মায়াবতী: পর্ব ২৫

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৫:৩২ পিএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি—

তেইশ.
‘আর একটি মুখও যেন অ্যাসিডে ঝলসে না যায়। অ্যাসিড-সন্ত্রাস রোধে জনমত গড়ে তুলুন। আপনি এগিয়ে আসুন। পাশের জনকেও বলুন।’ পত্রিকায় প্রকাশিত অ্যাসিড-সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের ডাক মনোযোগ দিয়ে পড়ল রিয়া।
কল্পনার চোখে দেখার চেষ্টা করল অ্যাসিড ছুড়ে মারার সহিংস দৃশ্য। ভয়ে সেঁটে যায় ও। কারা অ্যাসিড ছোড়ে? কেন ছোড়ে? মায়াবী মুখ কেন পুড়িয়ে দিতে চায় অমানুষের দল?
অ্যাসিডে পুড়ে যায় মুখ। বাইরে থেকে পোড়া ক্ষত দেখা যায়। এই বিকৃত উল্লাসে সন্ত্রাসীদের কী লাভ?
জানে না রিয়া।

নিজের জীবনে ডুব দিলো এবার। মনে হলো অ্যাসিড-সন্ত্রাসীদের চেয়েও বড় সন্ত্রাসী গোপনে সন্ত্রাস করে বেড়ায়। কেউ পরিকল্পনা করে চালায়, কেউ অবচেতনে চালায় গোপন উল্লাস। গোপনে ঝলসে দেয় নরম মন। না বুঝে কেউ কেউ কচিমনে বসিয়ে দেয় দগদগে ঘা। অ্যাসিডের ক্ষতের চেয়েও বিকৃত সে ক্ষত।
ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডাম কি ওই দলে না?
আহসান স্যারের গোপন চাল?
কুসুমকলির মায়ের আচরণ?
অথবা আত্মীয়স্বজন, পরিচিতজনদের আচরণ?
কথার অ্যাসিডে পুড়ে যেতে পারে মন। ওরা কি বোঝে না? ওরা কি ইচ্ছাকৃতভাবে চালায় গোপন সন্ত্রাস?
রিয়ার মন বদলে যায়। বদলে যেতে থাকে। নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়। পুরোপুরি গুটাতে পারে না। তার মনে হতে থাকে ও এক জিন্দা লাশ হয়ে যাচ্ছে।
জিন্দা থাকতে হবে। লাশ হওয়া চলবে না। পুড়ে যাওয়া চলবে না। ভাবে ও।
পড়তে হবে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ‘ভুলের শিক্ষা’ দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। গোপন আলো ছড়াতে থাকে মনে, মন তবু ভালো হচ্ছে না।

প্রথম আলোর নারীমঞ্চ পাতায় একটা শিরোনামের দিকে চোখ বসে গেল―মরেও লাশ হয় না ওরা। মৃত্যুর পর যৌনকর্মীদের লাশ কোনো সামাজিক গোরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয় না, কোনো খোলা জায়গায় পুঁতে ফেলা হয় মৃতদেহ। মাটি আলগা থাকলে মাটি উপড়িয়ে লাশ ছিঁড়েখুঁড়ে খায় শেয়াল-শকুনে। বেঁচে থাকতে শেয়াল-শকুনসদৃশ মানুষের নখ-দন্তে রক্তাক্ত হয় যৌনকর্মীরা, মরার পরও জন্তুর থাবা।
কে জানে কোনটা বেশি নির্মম।
নির্মমতার দলিল ছোট না। অনেক লম্বা। লম্বা দলিলের শেষ কোথায়? কেবলই কি যৌনকর্মীদের জীবনে চলছে এমন নির্মমতা?
না। উত্তর খুঁজে পায় রিয়া।
উঠতিবয়সি অধিকাংশ মেয়ে পুরুষের নখ এবং দন্তের উল্লাসের শিকার হয়।
ওদের উল্লাস কীভাবে থামানো যায়? কীভাবে পরাজয় রোধ করবে নারী, শিশু, কিশোরী, তরুণী? কোথায় পাবে তারা গাইডলাইন?
সহস্র প্রশ্ন আসছে মনে। প্রশ্নের ঝড় থামাতে চেষ্টা করে ও। ফোন হাতে নিয়ে কল করল যেবু আপাকে।
মোবাইল ক্যান নট বি রিচড।
ঘড়ির দিকে তাকাল রিয়া। সকাল প্রায় দশটা। আপা নিশ্চয়ই এখন ক্লাসে। ক্লাসে থাকলে মোবাইল ফোন অফ রাখেন তিনি।

পত্রিকা গুছিয়ে মামণির ঘরে ঢোকে রিয়া।
মামণি ঘরে নেই।
উঁকি দেয় ও বারান্দায়। বারান্দায়ও নেই।
কিচেনে আসে। না সেখানেও নেই।
বুয়া, মামণি কোথায়?
পাশের বাসায় গেছে। বলল শেফালি।
কেন, পাশের বাসায় গেছে কেন?
জানি না, আম্মা।
বুয়ার আম্মা ডাক ভালো লাগে। কখনো এই ভালোলাগার কথা জানায়নি রিয়া।
রিয়া আন্তরিক স্বরে বলল, তোমার মেয়ে কোথায় থাকে?
গেরামের বাড়িতে। আমার মার কাছে থাহে।
ভালো আছে? খবর রাখো?
হঁ। এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিবো।
গুড। ভেরি গুড। ওর জন্য আমার ভালো ভালো কয়েকটা নতুন ড্রেস পাঠিয়ে দিয়ো। মামণিকে বলে দেব আমি।
শেফালি খুশি হয়। কী করবে সে? বুঝতে পারে না।
গ্যাসের চুলা অন করে শেফালি। দুধ গরম করে। খুশি হয়ে এক গ্লাস দুধ নিয়ে হাজির হয়।
রিয়ার হাতে দেয়। নেন আম্মা। দুধ খান।
রিয়া চোখ তুলে তাকাল শেফালির দিকে। শেফালির চোখে দেখতে পেল মাতৃস্নেহ। স্নেহের দাবি নিয়ে সে সামনে এসেছে। নিজের মেয়ের কথা মনে পড়েছে তার।
এই দাবি ফেরানো যায় না।
রিয়া বলল, গ্লাস রাখো।
অন্য সময় হলে ধমক দিত। আজ ধমক দিলো না।

শেফালি চলে যাওয়ার পর চুমুকে চুমুকে শেষ করল পুরো গ্লাস। তারপর টিস্যু পেপার দিয়ে ঠোঁট মুছে নেয় রিয়া।
এবার এসে বসল টেবিলে। যেবু আপার দেওয়া হোম টাস্ক হাতে নিয়ে। মনোযোগ দিলো পড়ায়।
হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে ওঠে।
আননোন নম্বর!
চমকে ওঠে রিয়া। অনেকক্ষণ রিং বেজে থেমে গেছে।
সেই নম্বর থেকে কল এসেছে! অর্থাৎ পিছু ছাড়েনি সন্ত্রাসী দল। কল নম্বর আর কলটাইম নোট করে নিলো। ডায়েরিতে লিখে রাখল রিয়া।
মনে আবার ঢিল পড়েছে। আবার শীতলমনে আলোড়ন উঠেছে। পদে-পদে আলোড়ন হানা দেয়। পড়ায় বিঘ্ন ঘটে।
বুঝল পড়ার ব্যাপারে ছাড় দেওয়া চলবে না। পড়ার টেবিলে সেঁটে থাকতে হবে। সামনে পরীক্ষা। মোবাইল ফোন অফ করে দেয় ও। যেবু আপার কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছেন, পড়ার সময় মোবাইল ফোন অফ রাখতে। ঘুমের সময়ও মোবাইল বন্ধ রাখতে হবে। ব্রেনের রেস্ট প্রয়োজন। রাতে ঘুমের সময় মোবাইল অন থাকলে অবচেতন মনে গোপন অপেক্ষা থাকে। কারোর ফোনের অপেক্ষায় থাকলে রেস্ট হবে না ব্রেনের। বলেছিলেন যেবু আপা। ভুলে গিয়েছিল পড়তে বসে। আর ভুল হবে না। এখনকার মতো ভুল শুধরে নেয় রিয়া।
উদাস চোখে সামনে তাকাল ও। সামনে টেবিল-শেলফ―টেবিলের ওপরের দিকে তিনটা তাক। থরে-থরে সাজানো আছে পড়ার বই। খাতা। নিজের জগৎ মনে হয় ছোট হয়ে আসছে। পড়ার ঘরে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী অনেক বড়। আবার বলা যায় মুঠোফোনের কারণে তা অনেক ছোট। আমেরিকা থেকে মুহূর্তে কথা চলে আসে বাংলাদেশে।
রিয়ার জগতের বিস্তৃতি ছোট হচ্ছে। চারপাশের মানুষের কথার খোঁচায় গুটিয়ে যাচ্ছে ও। মনের পরিসর কমে যাচ্ছে। নিজের মন নিজের কাছে প্যারালাইজড ঠেকছে।
প্যারালাইজড রোগীর ব্রেন সক্রিয় রাখার জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে ব্রেনচিপ। ব্রেনচিপে ইলেকট্রিক্যাল অ্যাকটিভিটিস সিস্টেম যোগ করা হয়েছে। সিগন্যাল রেকর্ড করে ব্রেনচিপ স্নায়ুকোষ সচল রাখবে। প্যারালাইজড রোগীরা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
রিয়ার তো ব্রেন সচল আছে। কোনো কোনো বিষয়ে বেশি সচল। মস্তিষ্ক সচল হলেও মাঝে মাঝে মন অচল হয়ে যাচ্ছে। অচল মন চালাতে দরকার মনচিপ। কে উদ্ভাবন করবে মন সচল রাখার চিপ? সাইবার কাইনেটিক চিপের সঙ্গে মনের সংযোগ দিতে হবে। কে দেবে সংযোগ? মনের কোন বিজ্ঞানী এগিয়ে আসবেন, জানে না রিয়া।
নিজেকে নিজে চালাতে হবে। এই বোধে নড়ে ওঠে মন। নড়ে ওঠে রিয়ার আইকিউ বক্স বুদ্ধির বিকল্প নেই। চিন্তা খাটাতে হবে ঠিক পথে। ভুল আর করা যাবে না। আবেগের দুরন্ত ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে হবে। ভাবতে গিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী দৃঢ়চেতা রিয়া জেগে ওঠে। আবারও পড়ায় মন বসায়। পড়তে থাকে। পরীক্ষা এখন সুপ্রিম প্রায়োরিটি। পড়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই, আর কোনো ভাবনা নেই। দুর্ভাবনার জাল থেকে বেরিয়ে এলো রিয়া। পড়ছে ও। মনোযোগ পুরোপুরি এখন বইয়ের পাতায়।

ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে যেবু আপা সাধারণত রিয়ার বাসায় আসেন। ঘণ্টাখানেক পড়িয়ে ভার্সিটিতে ঢোকেন। আজ সকালে আসেননি। টেলিফোনে জানিয়েছিলেন বিকেলে আসবেন। বিকেল পাঁচটায় আসার কথা। এখনো পৌঁছাননি।
চিন্তা হচ্ছে। কল করেছিল রিয়া। মোবাইল ফোন অফ আছে। রিয়া কিছুটা অস্থির। অস্থিরতা নিয়ে বারবার নিজ ঘরের ব্যালকনিতে ঢুকছে। নারকেলগাছের দু-একটা পাতা ছিঁড়ে আবার ফিরে আসছে ঘরে।
একসময় ডোরবেল বেজে ওঠে। ছুটে গেল রিয়া। দরজা খুলে দেখে যেবু আপা দাঁড়িয়ে আছেন। স্বস্তি ফিরে এলো মনে। কিন্তু যেবু আপার মুখের দিকে তাকিয়ে স্বস্তি পালিয়ে গেল।
যেবু আপার মুখের মলিন অবস্থা বলে দিচ্ছে মন খারাপ তার।
রিয়া হাত ধরে আপাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। টেবিলে বসে রিয়ার বইখাতা টেনে নেন তিনি।
রিয়া বলল, আপা আপনার মন খারাপ। কেন খারাপ জানতে চাইছি না। দেরি হলো কেন সেটা জানতে ইচ্ছা হচ্ছে।
যেবু জবাব দিলো না। স্থিরতা নিয়ে বলল, এখন পড়। পড়ার সময় নষ্ট করে গল্প করা ঠিক না। তোমার প্রশ্নের জবাব পরে দেবো।
রিয়ার মন খারাপ হলো না। উত্তর না পেয়েও চোট পেল না মনে। এত অল্পে মনে চোট নেওয়া উচিত না। ইতোমধ্যে বুঝে গেছে, জীবনের ছোটো-বড়ো পোড়-খাওয়া অনেক অভিজ্ঞতা পেয়ে গেছে ও। তাই অল্পে ভেঙে যায় না। বরং বেশি সতর্ক হয়ে ওঠে, মনে মনে ভাবতে থাকে পড়তে হবে। মন ভেঙে গেলে পড়ব কীভাবে।

একঘণ্টা পর শেফালি টেবিলে নাশতা রেখে গেছে।
পানি পান করতে করতে যেবু বলল, তোমার যেন কী প্রশ্ন ছিল?
জানতে চেয়েছিলাম দেরি হলো কেন?
যেবু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, কালো মেয়েদের অনেক ঝামেলা। অনেক কষ্ট।
রিয়া তাৎক্ষণিক জবাব দিলো, আপা আপনি তো কালো না। শ্যামলা, অনেক বেশি স্মার্ট, অ্যাট্রাকটিভ। মায়াবী।
হাসলেন যেবু। হ্যাঁ। তোমার মতো অনেকে এ কথা বলে। আই ফিল প্রাউড অব দিস, কমেন্ট। কিন্তু আমি আমার কথা বলছি না, বলছি আমার বান্ধবী পুনমের কথা। একটা সমস্যা হয়েছে। সমস্যা সামাল দিতে ওর সঙ্গে ছিলাম, এক জায়গায় গিয়েছিলাম। তাই আসতে দেরি হয়েছে। পুনম দেখতে কালো।
কালো? রিয়া আবারও প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ। গায়ের রং কালো। কিন্তু পুনম অসম্ভব মায়াবতী। অসাধারণ গুণী। ফিগারও আকর্ষণীয়।
ওনার কী সমস্যা হলো, আপা?
সব তোমাকে বলা ঠিক না। তবুও বলে রাখা ভালো। যে কোনো খারাপ ঘটনা বিশ্লেষণ করে অনেক অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। ঘটনা কেবল নিজের জীবনে ঘটবে, এমন না। অন্যের অভিজ্ঞতাও নিজ জীবনের ভালোর জন্য কাজে লাগাতে হবে।
বলুন আপা, শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে।
যেবু বলল, একটা ছেলের সঙ্গে অ্যাফেয়ার ছিল ওর। ছেলেটা হ্যান্ডসাম। লম্বা। প্রাণভরে ভালোবাসত সে, ছেলেটা যা বলেছে সব অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছে।
তো? যাকে ভালোবাসে তাকে বিশ্বাস করবে না? এ কেমন কথা, আপা?
বিশ্বাস করবে। বিশ্বাসই তো ভালোবাসার প্রাণরসায়ন। বিশ্বাস না থাকলে তো ভালোবাসাও থাকবে না।
তাহলে বলুন আপা, আপনার বান্ধবীর দোষ কী?
দোষ সে করেনি। দোষ করেছে ছেলেটা।
কী দোষ, আপা?
সেই ছেলে তাকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে। আমার বান্ধবীও চেয়েছে তাকে আঁকড়ে থাকতে। আঁকড়ে থাকার জন্য সর্বস্ব তাকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে।
ওহ! থেমে গেল রিয়ার প্রশ্ন। চুপ হয়ে গেল ও। অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ও আর কথা বলতে পারছে না।
যেবু নিজ থেকে বলতে থাকেন, এখন সে-ই ছেলেই বলছে পুনমের চরিত্র ভালো না। এজন্য তাকে বিয়ে করতে পারবে না।
বলেন কী, আপা!
ঠিকই বলছি, নিজেই তাকে দৈহিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করেছে। ব্যবহার করে বলছে চরিত্র ভালো না। আর বিয়ের জন্য সে এখন চরিত্রবতী মেয়ে খুঁজছে। রূপবতী মেয়ে খুঁজছে। এ কথা সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে পুনমকে।
সরাসরি ‘না’ করে দিয়েছে?
হ্যাঁ। সরাসরি ‘না’ করে দিয়েছে।
এখন পুনম আপার অবস্থা কী?
ওর অবস্থা খুব খারাপ। কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
কেন, একজন ফ্রডের জন্য আত্মহত্যা করবে কেন?
ঠিকই বলেছ তুমি। এজন্যই তো ওকে বুঝিয়েছি। শুধু বুঝাইনি। শেষ চেষ্টা করার জন্য পুনমসহ আজ ওই ছেলের বাসায় গিয়েছিলাম। শেষ চেষ্টা করে এসেছি। তাকে কনভিন্স করতে পারিনি। অথচ ওদের অনেক ঘটনার সাক্ষী আমি।
এখন কী হবে, আপা?
কী আর হবে। মেনে নিতে হবে। পুনম মানতে পারছে না।
আপনি তাকে বোঝান। ছেলেটার মনে তো ভালোবাসা নেই। সে যা পেতে চেয়েছে, পেয়েছে। পেয়ে সরে দাঁড়িয়েছে। এটাই ছেলে চরিত্রের একটা বড় দিক।
রিয়ার কথায় বয়সের তুলনায় তাকে বেশ ম্যাচিউর মনে হলো যেবুর। খুশি হলো বিশ্লেষণ শুনে। তবু বললেন, পুনমকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছি। কারণ সে মনে করে নারীত্বের সব হারিয়েছে, নষ্ট হয়ে গেছে সে।
নষ্ট হওয়ার কী আছে, আপা? উনি কি ডিম না দুধ যে নষ্ট হবেন?
তা তো ঠিকই। সে যা করেছে মন সঁপে করেছে। এখানে নারী-পুরুষের সম্পর্ক হয়েছে। এই সম্পর্কের কারণে নারী তো নষ্ট হতে পারে না। বোঝানো যাচ্ছে না তাকে। সে মনের দিক থেকে স্বচ্ছতা নিয়ে সব করেছে। তবু বুঝতে চাইছে না।
আপনি চেষ্টা করে যেতে থাকুন, আপা। নিশ্চয়ই আবার তাকে দাঁড়াতে হবে।
দাঁড় করাতে পারব, এ বিশ্বাস আমার আছে। তবে তার নৈতিক বল কীভাবে ফেরাব? নৈতিকভাবে মনে করছে সে স্খলিত, তার মোরাল স্ট্রেনথ শেষ হয়ে গেছে।
ওহ! আবারও থেমে গেল রিয়া। নৈতিকতার বাইরের কোনো কাজের উত্তর কী হবে জানা নেই তার।
যেবু বললেন, দেখা যাক কী হয়। সামনের সপ্তাহে তোমাকে বোধ হয় পড়াতে আসতে পারব না। তুমি একটুও ফাঁকি দিয়ো না। মন দিয়ে পড়।
জি আপা। পড়ব। আমি বুঝে গেছি ‘লাইফ ইজ নট এ বেড অব রোজেস।’ পদে-পদে কাঁটার আঘাত খেতে হবে। আঘাত খেয়ে ভেঙে পড়লে চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে।
যেবু মুগ্ধ হয়ে শোনেন রিয়ার কথা। শুনতে গিয়ে মুখে এক রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। হাসির সময় মুখের ভাঁজের ঢেউয়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে নিজের মনোজগতের গোপন কষ্টের ধারা।
এই কষ্ট পড়তে পারল রিয়া। অবাক হয়ে সে তাকাল যেবু আপার মুখের দিকে। আচমকা আগেপাছে না-ভেবে জানতে চায়, আপা, আপনার বায়োডাটা দেখেছি আমি। আপনার রেজাল্ট এক্সিলেন্ট। ফ্যামিলিও ভালো। দেখতেও আপনি মায়াবী। আপনার বয়স এখন সাতাশ। যদিও দেখতে মনে হয় তেইশ। এখনো বিয়ে করেননি কেন?
ছাত্রীর কাছে ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা না-বলাই ভালো। জানে যেবু। এ মুহূর্তে রিয়ার সরাসরি প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন তিনি। রিয়ার উচিত হয়নি সরাসরি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা। উত্তর না দিলে ও নিজেকে ছোট ভাবতে পারে, সে-ও ভাবতে পারে। রিয়াকে ছোট করা যায় না। ভাবতে গিয়ে হাসলেন যেবু। হাসিমুখে বললেন, আমিও একজনকে ভালোবাসি। সে-ও বাসে। কোনো ফাঁক আছে বলে মনে হয় না। সমস্যা হচ্ছে ওদের বাসায়।
ওদের বাসায় সমস্যা মানে?
মানে ওর মা রাজি না। কোনোমতেই আমার মতো গায়ের রঙের মেয়েকে ঘরের বউ করতে চাইছেন না।
কেন আপা, মানুষ এমন হয় কেন? আপনার মতো মিষ্টি মেয়ে তো পাওয়া কঠিন।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে অপছন্দ করেন বলে জানাননি, তার ভয় বংশধরদের নিয়ে। কালো মেয়ে ঘরে এলে নাকি তার নাতনিও কালো হবে। কালো নাতনির মুখ সইতে পারবেন না তিনি। তাই অগ্রিম ব্যারিয়ার দিয়েছেন। ছেলের জন্য ফরসা মেয়ে খুঁজছেন।
আপনার বয়ফ্রেন্ড কি বিষয়টা মেনে নিয়েছে?
মেনে নিয়েছে বললে ভুল হবে। তবে সে তার মাকে খুব ভালোবাসে। মায়ের মতের বিরুদ্ধে যেতে চায় না।
মাকে ভালোবাসে। আপনাকে ভালোবাসে না?
বাসে। আমাকেও ভালোবাসে। তবে মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে তো অন্য কোনো ভালোবাসার তুলনা চলে না, তাই না?
তাই বলে মায়ের কথায় রাজি হয়ে যাবে? কী বলেন, আপা?
রাজি-অরাজির প্রশ্ন না। বুঝতে হবে যে ছেলে মাকে ভালোবাসে, মায়ের অবাধ্য হয় না, সে তো শ্রেষ্ঠ সন্তান। আমিও কখনো মা হলে চাইব আমার সন্তান আমাকেই বেশি ভালোবাসুক, চাইব না?
তা চাইবেন। ঠিক আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তো মেলাতে পারছি না আমি। উনি যদি মায়ের কথা শুনে অন্য কাউকে বিয়ে করে বসেন?
মনে হয় না এমন কাজ করবে, সে চেষ্টা করছে মাকে রাজি করাতে।
রাজি হলেও তো আপনার প্রতি তার মায়ের মনে গোপন বিদ্বেষ কাজ করবে। আপনার খুঁত ধরে বেড়াবে। আপনি তো শ্বশুরবাড়িতে সুখ পাবেন না।
সুখ-অসুখ আপেক্ষিক ব্যাপার। যা কপালে আছে, তাই ঘটবে। তবে আমি চেষ্টা করব শাশুড়ির মন জয় করতে।
কঠিন কাজ আপা। ‘মনোসমস্যা মনোবিশ্লেষণ’ বইতে পড়েছিলাম, বউ ঘরে এলে গোপনে শাশুড়িরা জেলাস হয়ে যায়। ভাবে, ছেলেকে দখল করে ফেলেছে মেয়েটা। বউয়ের জন্য অন্তরে ভালোবাসা থাকলেও ক্রোধ তৈরি হয় অবচেতন মনে। সেই ক্রোধই সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বউকে মানতে পারে না। বউয়ের খুঁত ধরতে থাকে।
সেটা তো সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাকে বরং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে। এই আর কি।
আপা, ইউ আর গ্রেট।
যেবু হেসে রিয়ার মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখে বললেন, ইউ উইল বি এ গ্রেট ইন ফিউচার ডেসটিনি।

রিয়া কল্পনার চোখে দেখে এনগেজমেন্টের পরও বিয়ে ভেঙে যায়, বিয়ের আসর থেকেও বর উঠে চলে যায়, যৌতুকের অভাবেও অনেক মেয়ের বিয়ে টেকে না, হবু শাশুড়ির কারণেও বিয়ে হয় না, এমন মেয়েদের মনও অ্যাসিডে ঝলসানো মুখের মতো দগদগে ক্ষত বয়ে বেড়ায়, আমরা আর কয়জনেরই বা খোঁজ রাখি।
রিয়া মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে এ ধরনের অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে ও। দাঁড়ানোর প্রথম শর্ত হচ্ছে নিজেকে দাঁড় করানো। নিজেকে দাঁড় করাতে হলে বর্তমান মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হবে। পড়তে হবে। পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
যেবু আপা চলে যাওয়ার পরও ও ফিরে এসে আবার বসল পড়ার টেবিলে। টেবিলটি ডান হাতে ছুঁয়ে মনে মনে বলল ‘ইউ আর নাউ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। আই ওয়ান্ট টু ইউটিলাইজ ইউ।’
রিয়া যেন পেয়ে গেছে নতুন টেকনোলজির নতুন অ্যাসেট ‘মনচিপ’। বই এবং টেবিলই এখন ‘মনচিপ’। এই চিপই মনের সংযোগ ঘটাবে সাইবার কানেকটিক চিপের সঙ্গে। ভাবার সময় মস্তিষ্কে দুর্দান্ত এক শক্তি এসে আসন গেড়ে বসে। এই সংযোগ আর কখনোই পরাজিত হতে দেবে না রিয়াকে।

চলবে...

এসইউ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]m