মায়াবতী: পর্ব ২৩

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০১:১৮ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি—

একুশ.
মুনা বসে আছে পড়ার টেবিলের পাশে।
ঘর গোছানো নেই। টেবিলে অগোছালো পড়ে আছে আজকের দৈনিক পত্রিকা।
পত্রিকাটা সরিয়ে বই টেনে নিয়ে পড়ায় মন বসানোর চেষ্টা করে ও। মন বসছে না। মনোযোগ না এলে পড়া এগোয় না। মাথায় ঢোকে না কিছু। বিরক্তি লাগে। বিরক্ত মন পড়ায় ধরে রাখা বেশ দুঃসাধ্য ব্যাপার।

এমনই একটি বিরক্তির সময় মুনার মা মাহবুবা আখতার সামনে এসে বললেন, কিরে মুনা, ঘর এত অগোছালো কেন। ওহ! পড়ছ, মা?
দেখছ না, পড়ছি তো।
পড়া কেমন এগোচ্ছে?
একদম ভালো না।
ভালো না মানে?
মানে, এ মুহূর্তে মন বসছে না।
বসাও। মন বসাতে চেষ্টা করো।
জোর করলে মন আরও বেশি অস্থির হয়। বইয়ের পাতা থেকে পালিয়ে যায়।
মাহবুবা আখতার মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললেন, টিচারের বাসায় যাচ্ছ না?
যাচ্ছি। তবে বায়োলজি টিচারের বাসায় যাচ্ছি না।
কেন?
যেতে ভালো লাগে না।
উনি ভালো পড়ান না?
পড়ান। তবু যেতে ইচ্ছা করে না।
এখন তো আগ্রহ বাড়ার কথা। পরীক্ষা এসে যাচ্ছে।
হ্যাঁ। এসে যাচ্ছে।
হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে কি চলবে?
না। বসে নেই মামণি। তুমি ভেবো না। রেজাল্ট আমার ভালো হবে।
মাহবুবা আখতার জানেন, মেয়ে মেধাবী। রেজাল্ট খারাপ করবে, ভাবতেই পারেন না তিনি। তবু পড়ালেখার বিষয় নিয়ে ইদানীং শঙ্কিত সবার মা-বাবা।

এবারের এইচএসসি পাস করা মেধাবী স্টুডেন্টরা শঙ্কিত। সরকারি মেডিক্যালে ভর্তি প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উত্তীর্ণরা ভর্তি হতে পারছে না। অনুত্তীর্ণরা রিট করেছে। ভর্তি স্থগিত করা হয়েছে ছয় সপ্তাহের জন্য। অসাধারণ মেধাবীরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চান্স পায়নি। তারা ঢাকার বাইরের মেডিক্যালে ছিটকে পড়েছে। মেধাবী প্রজন্ম হতবাক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। ভর্তি চলাকালীন পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেছে। কোথায় দাঁড়াবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা? কারা এই সর্বনাশা কাজে জড়িত? জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য কাদের লোভ সক্রিয়? ধরতে হবে দোষীদের। কেবল সাজা না। ফাঁসি দিতে হবে ওদের। ফাঁসির কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। ভাবতে ভাবতে মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন মাহবুবা আখতার।
মেধাবীরা যোগ্য স্থান পাবে তো?
যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের সুযোগ নিশ্চিত হবে তো?
মেয়ে কেবলই মেধাবী না। অসাধারণ রূপবতী। অসাধারণ গুণবতী, চঞ্চল প্রকৃতির হলেও অসাধারণ গুণবতী মুনার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত তার মন।
সবার নজর পড়েছে মুনার দিকে।
প্রতিদিন বিয়ের প্রস্তাব আসছে। ভালো ভালো প্রস্তাব আসছে।
প্রস্তাবগুলো তারা ফিরিয়ে দিচ্ছেন কৌশলে।
সরাসরি না বলছেন না। মেয়ের একাডেমিক ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগে বিয়ের প্রশ্নই আসে না।
মাহবুবা আখতার নিজে মাস্টার্স করেছেন।
তার মেয়েও সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেবে, এটাই চান তিনি। বিয়ের প্রস্তাবের তোড়ে মাঝেমধ্যে দিশেহারা হয়ে যান।
মুনা বলল, মামণি, তুমি যাও। আমি একটু বাইরে যাব। দেখি হাতের কাজগুলো গুছিয়ে নিই।
কোথায় যাবে?
ফিজিক্স স্যারের বাসায় যাব। উনি যেতে বলেছেন।
বায়োলজি পড়া কি বাদ দেবে?
না। বায়োলজিও পড়তে হবে। অন্য টিচার খুঁজছি।
মা একটু শঙ্কিত হলেন। পরীক্ষার আগে টিচার বদলানো ঠিক না। মুখ ফুটে বললেন না। মেয়ের ইচ্ছায় হাত দিতে চান না।
তবু বললেন, অন্য টিচার কি খুব জরুরি? পরীক্ষার বেশি দেরি নেই, এ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কি উচিত হচ্ছে?
মায়ের প্রশ্ন শুনে চোখ তুলে তাকাল মুনা। জবাব দিলো না। চোখের মধ্যে ভিন্ন ইমেজ ভেসে উঠল। কয়েকদিন আগের একটা দৃশ্য তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাকে:
সেদিন ছিল ছুটির দিন।
আহসান স্যার তাকে টেলিফোনে বললেন, মুনা চলে এসো তুমি।
কোথায়, স্যার?
আমার বাসায় এসো। তোমার নোটগুলো গুছিয়ে দেবো। সেদিন সবার ভিড়ে তোমার স্পেশাল কেয়ার নিতে পারিনি। এসো।
মুনা বলল, আসছি স্যার।
বাসায় ব্যস্ত ছিল মুনা। গেস্ট এসেছিল। গেস্ট রেখে দ্রুত রেডি হয়ে নেয় ও। আহসান স্যার খুব ভালো। কলেজে অধ্যাপনা করান। সুনাম তার চারদিকে। তার ছাত্ররা বায়োলজিতে অসাধারণ রেজাল্ট করে। এজন্য স্যারের কাছে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় মুনা। স্যার খুব ব্যস্ত থাকেন। ব্যস্ত স্যারের স্পেশাল কেয়ারের কথা শুনে মেধাবী ছাত্রী মুনার মন চাঙা হয়ে ওঠে।
দ্রুত হাজির হয় সে আহসান স্যারের কলাবাগানের বাসায়।

বাসায় ঢুকে অবাক হলো মুনা।
আজ যে কোনো ছাত্র নেই বাসায়? একদম খালি বাসা। মুনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় টলে ওঠে। তবুও সহজ ভঙ্গিমায় স্যারের সামনে গিয়ে বসে ও। স্বতঃস্ফূর্ততা বজায় রইল মুনার কথায়, আচরণে একদম জড়তা নাই।
আহসান স্যার শেভ করেছেন। টি-শার্ট গায়ে স্যারকে ম্যানলি লাগছে। দেখতেই কেবল হ্যান্ডসাম না, পড়ানও তিনি অসাধারণ। চমৎকার কথা বলেন। ভরাট উচ্চারণে স্যারের গলার স্বরও খুব আকর্ষণীয়।
স্যারের টেবিলে মুখোমুখি বসেছে মুনা।
এই কক্ষটা বেশ বড়। স্টুডেন্টস পড়ান স্যার এ কক্ষে। ক্লাসের মতো লম্বা লম্বা বারোটা বেঞ্চি। বাঁ দিকে একটা বোর্ড। ডানে বইয়ের শেলফ। দেয়ালে রয়েছে ক্যালেন্ডার ও রবীন্দ্রনাথের ছবি।
স্যার, ক্লাসরুমে রবীন্দ্রনাথের ছবি কেন? প্রশ্ন করল মুনা।
আহসান স্যার ছবির দিকে তাকালেন। তাকিয়ে গভীর গলায় বললেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিটা কথার প্রেমিক আমি। তার শব্দ, কবিতা, গান প্রতিটা ছন্দকে মনে হয় এক রূপবতী নারী। নিজেকে মনে করি সেই রূপবতীর যথার্থ প্রেমিক-পুরুষ আমি। মনে হয় রবীন্দ্রনাথ সবকিছু লিখেছেন আমারই জন্য।
মুনা মুগ্ধ হয়ে গেল স্যারের কথায়। মুগ্ধচোখে তাকিয়ে শুনল স্যারের কথা।
স্যার বললেন, এসো। তোমার নোটগুলো বুঝিয়ে দিই।
মুনা ওইদিকে মনোযোগী হয়। জরুরি হচ্ছে পড়ালেখা। এখন পড়ালেখাই শীর্ষ প্রায়োরিটি পাবে, এটাই স্বাভাবিক।
ড্রয়ার থেকে কিছু শিট টেনে বের করেন। মুনার দিকে এগিয়ে ধরে বলেন, এগুলো তোমার জন্য আলাদা ফটোকপি করে রেখেছি। নোটগুলোতে স্বাতন্ত্র্য উত্তর পাবে। অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভিন্নতা আছে। এগুলো তোমার জন্য আমার স্পেশাল গিফ্ট।
মুনা আবারও বিগলিত হয়। মুগ্ধতা আরও বাড়ে। ইচ্ছা হচ্ছিল নোটগুলোর বিষয়বস্তু উলটে দেখতে। বুঝে নিতে। সে সুযোগ পেল না ও।
আহসান স্যার বলেন, কী খাবে বলো?
খাবারের কথা আসছে কেন? টিচারের বাসায় কখনো কিছু খেতে দেওয়া হয় না। অফারও পায়নি ও। তাছাড়া এ কক্ষে অনেক ছাত্রছাত্রী থাকে। সবার সামনে অফারও করার সুযোগ থাকে না।
মুনা অবাক। সহজ গলায় বলল, না। থাক স্যার, খাব না কিছু।
কেন? এসো। আমার বাসার ভেতর তো কখনো যাওনি। এসো। ভেতরে এসো। বলতে বলতে রুমের পূর্বদিকের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন স্যার।
মুনা স্যারকে অনুসরণ করে। এই কক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রয়েছে স্যারের মূল ঘরের। স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট। প্রাইভেট টিউশনির জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভেতরে ঢুকে মুনা প্রশ্ন করল, কেউ নেই যে! ম্যাডাম কোথায়?
আহসান স্যার বললেন, ছেলেদের নিয়ে তোমার ম্যাডাম বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেছে। সপ্তাহখানেক ওখানে থাকবে।
ওহ! বলেই নড়ে ওঠে মুনা। ভয় জাগল না। তবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আবার সজাগ হয়ে উঠল।
আহসান স্যার টের পেলেন মুনার তাৎক্ষণিক অভিব্যক্তি। সহজ করার জন্য বললেন, এই দেখো, এগুলো হলো আমার বইয়ের কালেকশন। এটা হলো রবীন্দ্ররচনাবলী কর্নার।
মুনার দেখার আগ্রহ বাড়ছে না। তবু শেলফের দিকে এগিয়ে গেল ও।
শেলফের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মুনা এবার তাকাল স্যারের মুখের দিকে। স্যারের চেহারা পুরোপুরি বদলে গেছে। লাল হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন কামুক পুরুষ।
মুনা নিজেকে চেনে। তাছাড়া স্যারকে ভেতর থেকে শ্রদ্ধা করে। দুইয়ের মিশ্রণে ভেতর থেকে অসাধারণ এক সাপোর্ট পেয়ে যায় ও।
সহজ হয়ে বলল, স্যার এখন আসি।
আহসান স্যার বলেন, আরেকটু থাকো।
না স্যার, আমাকে যেতে হবে। বাসায় গেস্ট এসেছে। আমার তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার।
মুনার গলার স্বর এখনো স্বাভাবিক।
আহসান স্যার বলেন, মুনা তোমার উপস্থিতি আমার ভালো লাগে। আমরা কি আরও একটু কাছাকাছি আসতে পারি না?
স্যার, আমি আপনার ছাত্রী!
হ্যাঁ। ছাত্রী। ছাত্রী হলেও তুমি অসাধারণ রূপবতী এক তরুণী। তোমার এ পরিচয় আমাকে খুব টানে।
মুনা এবার থমকে যায়। বিস্ময় নিয়ে স্যারের মুখের দিকে তাকায়।
এমন শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকের এই রূপ!
মুনাকে অবাক করে দিয়ে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক এবার সরাসরি প্রপোজাল দেন, তোমাকে পেতে চাই। দেবে?
এই লোকটার বিরাট প্রশংসার পাশাপাশি ফিসফাস কথাও শুনেছিল। একদম কেয়ার করেনি মুনা। একদম বিশ্বাস করেনি। এমন ভদ্র ও সজ্জন মুখোশের আড়ালে ভয়াবহ ওই কুৎসিত চেহারা!
বিস্ময়ের ঘোরে ডুবে গেল না মুনা। ধাক্কা খেয়েও নিজেকে শক্ত রেখে কঠিন স্বরে বলল, ছি! ছি! একজন প্রিয় শিক্ষকের এই দাবি?
আহসান স্যার বলেন, এখানে শিক্ষক-ছাত্রীর সম্পর্ক না মুনা। এখানে সামনে আছে নারী ও পুরুষ। নারী-পুরুষের মধ্যে এমনটা ঘটতেই পারে।
ব্যস! আর কোনো উপদেশ চাই না। থামুন প্লিজ। ধমকে ওঠে মুনা।
আহসান স্যার পরাজিত হতে জানেন না। জয়ী হতে জানেন।
কৌশলী হয়ে বললেন, আমার মন তোমাকে চাইছে। এটা তো তোমার কোয়ালিটির কারণে ঘটছে, এটা তো তোমার গুণের কারণে ঘটছে। তোমার গুণ এবং কোয়ালিটি আমাকে আবেগতাড়িত করছে। দেহ আলোড়িত করছে। আমাকে অপরাধী ভাববে কেন? ছি বলবে কেন?
মুনা এবার রুখে দাঁড়াল। কঠিন স্বরে বলল, আর কত ছাত্রীর জন্য আপনি আলোড়িত হয়েছেন? কত ছাত্রীকে এভাবে শিকার করেছেন?
প্রশ্নটা শুনে কুঁকড়ে গেলেন আহসান স্যার। জবাব দিতে পারলেন না। প্রতি ব্যাচে কাউকে না কাউকে তিনি টার্গেট করেছেন। সফলও হয়েছেন। এবার বোধ হয় ধরা খেয়ে গেলেন।
ধরা গলায় বললেন, না। কাউকে এভাবে বলিনি। তুমিই প্রথম আমাকে...
চিৎকার করে উঠল মুনা। ‘মিথ্যুক’ বলে ধিক্কার দিয়ে নোট শিটগুলো রুমের মধ্যে ছুড়ে মেরে গটগট করে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে।

কল্পনা থেকে বর্তমানে ফিরে এলো মুনা। পড়ার ঘর থেকে উঠে দাঁড়াল। অবিশ্বাস্য দৃশ্যটা কল্পনা করে মন ভেঙে পড়ল।
মাকে বলল, তুমি ভেবো না। আমার প্রবলেম আমি সলভ করতে জানি, মামণি। অন্য টিচার খোঁজা আমার জন্য জরুরি। জরুরি কাজ ঠিক সময়ে শেষ করতে পারব আমি।
মাহবুবা আখতার ঘর গোছানো শুরু করেন, মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হতে পারলেন না।
মুনা ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
রিয়ার কথা মনে পড়ল। মনে মনে ভাবল, রিয়া জেদের বশে সন্ত্রাসীদের বিছানো জালে পা দিয়েছিল। সন্ত্রাসীরা তো করবে সন্ত্রাসী কাজ। এজন্যই তারা সন্ত্রাসী। একজন গুণী শিক্ষকের কেন ওই রূপ? আহসান স্যারকে কুখ্যাত সন্ত্রাসীর চেয়েও বেশি ভয়াবহ মনে হচ্ছে। বোঝা গেছে মেয়েরা এই ক্রিমিনালের বিছানো ফাঁদে পা দিয়েছে। সর্বস্বান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ক্ষতি হবে অনেক মেয়ের।
কেউ অস্ত্রধারী। অস্ত্র দিয়ে খুন করে। কেউ মেধাবী। মেধা দিয়ে পঙ্গু করে। মেধাবী ক্রিমিনালদের ঠ্যাকাবে কে?
র্যাব নিয়ে বিতর্ক হয়। বিতর্কিত হলেও র্যাব অনেক ভালো কাজ করেছে। র্যাবের কারণে সন্ত্রাস কমেছে। কালো র্যাব সন্ত্রাস দমন করছে। মেধাবী সন্ত্রাস রুখবে কোন র্যাব?
নিজের মনে তেজস্বী এক প্রতিরোধ শক্তি জাগে। লড়াই করার ইচ্ছা জাগে। প্রতিরোধের ইচ্ছা জাগে। কোন পথে এগোবে? কার কাছে যাবে ও? এমন বিষয় তো কারোর সঙ্গে আলাপও করা যায় না। ভাবতে ভাবতে রিয়াকে কল করল মুনা।
কল ধরে রিয়া বলল, কিরে। গায়েব হয়ে আছিস কেন?
এখন কি গায়েবি কথা শুনছিস? হাসির প্রশ্ন করেও হাসল না মুনা। ধীরস্থির মুনার স্বর।
রিয়া আবার বলল, মনে হচ্ছে তোর মন ভালো নেই, ঠিক না?
ঠিক। মন ভালো নেই।
কেন? ফটোসেশন নিয়ে কোনো ঝামেলা?
না। ফটোসেশন নিয়ে ঝামেলা নেই। খোঁজ নিয়েছি ঝিমিক্স ভালো স্টুডিও। তবে কোনো কোনো স্টুডিওতে ড্রেসিংরুমে লুকোনো থাকতে পারে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। গোপনে তুলতে পারে রূপবতীদের ন্যুড ছবি। এটা আর এমন কী ঝামেলা!
হেঁয়ালি রাখ। আসল কথা বল। ধমক দেয় রিয়া।
ঝামেলা হচ্ছে ক্লাসে। কোচিংয়ে। গোপন ক্যামেরা না। ওপেন ক্যামেরার আক্রমণ। সরাসরি প্রপোজাল ‘তোমাকে পেতে চাই। দেবে?’
মানে কী?
মানে, মানে বুঝিস না, মানে হচ্ছে, কাপড় খোলো। বিছানায় শোও। দেহ দাও।
কী আবোল-তাবোল বকছিস! রিয়া তেড়ে ওঠে।
মুনা রাগ না-করে একদম ঠান্ডা গলায় বলল, আরে তোর বখাটেরা তো অনেক ভালো। দেহ চায়নি। ছবি তুলেছে। টাকা চেয়েছে। ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়েছে টাকার জন্য।
রিয়ার মন খারাপ হয়ে গেল। অসহায়ের মতো বলল, আমাকে অপমান করছিস?
মুনা আবেগের ঘোর থেকে বাস্তবে ফেরে। রিয়ার কথায় টনক নড়ে। রিয়াকে অপমান করতে পারে না ও। রিয়াকে ভালোবাসে। ফ্রেন্ডের জন্য সব করতে পারে ও। বাস্তবে ফিরে আহসান স্যারের ফাঁদের কথা বিস্তারিত খুলে বলে।
রিয়া আর নিজেকে অপমানিত ভাবার সুযোগ পেল না। অবাক হয়। হতবাক হয়। অসহায়বোধ আর বিস্ময় নিয়ে বলল, আমরা কোথায় যাব? কার কাছে আশ্রয় পাব?
কারও কাছে আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই। নিজের আশ্রয়ে থাকব নিজে। সমস্যা ফাইট দিয়ে যেতে হবে।
ঠিকই বলেছিস। চারপাশে আছে বিপদ। আছে বিপজ্জনক কাঁটা। কাঁটার ফাঁদ থেকে নিজেদের বাঁচাতে হবে। কৌশলী হতে হবে।
কীভাবে কৌশলী হব? মুনা জানতে চায়।
আমি ইংরেজি পড়তে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোর সঙ্গে আলাপ করে একজন নামকরা স্যারকে ধরব। না। সিদ্ধান্তটা বাদ দিলাম। বরং তুই আমার জন্য একজন ম্যাডাম দেখ, যিনি বাসায় এসে পড়াবেন। দেখবি বলেছিলি, মনে আছে? আর শোন, আমাদের বাসার কাছে ধানমন্ডিতে একজন বায়োলজির ম্যাডাম আছেন। উনার কাছে পড়তে পারিস তুই।
এটা তো কৌশল হলো না। সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়া হলো। পরিস্থিতির অ্যাভয়েডেন্স হলো। মুনা যুক্তি দেখাল।
সামনে পরীক্ষা। নিজেদের রেজাল্ট ভালো করা এখন বেশি দরকার। ফাইট দিতে গেলে মন উত্তপ্ত থাকবে। উত্তপ্ত মন পড়ায় বসবে না। রেজাল্ট খারাপ হবে।
মুনা এবার বলল, হ্যাঁ। তোর এই যুক্তির সঙ্গে আমি একমত। ঠিক আছে। তোর জন্য একজন টিচার দেখব। উনি ইংরেজির ম্যাডাম, কম বয়স। বিয়ে করেননি এখনো। বাসায় গিয়ে তোকে পড়াতে বলব। অনারিয়াম একটু বেশি চাইতে পারে।
বাপি বলেছেন, মানি ইজ নট এ প্রবলেম। তুই নিয়ে আয় বাসায়। আর তোকে নিয়ে আমি যাব বায়োলজি ম্যাডামের বাসায়। আমার সঙ্গে পরিচয় আছে উনার।
ঠিক আছে। ইংরেজি ম্যাডামকে নিয়ে কালই আসব আমি। কথা শেষ করে লাইন কেটে দিল মুনা।

আজকাল জীবনযাত্রায় পদে-পদে বাধা আসছে। এলাকায় রোমিওদের জ্বালা, টিচারের কাছে জ্বালা, আত্মীয়-স্বজনের কথার খোঁচা, বাবা-মার শঙ্কা, পড়ালেখা নিয়ে উদ্বেগ এবং সবচেয়ে কঠিন জ্বালা হচ্ছে ঘটকের জ্বালা, হবু বউ হওয়ার ডাক, প্রপোজাল, মুহুর্মুহু টেলিফোন, অনলাইনে নেট বন্ধু হওয়ার জন্য মেইলের পর মেইলের দীর্ঘ লাইন।
সব বাধা ডিঙাতে হবে।
আবেগের খাঁচায় ধরা দেওয়া চলবে না। ক্যারিয়ার আগে। বাকি সব পরে।
মন শক্ত করে মুনা। নিজেকে দাঁড় করাতে হবে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। বোঝে ও।
কেবল বাবা-মা বোঝে না।
বাবা-মাকেও দোষ দেওয়া যায় না। চারপাশের মানুষজন ওদের মনে টেনশন ঢুকিয়ে দেয়।
মেয়ে বড় হচ্ছে, এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়, ডানপিটে মেয়েটার বিপদ হতে পারে, ক্ষতি হতে পারে এসব তথাকথিত ভালো ভালো চিন্তা ঢুকিয়ে দেয় মায়ের মনে। রিয়ার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটাও টেনে আনে তারা। হুট করে কোত্থেকে কী হয়―এসব অগ্রিম চিন্তার জালে জড়াতে থাকে মায়ের মন। বাবার মন। রিয়া তাদের আরেকটি মেয়ের মতোই। সেই রিয়া যা ঘটিয়েছে! উদাহরণ টেনে আনে তারা। বারবার টানে। রিয়ার অবর্তমানে চলে এমন কথাবার্তা। ওদের আচরণ দেখেশুনে মনে হচ্ছে গোপনে ষড়যন্ত্র চলছে। বিয়ে নিয়ে গোপনে কথাবার্তা হয়। এত অল্প বয়সে বিয়ে! ভাবতেই পারে না মুনা। স্ট্রংলি অপোজ করবে ও।
সেদিন সেজো খালা এসেছে। অনেকটা দজ্জাল খালা। গমগম করে মাকে সরাসরি বললেন, আমাদের মেয়ে সুন্দরী। মায়াবতী। এমন মেয়ের ঘরে-বাইরে বিপদ বেশি। ভালো প্রপোজাল পায়ে ঠেলে দিয়ো না।
মা জবাব দেয়নি ওই কথার।
মুনা সামনে ছিল, ক্ষুব্ধচোখে ও একবার খালার দিকে তাকিয়েছিল। মুখের ভাষা ব্যবহার করেনি। চোখের উত্তপ্ত ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছে, আমার ব্যাপারে নাক গলিয়ো না।
রেজাও সামনে ছিল। রেজা বলেছিল, কীসব ভাবনা তোমাদের।
সেজো খালা ধমক দেয় রেজাকে। তুই চুপ কর। বিয়ে নিয়ে তুই কথা বলবি না। ইউ আর কমপ্লিটলি আনফিট টু টক অ্যাবাউট দিস ম্যাটার।
সেজো খালার মুখের ওপর কেউ কথা বলতে পারে না। জাঁদরেল খালার ওপর রেজা মামা রাগ করেনি। নিরীহ ঢঙে সবার সামনে থেকে বের হয়ে গিয়েছিল।
মামার জন্য ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল মুনা।
রুখে দাঁড়িয়েছিল ও, ডোন্ট থ্রু ইনজুরিয়াস টক। ইউ শুড কিপ কন্ট্রোল ইয়োর টাং।
বেয়াদবি করবি না মুনা। ক্ষেপে উঠেছিল সেজো খালা।
বেয়াদবি করছি না, অশোভন শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
মুনার উদ্ধত স্বর শুনে দমে গিয়েছিলেন সেজো খালা।
মা খালার পক্ষে নেয়নি। মুনার পক্ষও না।
মা বলেছিল, থাম তোরা। রেজার মন এমনিতে খারাপ। ওকে নিয়ে আলাপ করা উচিত না।
বাসা থেকে চলে যায় সেজো খালা। রাগ করে এখনো আসেননি এ বাসায়। মাহবুবা আখতারের মনও খারাপ। কথায় কথায় প্রসঙ্গটা তুলে ধরে মুনাকে দোষ দেন।
মুনা পাত্তা দেয় না এসব ফালতু কথাবার্তা।

চলবে...

এসইউ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]