহি।’
মারিয়াম কিছু বলতো না। লজ্জায় যেন শ্যামলা মুখটা লালচে হয়ে যেত। আম পাতায় তেল লাগিয়ে কেরোসিনের বাতিতে ধরে কাজল বানিয়ে লাগিয়ে রাখতো কপালের মাঝখানে।

‘কাকে চাই?’ হাতে লাঠি, পুলিশের মতন পোশাক পরা লোকটার হাঁকে ঘোর কাটল।
‘জ্বী মানে, মুই মল্লিক সাহেবের বাড়িতে আইজ থেইক্কা কামে আইছি ওই গেরাম দিয়া’। চোখটা মুছে নিয়ে বলল।
পুলিশের পোশাক পরা লোকটা কাকে টেলিফোন করল। একজন সাহেবের বউদের মত মহিলা নেমে আসলো।
‘তুমি মারিয়াম?’
‘হ আম্মা।’
‘আম্মা ডাকবে না আমায়, আপা বলবে।’
‘আইচ্চা।’ চোখ নিচু করে উত্তর দেয় মারিয়াম।
‘জামিল গেটটা খুলে দাও, এই মারিয়াম তুমি আস।’

ওর মধ্যে যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছে। কতদিন পরে দেখবে পরীকে, ওর চোখের মণি। কই? কোথায় পরী? ওর কাছে আসছে না তো। কী ছাইপাশ ভাবছে। ওর কথা কি মনে আছে পরীর? সেই ২ মাস বয়সে দেখেছে।
‘আফা, বাসায় কি আফনে একাই থাহেন?’
‘না, আমি আর আমার মেয়ে। মেয়ের বাবা বিদেশেই থাকেন অর্ধবছর।’
‘আফা, আম্মাজান কোই?’
‘ও ঘুমাচ্ছে। তুমি যাও, গোছল করে আসো। আর শোন, অপরিষ্কারভাবে কখনো আমার মেয়ের কাছে যাবে না, বুঝেছো? আর আম্মা ডাকবা না। ওর নাম জেরিন। জেরিন মামণি ডাকবা।’
‘মামণির ঘরডা কোনদিকে আফা? অহন যামু না এমনেই জিগাই।’
মিসেস মল্লিক ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন নিজের কাজে।

মেয়েকে একপলক দেখার লোভ কিভাবে সামলাবে? দূর থেকে দেখলো, চোখ ফেরানোই যায় না। এখনো কী রকম সুন্দর। না, আপা দেখেনি। চারপাশে দেখে নিয়ে গোসলে গেল মারিয়াম। অপেক্ষায় আছে কখন পরীর ঘুম ভাঙবে? একটাবার নিজের কাছে জড়িয়ে নেবে।

বিকেলে চা করছিল মারিয়াম। সব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছে আপা।
‘কে তুমি, আমাদের বাসায় নতুন বুঝি?’
ছোট্ট আদুরে গলার কথা শুনে তাকিয়ে দেখে তার পরী। হাতে কী সুন্দর একটা পুতুল। একদম রাজকন্যার মতো লাগছে।
‘আম্মা, পরী আমার, কেমন আছোস আম্মাজান আমার।’ বলেই জড়িয়ে নিলো সে।
‘ভা-আ-লো’। বলেই পালালো।

প্রথম প্রথম পরী আসতে চাইতো না মারিয়ামের কাছে। বলতো, ‘এ মা, কী পচা কয়ে কতা বয়ও তুমি, আপ্পো না’। কখোনো বা বলতো, ‘তুমি আমাল মত ছুন্দল না কেন? জানো, মাম্মা বয়ে আমি কু-উ-ব ছুন্দল।’ মারিয়াম মেয়ের কথা শুনে হাসতো মনে মনে। ভাবতো, কত্ত সুন্দর কথা বলে আমার মেয়ে। হয়তো আমার কাছে থাকলে আমার মতই হতো। কিন্তু আমি কি ইচ্ছা করে পরের কাছে নিজের মেয়েকে দিয়েছি? পরীর যখন দু’মাস বয়স। ভীষণ অসুখ করলো। ডাক্তার বলল, ‘অনেক টাকা লাগবে। অনেক দিন চিকিৎসা করাতে হবে।’ কী অসুখ তা তো মারিয়াম জানে না। তার বর একদিন এসে বলল-
‘মারিয়াম তোরে একখানা কথা কতাম, ঠান্ডা মাথায় শুনবি।’
‘কী, কন?’
‘দ্যাখ, আমি পরীর বাবা। তোর অর জন্নি জত কষ্ট হয়, আমারও হয়। মাইয়ে যদি আমাগে কাছে থাকে। অরে আমরা বাঁচাতি পারবো না। মল্লিক সাহেব আছে না ওই শহরে থাকে? উনি নিতি চাইছে। সব চিকিৎসার টাহা উনিই দিবেন। মাইয়েডা ওনারে দিয়ে দিতি হবে।’
সেদিন মারিয়াম দিতে রাজি হয়নি, ভুল বোঝে স্বামীকে-
‘আপনে কি মানুষ না পাষাণ’ বলে উঠে চলে গিয়েছিল। ভুল ভেঙে গেল কয় দিনেই। পরীর আবারও অসুখ করল। টাকা জোগাড় করতে না পেরে দিয়ে দিতে হলো ২ মাসের পরীকে। অনেক কেঁদেছিল সেদিন ও। বারবার স্বামীকে বলেছিল, ‘আমার পরীকে এনে দ্যান। নইলে আকটু বিষ দ্যান’। আস্তে আস্তে ব্যথাটা চাপা পড়ে যাচ্ছিল।

দুই বছর ধরে আছে মল্লিক নিবাসে। পরীর সাথে ভালো ভাব জমে গেছে। পরী মারিয়ামকে ছোট্ট করে ‘মাম’ বলে ডাকে। মামের সাথে খেলা করে। মাম ঘুম পাড়িয়ে দেয়। দুই বছরে কথাটাও একটু শহুরে করার চেষ্টা করেছে সে। পরী যে গ্রামের কথা পছন্দ করে না।

একদিন একটি চিঠি সব সুখের অবসান ঘটালো তার। গ্রাম থেকে আসা তার স্বামীর চিঠি। মিসেস মল্লিক চিঠিটা খুলে দেখলেন। রহিমের চিঠি! মাথা যেন ঘুরে গেল মিসেস মল্লিকের। তার মানে মারিয়াম রহিমের স্ত্রী! না না, এ হতে পারে না। জেরিন শুধুই তার। আর কারও না!

কেন, কী কারণ- কিছু না বলে সেদিন এক্সট্রা ছয় মাসের বেতন, দুটা শাড়ি দিয়ে মারিয়ামকে বলে দিলেন, ‘আর কাজ করার দরকার নেই। এখন জেরিন বড় হয়েছে।’ তিনি নিজেই সবটা পারবেন। অনেক বলেছিল মারিয়াম, ‘আফা, আমার টাকা লাগব না। আমারে কাজে রাহেন, কাজে রাহেন।’ অনেক কেঁদেছিল। তিনি অনড় কথায়।
আসার সময় অনেক চেয়ে পরীর একটা জামা এনেছিল। পরীও অনেক কেঁদেছিল, ‘মামকে যেতে দিও না মাম্মা। আমায় রেখে যেও না মাম। তোমায় ছাড়া ঘুমাবো না। মাম যেও না।’ কিন্তু মাম যে নিরুপায়।

দশ বছর পরীর জামা বুকে জড়িয়ে কাটাচ্ছে। একদিন শহর থেকে বড় এক গাড়ি এসে থামল ওদের বাড়ির সামনে। মল্লিক সাহেব! কী যেন ডেকে বলল মারিয়ামের স্বামীকে। বসল না। আবার ওই গাড়িতেই চলে গেল। ফ্যাকাশে মুখ করে রহিম বসল বারান্দায় মাটির উপরে।
‘ও পরীর বাপ, কী অইচে? কথা কও না ক্যান? আমার পরী কেমন আচে?’
‘পরীর যে আবার অসুক করচে রে মারি।’
‘কন কি আপনে? না না, এইডা অইতে পারে না। কিচ্চু অইব না আমার পরীর, কিচ্চু না।’ কান্নায় গলা বুজে আসে।
‘ওর না কি দুইডা কিডনি আছে, তা-ই নষ্ট। বহুত টাকা খরচ করচে। বহুত মানুষের কাছে গেছে। কারো না কি মেলে নাই। তুই একবার যাবি মারি?’

আজ ক্লিনিক থেকে ছাড়ছে মারিয়ামকে। শরীরটা খুব দুর্বল। রহিমের হাত ধরে বাসে উঠছে।
‘আমার পরী কেমন আছে, পরীর বাপ?’
‘ভালা’।
‘আমার পরী, একটাবার দেহাবা ওরে? মনডা কেমন করতাসে। মনে হয় আর দেহা পামু না। ও পরীর বাপ, দেহাবা? কও না ক্যান?’
‘তার সাথে দেহা হবে না অহন, গাড়িতে উঠ।’

আজকাল চলাচল করতে বড় কষ্ট হয় মারিয়ামের। ঘরের কাজ সব রহিমই করে। আগে নিজে খেতে পারত। এখন তা-ও পারে না। দুটা কিডনি নেই তার। আর কয়দিন থাকবে সে, তা-ও ভরসা নেই।
‘পরীর বাপ, পরীরে একটা চিঠি দিছালা? শেষ দেহাডা কি পামু না?’
‘এই সব কথা কইস না তুই। মাইয়ারে হারাইছি। অহন তুইও যাওয়ার পথে। উপরআলা আমারে কেন তুলে নেয় না।’ জড়িয়ে আসে গলাটা। ‘হ, চিঠি দিসি। কাইল-পরশু আসবে তোর পরী।’
আবারও চোখটা বন্ধ করে নেয় মারিয়াম।

‘আম্মা আম্মা, চোখটা খোল আম্মা। আম্মা তোমার পরী আমি। দেখ না আম্মা? একটাবার দেখ।’
চোখটা খুলে দেখল মারিয়াম। চিনতে কষ্ট হচ্ছে। হ্যাঁ, এই তো পরী। মল্লিক সাহেবও আছেন। হাত দিয়ে পরীর মুখখানা একটু ছোঁয়ার চেষ্টা করল। না, শক্তি পাচ্ছে না।
‘আম্মা, তুমি যখন কাছে ছিলে; তখন চিনতে পারি নাই। আজ যখন চিনছি; তখন আমায় ফেলে যেও না আম্মা। একটাবার কথা বলো, একটাবার পরী বলে সেই ছোট্টবেলার মত জড়িয়ে ধরো।’
পরীর কান্নায় ভারি হয়ে উঠলো চারপাশ। মারিয়াম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। আজ তার মরতেও কষ্ট নেই। তার পরী যে তাকে আম্মা ডেকেছে।

লেখক: এমবিবিএস (ঢামেক), ইন্টার্ন চিকিৎসক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

এসইউ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]