মায়াভ্রম

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৫০ পিএম, ২৩ মার্চ ২০২১

সানজিদা সামরিন

একটা ট্রেন ছুটে যাচ্ছে। ঝিকঝিক শব্দে মস্তিষ্কের সব স্মৃতি এধার-ওধার হবার অবস্থা। আমি ছুটছি। আর আমার পেছনে ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছে একটা কালো কুকুর। ট্রেনে আমায় উঠতেই হবে। কিন্তু নিশ্চিত, উঠতে গেলেই নিচে পড়ে গিয়ে কাটা পড়বো। কাটা না পড়লেও ছিলে রক্তাক্ত হবো। এটা আমার চিন্তা। আর কুকুরটা? ইয়া বড় জিহ্বা বের করে লাল চোখে আমাকে বিদ্ধ করতে করতেই চারপায়ে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু আমি তো ট্রেনের পেছনে ছুটছি। কী করে বুঝলাম কুকুরটার লাল চোখ! বা সে চোখ আমাকেই বিদ্ধ করছে তা বুঝলাম কীভাবে? জানি না, কিচ্ছু জানি না। তারপর কী করে যেন উঠেই পড়লাম ট্রেনে। কী অদ্ভুত, সবাই ঘোমটা পরে বসে আছে। নারী, পুরুষ সবাই। আমাকে আড়চোখে দেখে এ ওকে কী কী যেন বলছে।

অস্পষ্ট শব্দগুলোর মাঝে স্পষ্ট শুনলাম আমার নাম। ‘বিভাবরী’। কিন্তু ওরা আমার নাম জানলো কী করে? আমি তো ওদের কাউকে চিনি না। আচ্ছা বিভাবরীই কি আমার নাম? হ্যাঁ, কেন যেন মনে হচ্ছে এটাই আমার নাম। জানি, ওরা আমার চুল নিয়ে কথা বলছে। বলছে এই লালচে ফ্যাকাসে চুলে এক বছরেও তেল দেইনি। আরও বলছে আমার গলায় বের হয়ে যাওয়া হাড়ের রেখা নিয়ে। কিন্তু কোনো কথাই কানে তুলতে ইচ্ছে হলো না। ছেঁড়াফোঁড়া একটা সিটে হেলান দিতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো তেল চিটচিটে মাথাধরা এক গন্ধে। ট্রেনটা থেমে গেছে। কেমন ফাঁকা এক স্টেশন। অনেকেই আছে, কিন্তু শূন্যতা ছেড়ে যায়নি জায়গাটা। আশেপাশে কেউ নেই, গোটা ট্রেনে একা আমি! ভূতের তাড়া খেয়ে মানুষ যেমন দৌড়ায়; তেমনই দৌড়ে নামলাম ট্রেন থেকে। নেমে মনে হলো আরও জোরে দৌড়ানো উচিত। দৌড়াতে দৌড়াতে পেছনে একবার তাকালাম। নাহ, কোনো কুকুর নেই।

এসে থামলাম সরব এক রাস্তায়। রাত তখন চারটা। ল্যাম্পপোস্ট আলো দিচ্ছে। রোডে ট্রাফিক জ্যাম নেই, রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চলছে। এমন সময় রাস্তা এমন সরব থাকে জানতাম না তো! লোকজনও আছে বেশ। যে যার মতো যাচ্ছে, ফুটপাত থেকে এটা-ওটা কিনছে। এমন সময় দেখি, রোড আইল্যান্ডের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্র। আমার দিকেই তাকিয়ে। ও এখানে কী করে? ও কাছে আসতেই বললাম, ‘সমুদ্র, আমায় বাড়ি নিয়ে চলো, গোসল করতে ইচ্ছে হচ্ছে। আর যাবার পথে পুরোটা সময় তোমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাবো।’

সমুদ্র আমার হাত ধরে বাসে উঠলো। ঘিঞ্জি বাস। বসার জায়গাই নেই। সমুদ্র আর আমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ঘুমে ঢুলছি। সে আমায় ধরে আছে। সমুদ্র আমায় ধরে ছিল। ঝাঁকুনিতে যখন এদিক-ওদিক ঢলে পড়ছিলাম, সে শক্ত করে আঁকড়ে ধরছিল। এপাশ-ওপাশ থেকে বাজে লোকগুলো যখন বাস থেকে নামার ছলে গা ঘেঁষে যাচ্ছিল, সমুদ্র চেষ্টা করছিল তাদের ঘামে ভেজা আঠালো শরীর যেন আমায় না ছুঁয়ে যায়। তবে এই সবটার মধ্যেই একটা গুরুদায়িত্ব খুঁজে পেলাম। ধরে রাখা, আঁকড়ে ধরা, গা বাঁচানো সবটাতেই সমুদ্রর দায়িত্বই যেন বেশি স্পষ্ট।

তার কাঁধে মাথা ফেলে আমি দাঁড়িয়ে। চোখ মেলে তার দিয়ে তাকাতেই মনে হলো সমুদ্র একটা নাচের পুতুল। তার হাত-পা সবই নড়েচড়ে। তবে শরীর আর চোখ স্থির। পলকহীন চোখ। কী অদ্ভুত! কেন যেন মনে হলো সমুদ্র আমায় চায় না। এই রাত-ভোরে অহেতুক বাস-গাড়ি চলার মতোই তার আর আমার সম্পর্ক। এমনই সময় সাঁই সাঁই করে দুটো বাস ক্রস করে গেল আমাদের বাসকে। খুব শোরগোল হচ্ছে পথে। সামনে একটা লোহার ফুটওভার ব্রিজ। অনেকগুলো বাস এলোপাথাড়ি করে দাঁড়িয়ে। সেগুলোর সামনে মানুষের জটলা। সবার হাতেই বাঁশ আর লাঠিসোটা। এ কি আমাদের বাসের পেছন পেছন কতগুলো লাঠিসোটাওয়ালা লোক হিংস্রভাবে ছুটে আসছে। ওই কালো কুকুরটার মতো।

ততক্ষণে আমাদের বাস থেমে গেছে। আমার পা নিষপিষ করছে দৌড় দেওয়ার জন্য। অথচ ভেতরে সবাই গা ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে আছি। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। পেছনে তাড়া করা লোকগুলো বাসের গায়ে এলোপাথাড়ি ঠুসঠাস বাড়ি দিচ্ছে লাঠি দিয়ে। এমন সময় ঝনঝন করে বাসের জানালার কাচ ভেঙে পড়লো আমাদের গায়ে। আমার সাদা টি-শার্টের হাতার অংশ একটু লালচে হয়ে উঠলো। সমুদ্র, বাঁচাও! সমুদ্র! তারপর কী করে যেন আমরা বাস থেকে নেমে গেলাম। পথে কী যে ভিড়। এত্ত এত্ত মানুষ। আমি আর সমুদ্র জড়াজড়ি করে আছি। মানুষের ধাক্কায় ঢুলছি। যেভাবে ঘুমে ঢুলছিলাম। সমুদ্রর গায়ে বাঁশ আর লাঠির বাড়ি পড়ছে। তার বুকের ভেতর, আরও ভেতরে আমি মুখ ডুবিয়ে কাঁদছি। এক, দুই, তিন... সমুদ্র কোথায়? সমুদ্র!

জনতার স্রোতে সে আর আমি দু’ভাগ হয়ে ছিটকে পড়লাম। এ জায়গাটা আমার খুব পরিচিত। এই ভোরবেলাটাও আমার পরিচিত। বাবার সঙ্গে এই পথ দিয়েই তো স্কুলে যেতাম। আমি জানি না, মুহূর্তেই আমার টি-শার্টটা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখলাম। পিঠের নিচে বারবার রাস্তার পিচ স্ক্র্যাব করছিল। এত জোরে, এত জোরে সমুদ্রকে ডাকছি! সে একটুও শুনতে পাচ্ছে না! মনে হলো আমার চিৎকার আমি ছাড়া কেউ শুনতে পাচ্ছে না। চিৎকার করতে করতে আমি বুঝলাম, আর স্বর বের হবে না আমার গলা দিয়ে।

আচ্ছন্নতা কেটে গেল কলকল জলের শব্দে। আমার কানের আশপাশে জলের ছেলেপুলে, ভাইবোনেরা হেঁটে, গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। নাকে একটা গন্ধ পেলাম। স্টেশনে যেমনটা পেয়েছিলাম। তবে ওমন তেল চিটচিটে গন্ধ নয়, ল্যাভেন্ডার অ্যাসেনসিয়াল অয়েলের সুবাস। এটা আমার খুব প্রিয়। স্নানের জলে দু’ফোঁটা না দিলেই নয়। আহ্, পিঠের দিকটা জ্বলে জ্বলে উঠছে। আমাকে কি ঘোড়ার পায়ের সঙ্গে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে আনা হয়েছিল? মাথার ভেতরটায় গরম জল উতড়ে পড়ার মতো অনুভূতি। বাথটাবের জলে বাম থেকে ডানে, ডান থেকে বামে শরীর ভেসে গিয়ে থেমে আবার ভেসে যাচ্ছে।

এমন সময় স্নানঘরের দরজা ঠেলে একজন এলেন। সহসা আঁতকে উঠলাম! আমি, আমার শরীর, মন জানে এমনটা হলে আঁতকে ওঠা উচিত। তার মানে কি আমি বিভাবরী রায় বাস্তবেই আছি! যিনি স্নানঘরে প্রবেশ করলেন তাকে সমুদ্র ভাবলাম। অথচ তিনি সমুদ্র নন। মনে হলো তাকে আমি চিনি না। তবে অপরিচিতও লাগছে না। এক মিনিটের পর আতঙ্কও কাজ করছে না মনে। আমি স্নানের জলে ভাসছিলাম। তিনি ঢুকে পড়লেন। আমি আঁতকে উঠেছিলাম। এখন আর আঁতকে নেই। কী অদ্ভুত। তার মুখে স্মিত হাসি। পরনে সাদা টি-শার্ট। আমার টি-শার্টটির মতো। যেটা রাস্তায় ছিঁড়েফেটে লুটোপুটি খাচ্ছিল। তিনি আমায় বাথটাব থেকে তুলে নিলেন। আমি উঠেও গেলাম। এরপর বুঝলাম ভেজা চুলওয়ালা মাথাটা পেতে আছি ঝকঝকে মাইক্রোবাসের পেছনের সিটে। আমার পাশে উনি। সাদা টি-শার্ট পরিহিত ভদ্রলোক। মাথায় কোকড়া চুল, অথচ তা মসৃণ। পরম স্নেহে আমার গা ঘেঁষে আছেন তিনি। আমিও সরে যেতে চাচ্ছি না। চিনি না বলে ইতস্ততও করছি না।

সব কেমন অদ্ভুত স্বাভাবিক! কানের কাছে মুখ রেখে বললেন, ‘পানি খাবে বিভাবরী?’ আমি বলেছি খাবো। তিনি সামনের সিটে বসা কৃষ্ণদাকে বললেন বোতলটা দিতে। আমি কৃষ্ণদাকে চিনলাম। ওনাকে আমি চিনি। কীভাবে চিনি মনে নেই। পানি খেয়ে শেষ করতে করতেই মাইক্রোবাসে আরেকজন উঠলেন। চশমা পরা, হ্যাঙলা করে এক যুবক। অযথাই আমাকে অপদস্ত করতে লাগলেন সে যুবক। আমি শান্ত চোখে নির্বিকার তাকিয়ে। ওভাবেই হেলান দিয়ে। কেন যেন তার কথাগুলো আমার গায়ে উঠলো না। তিনি বললেন, ‘থাক, বিভাবরী ক্লান্ত।’ তিনি বলতে শ্বেতবর্ণের টি-শার্ট পরিহিত তরুণ।

তারপর তিনি আমার দিকে কাঁত হয়ে বসে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। পরম মমতার সে হাত। এরইমাঝে আমি সমুদ্রকে হারিয়ে ফেলেছি। কী জানি, সে আমাকে হারিয়েছে কি-না। না-কি হারিয়ে যাওয়ার জন্যই আমাকে খুইয়েছে। কিন্তু আমার আপত্তি হচ্ছে না তাতে। এই হারানো, আপত্তি না হওয়ায় অ্যালুমিনিয়ামে জিভ লাগার মতো স্বাদ। যাকগে, যেখানে মন চায় যাক। আমি কেবল শ্বেতরঙা টি-শার্টে লেগে থাকা এক শান্ত শরীরের গন্ধ পাচ্ছি। অস্তিত্ব টের পাচ্ছি- একটা সাদা সকালের। একটা সাদা বিছানা। সাদা দেয়াল। বিছানার পাশের টেবিলে রাখা সাদা একগুচ্ছ গ্ল্যাডিওলাস। আমার পায়ের পাশে পড়ে থাকা একজোড়া সাদা পা।

এসইউ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]