মায়াবতী : পর্ব ১১

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০২:৪২ পিএম, ১৩ জুলাই ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি—

তেরো.
টিভির সামনে বসে আছে রিয়া।
রিমোট কন্ট্রোল নিজের হাতে। কোনো চ্যানেলে স্থির হচ্ছে না মন। রিমোট টেপাটেপি করছে। চ্যানেল আসছে একটার পর একটা। মন চ্যানেলে নেই। কেবল চোখ আছে টিভি স্ক্রিনের ওপর। অন্যখানে উড়ে উড়ে বেড়ায় মন। ঘুরে বেড়ায় মন। ভেতরটা শান্ত না। শান্তি নেই মনে। অতৃপ্তি লাগছে। অশান্তি লাগছে।

সামনেই পড়ে আছে সোফার কুশন। সোফার সাইড টেবিলে পড়ে আছে গতকালের পেপার। এলোমেলো, এক পাতা খোলা। এক পাতা ঝুলে আছে পাশে। টিভির স্ট্যান্ডটা নতুন। নতুন স্ট্যান্ডে ছোট ছোট শোপিস সাজিয়ে রেখেছিল রিয়া। বেশ কিছুদিন পিসগুলোতে হাত দেওয়া হয়নি। ধুলো জমে গেছে চারপাশে। টিভির ওপরও জমে আছে ধুলিকণা।

কোনো অনিয়মেই চোখ নেই রিয়ার। রিয়া ছিল টিপটপ। ফিটফাট। মেজাজি রিয়ার হাতের ছোঁয়ায় হেসে থাকত চারপাশ। এখন ঘরে হাসি নেই। মলিন চারপাশটা।

ওর হাতের গতি আকস্মিক থেমে গেল।
রিয়া নড়ে ওঠে। দ্রিম করে কেঁপে ওঠে মন। কেঁপে ওঠে বুক। ঢিপঢিপ বেড়ে যায়। বুকের ভেতর ঘোড়দৌড়ের শব্দ শুনতে পেল ও।
হার্ট বেশি বিট দিচ্ছে। বেশি ছুটছে। বেশি দৌড়াচ্ছে।

টিভির ৩৬ নম্বর চ্যানেলে প্রচারিত ইংরেজি মুভির একটা দৃশ্যে চোখ আটকে গেল।
একটা বন্ধ ঘর। ঘরের ভেতর তিনজন যুবক। একজনের হাতে পিস্তল। ওদের সামনে ক্ষুব্ধ চোখে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। পরিপাটি ড্রেস পরনে। ওর কাঁধে ঝোলানো একটা ক্যাজুয়াল ব্যাগ। স্লিভলেস ব্লাউজের মতো পরেছে স্লিভলেস শার্ট। তরুণীর দুই বাহু উদোম। ঝকমক করছে গায়ের রং। চোখে ঝলসে উঠছে রাগ। রাগ নিয়েই উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে সে।

পিস্তল হাতের যুবক বলছে, ওপেন ইয়োর ড্রেস।
তরুণী দৃঢ়স্বরে বলছে, নো।
চিৎকার করে ওঠে দুর্ধর্ষ যুবক। ওপেন!
ভয়াবহ চিৎকার শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল তরুণী। গলার স্বর আটকে গেল। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
আর কিছু দেখার সাহস হারিয়ে হাতে ধরা রিমোট কন্ট্রোলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাপ দিল রিয়া। অফ হয়ে গেছে টিভি।
ওই দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠল নিজের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জ্যান্ত দৃশ্য। একই রকম দৃশ্যপট। মুভি না। জীবন।
মুভিও কি তাহলে জীবনের দৃশ্য?
জীবনই কি তবে মুভি?

ওর সামনের তরুণগুলো ছিল বিপথগামী। মাদকাসক্ত। ওদের হাতে পিস্তল ছিল না। ওদের আচরণ ছিল কুৎসিত। হাতে ছিল ডেগার।
ডেগার উঁচিয়ে একজন বলেছিল, কাপড় খোল।
রিয়া চিৎকার করে বলেছিল, মরে গেলেও না।
ওদের একজন ঝাঁঝালো স্বরে বলেছিল, যৌবন নেব না। তোর ছবি তুলব। বাধা দিলে যৌবনও কেড়ে নেব। বুকের কাপড় খোল।
ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল অন্য একটা ছেলে। পুঁচকে আরেকটা ছেলে এগিয়ে এস কামিজের হুক খুলে টেনে নিচের দিকে নামিয়ে দিয়েছিল।
একদম অবশ হয়ে গিয়েছিল রিয়া। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল কেবল।
ওরা ইচ্ছামতো ছবি তুলে নিয়েছে।

কী ঘটবে এই ঘটনা থেকে। কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে? ওয়েবসাইটে ছবিগুলো ছেড়ে দিলে কী ক্ষতি হবে? ভাবতে চায় না ও। ভাবনা আসতে থাকে। অজানা শঙ্কা আঘাত হানতে লাগল ব্রেনে। মাথা জ্যাম হয়ে গেল।
ওরা বলেছিল মাসোহারা পেলে অসুবিধে নেই।
ওদের মাদকের জন্য টাকা সাপ্লাই দিতে হবে।
কোথায় পাবে টাকা? আব্বুকেও বলতে নিষেধ করেছেন ফারুক সাহেব। কী উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি? রেজা মামা বলেছিলেন বিষয়টা তিনি দেখবেন। নিজেকে শক্ত রাখতে বলেছেন।
নিজেকে শক্ত রাখা কি এতই সোজা? স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ও।
স্বাভাবিক থাকতে পারছে না। হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় ঘটনাটা। ইশারা-ইঙ্গিতে বিভিন্ন জনেও তা মনে করিয়ে দেয়। তখনই কষ্ট বাড়ে। যন্ত্রণা বাড়ে। অস্বাভাবিক হয়ে যায় রিয়া। স্বাভাবিক হতে সময় লাগে তখন।

রেজা মামার সঙ্গে কথা বলা দরকার।
ফারুক সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার।
এখনো বিপদ সামনে আসেনি। আসার সময় হয়েছে। ওদের হিসাব অনুযায়ী যেকোনো দিন দাবি নিয়ে সামনে হাজির হবে।
ভয় বাড়তে থাকে। ভয় একাকী সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। রেজা মামার নম্বর নেই নিজের ফোনসেটে।
মুনাকে ফোন করতে হবে। ভাবে।
টিভি সেটের সামনে থেকে উঠে নিজের ঘরে আসে ও।
পড়ার টেবিলের ওপর মুঠোফোন সেট পড়ে রয়েছে। বন্ধ আছে।
সেট হাতে নিয়ে অন করে। অন করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের মধ্যে জড়তা নেমে আসে। মনে মনে ভাবে, থাক আজ। পরে ফোন করব।
ফোন করতে গিয়েও থেমে গেল রিয়া।
নিজের স্বতঃস্ফূর্ততা বাধা পেতে থাকে।

আগে এমন ছিল না। রিয়া ছিল প্রাণবন্ত। জড়তাহীন। এখন জড়তা ঠেসে থাকে পায়ে পায়ে। অজানা শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয় জড়তা।
নিজেকে জোর করে শাসন করার চেষ্টা চালায় রিয়া।
সেট হাতে নিয়ে মুনার নম্বরে ডায়াল করে।
মুনা কল অ্যাটেন্ড করেই চিৎকার দেয়। স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক মুনার ধরনই এমন।
মুনার চিৎকারে রিয়ার ভেতরটা নড়ে ওঠে। ভেতরের বর্তমান শঙ্কাবোধ মুহূর্তেই উড়ে যায়।
এলোমেলো আলাপ চলতে থাকে।
একসময় মুনা থামে। থেমে জিজ্ঞেস করে, রেজা মামার সঙ্গে কথা বলবি?
রিয়া সহজ কণ্ঠে জবাব দিল, দে। মামার সঙ্গেও কথা বলতে হবে। ফারুক সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার।
কেন? কোনো ঝামেলা হয়েছে? সন্ত্রাসীরা জ্বালাচ্ছে?
না। সরাসরি ওদের কোনো জ্বালাতন এখনো পাইনি। সরাসরি সামনে আসেনি।
তো, পরোক্ষভাবে সামনে এসেছে?
না। তাও না। তবু ভুলতে পারি না, চিন্তা হয়। ন্যুড ছবির কথা মনে পড়ে। মামাকে জানানো দরকার।
জরুরি বিষয় বুঝতে পারে মুনা। ছটফটে স্বভাবের হলেও চট কর ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে পারে ও। কোনোরকম ফাজলামি না-করে ফোনসেট হাতে নিয়ে মামার ঘরে ঢোকে।

রেজা মামা লেপ মুড়ে শুয়েছিল। ঘুমায়নি। শুয়ে শুয়ে কী যেন ভাবছিল।
মামা, নাও, রিয়ার সঙ্গে কথা বলো।
রিয়া? প্রশ্ন করেই নড়ে ওঠে রেজা। লেপ ছেড়ে উঠে বসে।
বলো। রিয়া বলো। রেজা মামা বলছি।
আপনার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা বলা দরকার।
জরুরি?
হ্যাঁ। বেশি জরুরি না। ফেলনাও না।
ঠিক আছে। তুমি চলে এসো বাসায়। আমি লালমাটিয়াতেই আছি।
মামণি তো এখন একা কোথাও যেতে দেয় না আমাকে।
তাহলে আমি আসব?
আসেন। মুনাকে নিয়ে চলে আসেন। সন্ধ্যার পর একসঙ্গে চা পান করব বাসায়।
আচ্ছা। বলেই লাইন কেটে দেয় রেজা।

মুনা পাশে দাঁড়িয়েছিল।
ফোনসেট নিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। আবার পেছন ফিরে তাকাল ও।
মামা। তুমি একা যাও। আমার কাজ আছে। নইলে যেতাম। রিয়ার কণ্ঠ শুনে মনে হলো জরুরি কোনো আলাপ আছে তোমার সঙ্গে।
রেজা বলল, আমি যাব।

রেজা এর মধ্যে তিনবার এসেছে রিয়াদের বাসায়। সহজ হয়ে গেছে সে রিয়ার মা-বাবার সঙ্গে। রিয়ার সঙ্গে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মুনার ফ্রেন্ড হিসেবে যতটুকু দূরত্ব রাখা দরকার ততটুকু রাখছে। প্রথম দুবার আসার মধ্যে পরিস্থিতির কারণে ছিল একধরনের শঙ্কা। এখন শঙ্কা কম। শঙ্কা যে নেই তা বলা যাবে না। কম শঙ্কার কারণ হলো এখনো সন্ত্রাসীদের কোনো পদক্ষেপ পাওয়া যায়নি।

রিয়া কি কোনো বিপদ আশঙ্কা করছে? ভাবতে ভাবতে এসেছে রেজা। মুনার কথা থেকে বোঝা গেছে বিপদ থাকতে পারে। বিপদে রিয়ার পাশে থাকা উচিত। মনোবল ধরে রাখার বিকল্প কিছু নেই। তবে রেজা নিশ্চিত, বখাটেরা ভয় পেয়েছে। তারা ইতোমধ্যে জেনে গেছে রিয়া পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনারের আত্মীয়। সুনির্দিষ্টভাবে ধরতে না পারলেও তারা নিজেদের সাবধানে রাখবে। তবু বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভাবতে ভাবতে রিয়াদের বাসায় লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল রেজা। লিফ্ট মেরামতের কাজ চলছে। পায়ে হেঁটে উঠতে হবে।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল রেজা। লিফ্ট থেকে ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত লম্বা করিডর। করিডরের দেয়ালে লাগানো আছে ছবি এবং আর্টিফ্যাক্টস। করিডরের দিকে তাকিয়ে অনুভূতিটা অন্যরকম হয়ে গেল। অন্যরকম ভালোলাগায় ছুঁয়ে গেল মন।

রিয়াদের ফ্ল্যাটের বাইরের দরজা খোলা।
খোলা দরজার সামনে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এল রিয়া। বসার ঘরেই ছিল ও।
হাসিমুখে রিয়া বলল, আপনি এসেছেন! খুব খুশি হয়েছি।
কোনো জবাব না দিয়ে হাসিমুখে ভেতরে ঢোকে রেজা।

ঢুকতেই ডানপাশে বসার ঘর। এ ঘরে পূর্ব পাশে ব্রিটিশ স্টাইলের সোফা। সোফায় কারুকাজ অসাধারণ। সোফার আকৃতিটা ভিন্নরকম। দেশে এমন আকৃতির সোফা আগে কোথাও দেখেছে বলে মনে পড়ল না। সোফার ধাতব ধাঁচের বার্নিশ ঘরে বয়ে নিয়ে এসেছে রাজকীয় সৌন্দর্য। গৃহকর্তার আভিজাত্যের পরিচয় করিয়ে দেয় এ দৃশ্যপট।

আগেও রেজা এ বাসায় এসেছে। মনোযোগ দিয়ে কিছুই দেখার সুযোগ হয়নি। তখন সৌন্দর্য ধরা পড়েনি চোখে। এখন ধরা পড়ছে। তখনকার মনের অবস্থা আর এখনকার অবস্থা এক নয়। ভিন্নরকম মনের অবস্থা কি তবে একই দৃশ্য ভিন্নভাবে দেখায়? নাকি বসার ঘরে নতুন ডেকোরেশন করা হয়েছে? মনে হয় না এত ফিটফাট ছিল এ ঘর।

সোফায় বসার পর বাঁ পাশের দেয়ালে চোখ সেঁটে গেল রেজার। বাঁ পাশের দেয়ালে টাঙানো আছে পেইন্টিংস। ফাইবার ফ্রেমে বন্দি পেইন্টিংসের সব কয়টিই ফুল। ফুলদানি।
ফুলের দিকে তাকিয়ে রেজা জানতে চায়, এগুলো কার চয়েস?
রিয়া ঝটপট জবাব দেয়, আব্বুর।
বাহ! তোমার বাবার চয়েস তো অসাধারণ!
রিয়া বাবার প্রশংসা শুনে অভ্যস্ত। সবাই ওর বাবার রুচির প্রশংসা করে। বাবার রুচিবোধ নিজের রুচিবোধও বদলে দিয়েছে। নিজের চেয়েও বাবার প্রশংসা শুনলে বেশি খুশি হয়। বাবা হচ্ছে তার ভিন্ন জগৎ। বাবার জন্য বুকের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক মায়া, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা।

বসার ঘরে রেজার বাঁ পাশে এককোনায় রয়েছে সোফার ধাতব বার্নিশের সঙ্গে ম্যাচ করা একটা হাতলওয়ালা চেয়ার। চেয়ারে বসার গদিটা লাল কুশন্ড করা। ওই চেয়ারে বসল রিয়া। পাশাপাশি বসে কথা বলছে ওরা।
তো, কেমন আছো? রেজার সহজ জিজ্ঞাসা।
ভালো, আবার ভালো না। রিয়াও সহজভাবে জবাব দেয়।
ভালোটা কী?
ভালোটা কী জানি না। তবে এটা জানি, মামণি এখন বেশ শান্ত। আব্বুও আবার ব্যস্ত হয়ে গেছেন। সংসারের ঝড় কমে গেছে। শান্তি এসেছে ঘরে।
বাহ! তাহলে তো সমস্যা চুকেই গেছে।
হেসে দেয় রিয়া। এটা বাইরের জগৎ। দৃশ্যমান জগতের শান্তি এসেছে। মনের খবর নেবেন না?
মনের খবর কী? ঝড় আছে মনে?
শীতল ঝড় বইছে মাথায়। হঠাৎ হঠাৎ ভয় আসে। মন কাঁপে। জমে যায় মন।
কেন? ওরা কি ঝামেলা করছে?
ওরা ঝামেলা করেনি এখনো। তবে নিজের মন ঝামেলা করে। মনের শঙ্কা ঝামেলা তৈরি করে। ছবিগুলো নিয়ে উদ্বেগ মাথা থেকে যায় না।
এগুলো হচ্ছে মনের চিন্তা। মনের বাঘ তোমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
বনের বাঘ তো ধরা পড়েনি। যেকোনো সময় আক্রমণ করবে না তো?
এটাও শঙ্কা। মনের বাঘ।
মনের বাঘ হলে তো নিজে শাসন করতে পারব।
হ্যাঁ। নিজেই শাসন করো। ভয় তাড়াও। বনের বাঘ তাড়াবে ফারুক। ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে।
কী বলেছেন?
আমাদেরকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলেছে। সন্ত্রাসীরা বুঝে গেছে আসল বাঘের খাঁচায় হাত দিয়েছে তারা।
কীভাবে বুঝল?
ফারুক চাউর করে দিয়েছে তুমি তার আত্মীয়। অ্যাডিশনাল পুলিশ কমিশনারের আত্মীয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে না সন্ত্রাসীরা। ঘাঁটাঘাঁটি করলেই ধরা পড়বে।
ছবিগুলো? এগুলো কি উদ্ধার করা যায় না? ছবি নিয়ে ভাবার কিছু নেই? রিয়ার প্রশ্নে আতঙ্ক।
না। নেই। রেজার স্ট্রং জবাব। বাইরে জবাব শক্ত হলেও ভেতরের শঙ্কা একদম মিলিয়ে গেল না। অদৃশ্য ভয় থেকেই গেল।

হঠাৎ থেমে গেল ওদের আলাপচারিতা।
রাহেলা চৌধুরি, রিয়ার মা সামনে এসে দাঁড়ালেন।
রেজার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রেজাকে নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশি আপন মনে হয় তাঁর।
এ মুহূর্তে ‘আপন’ শব্দটা হোঁচট খায়। রিয়াকে একাকী রেজার সঙ্গে কথা বলতে দেখে গোপনে সনাতন মাতৃমন চমকে ওঠে। ভীত হয়। চট করে তিনি প্রশ্ন করে বসেন, একা এসেছেন? মুনা আসেনি?
রেজা বিগলিত স্বরে বলল, মুনা একটা জরুরি কাজে বনানী গেছে। একা এসেছি আমি।
ওহ! বসুন। আপনারা কথা বলুন। আমি চা পাঠাচ্ছি।

রাহেলা চৌধুরি হঠাৎ করে ঘুরে দাঁড়ালেন।
রিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। মায়ের এ ভঙ্গিটা ভালো ঠেকেনি। মায়ের এ অভিব্যক্তি চেনে রিয়া। গলার স্বরও চেনা। রেজা মামার একা আসা পছন্দ করেননি মা। অপছন্দ তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। চেপে রাখতে চেষ্টা করেছেন। রিয়ার চোখে এড়ায়নি চাপা দেওয়া মায়ের মনের খবর।

রেজা কিছুই বুঝতে পারেনি।
রিয়া বুঝেও না-বোঝার ভান করে। ওর চোখের ভাষায় মায়ের ওপর একদম রাগ ফুটে ওঠেনি। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এল দক্ষতার সঙ্গে। মামাকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না, মনে মনে ঠিক করে ফেলল।

রেজা উঠে দাঁড়ায়।
বসার ঘরের ডান পাশে আছে একচিলতে বারান্দা। খোলা দরজা দিয়ে বারান্দার দিকে চোখ গেল তারা সেখানে আছে ওল্ড উড পলিশের রট আয়রনের দুটি চেয়ার, পাশাপাশি চেয়ার দুটির সামনে আছে ছোট্ট একটা টি-টেবিল।

ধীরপায়ে হেঁটে সে বারান্দায় এল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় ধানমন্ডি লেকের অংশ। লেকের দুপাড়ে সরু রাস্তা। পায়ে হাঁটা পথ। পথের পাশে সারি সারি অসংখ্য গাছ। গাছের ছায়া পানিতে শুয়ে আছে। ছায়া নড়ে। ছোট ছোট ঢেউ বয়ে যায় পানিতে। ঢেউয়ের সঙ্গে হেলেদুলে চলে গাছের ছায়া। দীঘল কালো জলের অপূর্ব দৃশ্য মন ভরিয়ে দিল রেজার।

রট আয়রনের একটা চেয়ারে বসল ও।
রিয়াকে বলল, বসো এখানে। দারুণ লাগছে। তোমাদের বাসার এ লোকেশনটা অসাধারণ, সুন্দর!
রিয়া মনে মনে শঙ্কিত হয়ে গেল। মামার আনন্দে একাত্ম হতে না পারলেও শঙ্কা গোপন রেখে বসল পাশে। মামণি এখানে এভাবে বসা পছন্দ করবে না, জানে রিয়া। তবু না-বসে পারল না। রিয়াকে ভদ্রতা বজায় রাখতে হচ্ছে। দেখা যাক, কী আচরণ করে মামা। মনে মনে ভাবে, মামণিকে পরে বোঝানো যাবে।

বারান্দার দেয়ালজুড়ে আছে সবুজের মনোক্রম। দেয়ালের সবুজ আর প্রকৃতির সবুজ মিলেমিশে একাকার।
রেজা তাকিয়ে আছে সামনে। সামনের সৌন্দর্যে মোহিত তার মন। বিমুগ্ধতায় ডুবে আছে ও। রিয়ার মুখের দিকে একবারও তাকায়নি। তাকালে হয়তো বুঝত, রিয়া আর রিয়াতে নেই। রিয়ার মনে ভর করেছে মায়ের প্রতিক্রিয়া। এই প্রতিক্রিয়া পেছন থেকে টেনে রেখেছে আসল রিয়াকে।

নাশতার ট্রলি সাজিয়ে দিয়েছেন রাহেলা চৌধুরি।
ট্রলি নিয়ে এল কাজের বুয়া শেফালি। নির্দেশমতো এগিয়ে গেল ও বসার ঘরে। পেছনে আসেন রাহেলা চৌধুরি।
শেফালি দেখল বসার ঘর খালি। বারান্দা থেকে কথোপকথন শুনতে পেল ও। দ্বিরুক্তি না করে ট্রলি নিয়ে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। ট্রলি থেকে খাবার সাজিয়ে দিল টি-টেবিলে।
ট্রলি পাশে রেখে খালি হাতে ফিরে আসে শেফালি।
বসার ঘরে ফিরে এসে দেখে রাহেলা চৌধুরি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
একবার শেফালি তাকাল আপার দিকে। রাহেলাকে আপা বলে ডাকে সে। তাকিয়েই ফিরে গেল কিচেনে।
রাহেলা চৌধুরি বারান্দায় এগোলেন না। ফিরে এলেন নিজের ঘরে। ঘরে এককোনায় আছে দোলানো বেতের চেয়ার। চেয়ারে আছে স্ট্রাইপ্ড ব্লেন্ডেড মেটারিয়ালের কুশন। চেয়ারে চুপচাপ বসে রইলেন তিনি।

হঠাৎ শেফালি এল সামনে।
আপা, এইভাবে বাইরের পুরুষের লগে রিয়া আম্মারে একলা ছাইড়া দেওন ঠিক না।
রাহেলা চৌধুরি চোখ তুলে তাকালেন।
কোনো জবাব দিলেন না শেফালির কথার।
শেফালি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এল আবার কিচেনে। স্বামী নেই তার। সন্তান নেই। স্বামী রিকশা চালাত, রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।
এ বাসায় তার আদর-মমতার অভাব নেই। তবে নিজে অন্যের সুখ সইতে পারে না। অন্যের সুখ দেখলে গোপনে ঈর্ষা কাজ করে। অন্যের মনে বিষের আগুন ছড়িয়ে আনন্দ পায়, এ বিকৃত আনন্দের খবর সে নিজেও জানে না। এমন একটা ভাব তার মধ্যে কাজ করে, সে পরিবারের ভালো চায়। ভালোর জন্যই সব করে।

এ মুহূর্তে রাহেলা চৌধুরিকে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। জানে ও। জেনেও বলেছে। আপার মনে বিষ ঢেলে দেওয়ার জন্যই বলেছে। ছোট লোক বড় লোক বলে কিছু নেই। সুযোগ পেলে এভাবে মানুষ মানুষের মনে বিষ ঢেলে দিতে পারে, জানে না ও।
রাহেলা চৌধুরি চোখ বোজেন।
চোখ বুজে বেতের রকিংচেয়ারে দুলতে থাকেন। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে নিজের টিনএজ বয়সের একটা অধ্যায় :
এসএসসি পাস করে বেড়াতে এসেছে ঢাকায়। একমাত্র খালার বাসায় উঠেছে রাহেলা। মা আসেননি সঙ্গে। বাবা এসেছেন।
দুদিন থেকে বাবা চলে গেছেন।
খালা তাকে নিয়ে ঘোরেন। হইচই করে বেড়ান। খালুও আছে সঙ্গে। খালাতো বোন নূপুর সমবয়সী। বাসায় মন টিকে যায় তার। তুমুল আড্ডায় বদলে যায় দিন।

ঠিক হয় গাজীপুর নয়, ঢাকাতেই এইচএসসি পড়বে ও। ভর্তি হয়ে গেল বাসার পাশে একটা কলেজে।
খালার বাসায় থাকে। খালার বাসা আর নিজের বাসার পার্থক্য নেই। মা মাঝে মাঝে আসেন। কয়েকদিন থেকে যান।
খালু অন্যরকম আদর করেন। খালুর সঙ্গ ভালো লাগে।
খালুর স্বভাব হচ্ছে রাত জেগে বিভিন্ন ধরনের বই পড়া। রিডিংরুমে একা একা বই পড়েন। লেখালেখিও করেন খালু। রাহেলার বই পড়ার শখ। যেদিন কলেজ বন্ধ থাকে তার আগের রাতে প্রায়ই খালুর পড়ার ঘরে ঢোকে সে। গল্প করে, করতে করতে রাত পেরিয়ে যায়। বই পড়া হয় না।

অসাধারণ ব্যক্তিত্ব খালুর। সুন্দর কথা বলেন। সুদর্শন খালুর গল্প মন্ত্রমুগ্ধের মতো টানে রাহেলাকে।
খালু রাহেলাকে দেখেন। রাহেলার উঠতি দেহের প্রতি চোখ যায়। নির্লিপ্ত নির্লজ্জ ভাষায় দেহের বর্ণনা দেয়। রূপের বর্ণনা দেয়।
খালুর ওই মুহূর্তের নির্লোভ নির্মোহ শব্দব্যঞ্জনায় চমকে চমকে কেঁপে কেঁপে ওঠে দেহের পাপড়ি, তারুণ্যের পাপড়ি। প্রথমে লজ্জায় চুপসে যেত ও। পরে স্বাভাবিক হতে থাকে, অনেক অজানা বিষয়ে আলাপ শুরু হয়। খালুই তাকে কৌশলে প্ররোচিত করেছে। যৌন কথার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যৌন সংলাপে অভ্যস্ত করে নিয়েছে। নেশায় মাতিয়ে বেপরোয়া করে তোলে খালু। খুব ধীরে। তাড়াহুড়ো ছিল না তার। ধীরপায়ে এগিয়ে ছিলেন তিনি।
অনভিজ্ঞ রাহেলা কিছুই বোঝেনি।

চলবে...

এসইউ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]