মায়াবতী: পর্ব ২৮

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৬:২০ পিএম, ০১ জানুয়ারি ২০২২

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি—

রেজা মুগ্ধ হয়ে শোনে রিয়ার কথা। দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। টিএসসির সড়কদ্বীপ থেকে বেরিয়ে রাস্তার দিকে এলো ওরা। গাড়ির দিকে এগোতে লাগল।
রেজা বলল, তোমার কথা শুনে খুশি হয়েছি। তুমি এখন দোকা হও। অন্য কোনো তরুণের সঙ্গে না-মিশে, বইকে বন্ধু বানাও। সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ফেলো। ডিগ্রিই হবে তোমার গোপন এক বন্ধু। একা থাকবে না তখন, সবার আড়ালে দোকা থাকবে। এই বন্ধু হচ্ছে শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সবাই ছেড়ে যাবে। ওই বন্ধু তোমাকে ছেড়ে যাবে না। আজন্ম থাকবে তোমার সঙ্গে। তোমাকে সুখ দেবে, সম্মান দেবে, প্রতিষ্ঠা দেবে, ঐশ্বর্য দেবে।
মামার দিকে মুখ তুলে তাকাল রিয়া।
বেশি বাস্তববাদী কথা ভালো লাগে না, মামা। বাস্তবতার প্রয়োজন আছে, মানলাম। পাশাপাশি আবেগেরও তো দরকার, আবেগ ছাড়া জীবন তো পানসে।
কাঁটার আঘাত খাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে আবেগ নিয়ে নাড়াচাড়া করা ভালো। তোমার প্রস্তুতি ছিল না। এজন্য আবেগের তোড়ে আটকে গিয়েছিলে। কিছুদিন যন্ত্রণায় ছটফট করেছ, তাই না?
রিয়া এবার চুপ হয়ে গেল। মামার কথায় হার মানল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো মামারও তো একই অবস্থা। আবেগময় বাসর রাতের দুঃস্বপ্ন তার পুরো জীবনের স্বর্ণালি পাতায় ঢেলে দিয়েছে বিষ। বিষের দহনে পুড়েছেন। পুড়ছেন। এ কারণে কি দোকা হওয়ার সাহস পান না?
দোকা হওয়া মানেই কি যন্ত্রণা? আনন্দ না?
মামার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল রিয়া। হঠাৎ কথা থেমে গেল ভেতরেই।

সামনের রাস্তা দিয়ে ধাবমান একটা রিকশার দিকে চোখ গেল তার।
রিকশা ছুটে যাচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের রাস্তা বরাবর। রিকশায় বসে আছে কুসুমকলি। সঙ্গের ছেলেটাই কি মাহিন?
দারুণ হ্যান্ডসাম। ওরা হাসছে। কথা বলছে। চারপাশের অসংখ্য মানুষের প্রতি চোখ নেই। নজর নেই। কাউকে দেখছে না তারা। কেবল দেখছে নিজেদের। এমনটা মনে হলো রিয়ার। মুহূর্তের মাঝে রিকশাটা চলে গেল সামনে দিয়ে।
রিয়া ভাবে, কুসুমকলি ভালোই আছে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন ওর কাছে তেমন একটা আসে না বললেই চলে। এটাই কি জগতের নিয়ম? জানের জান আর জান থাকে না। জানের ওপর ভর করে অন্য জান। অন্য প্রাণ। দিন বদলে যায়। সময় বদলে যায়। চারপাশের মানুষ বদলে যায়। বদলে যাওয়া গতিপ্রকৃতি তো সহজভাবে মেনে নিতে হবে। না-নিলে কষ্ট। না-নিলে যন্ত্রণা। ভাবতে থাকে ও।
কেন কষ্ট নেবে মনে? বরং এই সময়ের আনন্দটাই কুড়িয়ে নেওয়া যাক।
রেজা প্রশ্ন করে রিয়াকে, সামনে দিয়ে কে গেল, দেখেছ?
ভাবনা থেমে গেল। রিয়া জবাব দেয়, দেখেছি।
পাশের ছেলেটা কে?
ওর নাম সম্ভবত মাহিন?
সম্ভবত কেন বলছ? তুমি চেনো না?
না। চিনি না। কথা হয়েছে টেলিফোনে। দেখা হয়নি।
মাহিন কে?
বুয়েটে পড়ে। কুসুমকলির বয়ফ্রেন্ড।
ওঃ! রেজা আর কথা বাড়াল না। ‘বয়ফ্রেন্ড’ শব্দটা নতুন প্রজন্মের ক্রেজ। বয়ফ্রেন্ডকে ওরা আলাদা চোখে দেখে। ছেলে ফ্রেন্ডদের ‘হাই গাই’ বলে ডাকে। তাদের কথায় কথায় ঝরে পড়ে ‘ইউ নো’। শব্দ স্টাইলে পরিবর্তন চোখে লাগে।
রেজা এমন শব্দগুলোর সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত না। দেশের বাইরে এই চল দেখে এসেছে। এখন দেখছে দেশের ভেতরে। এয়ারপোর্ট রোড ক্রস করে পূর্বদিকে এলে বাংলাদেশকে আর বাংলাদেশ মনে হয় না। মনে হয় বিদেশি কোনো দেশের বাউন্ডারি ক্রস করেছে ও। তরুণ-তরুণী এবং নারীদের পোশাক-আশাকে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তারা আর একা থাকছে না। একাকিত্বের বাইরে এসে দোকা হয়ে যাচ্ছে। গ্রুপ বেঁধে আড্ডা দিচ্ছে। অথচ ও ডুবে থাকতে চায় নিজের মাঝে। পাশে অন্য কেউ থাকলে ক্ষতি কী?
এ সময় বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে কুসুমের ঘোরাঘুরি ভালো ঠেকছে না। ভাবনার আড়াল থেকে রেজা স্বগতোক্তি করে।
কেন মামা?
এখন পড়ার সময়। সামনে পরীক্ষা। এখন পড়ার বইকে বানাতে হবে বয়ফ্রেন্ড।
কারোর মনের ওপর তো আমরা জোর খাটাতে পারি না। যার যা ইচ্ছা করুক।
অন্যের ওপর জোর খাটানোর প্রশ্ন না, রিয়া। জোর খাটাতে হবে নিজের ওপর নিজে। উপযুক্ত সময়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামী দিন কষ্টে ভরে যাবে।
নিজের জীবনের কথা বলছেন?
রেজা হাসল। না। পুরোপুরি নিজের জীবনের কথা না। অভিজ্ঞতার কথা বলছি। বড়দের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হয়।
ঠিক আছে। আপনার উপদেশ বাণী কুসুমকে জানিয়ে দেবো। নিশ্চিত থাকেন।

এ সময় রেজার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে।
মুনা ফোন করেছে। মামা, তুমি কোথায়?
টিএসসির সামনে এখন।
কী করছ?
রিয়ার সঙ্গে ঘুরছি?
কী! রিয়ার সঙ্গে ঘুরছ! বুড়ো বয়সে রিয়ার প্রেমে পড়লে নাকি?
মুনার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল রেজা। ছোট্ট করে বলল, বল কী বলবি।
আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। বিয়ের কথা পাকা করে ফেলছে আর তুমি আছো রিয়াকে নিয়ে?
পাত্র ভালো পেলে তো সব মা-বাবাই এ কাজ করবে। মেয়ের ভালোটা তো তারাই দেখবে, নাকি?
লেকচার বাদ দাও। বাসায় এসো। সবাইকে বলো, আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না।
এখন বিয়ের কথা বলেছে?
আলাপ চলছে বাসায়। তুমি জানো না?
জানি। এখন না। যা হবার হবে পরীক্ষার পর।
ওঃ! তুমিও ষড়যন্ত্রকারীদের দলে?
দমে না গিয়ে রেজা কথা চালিয়ে গেল। আমাকে ষড়যন্ত্রকারী বলছ কেন?
বলছি, কারণ সব জেনেও আমাকে কিছু জানাওনি তুমি।
আমি ষড়যন্ত্রকারী না। কারণ নিশ্চিত জানি, ছেলেকে দেখে তুমি তিনবার বেহুঁশ হবে। বলবে, আজই বিয়ের ব্যবস্থা করো।
থামো মামা। বাসায় এসো। দ্রুত এসো। আর রিয়াকে ফোন দাও।
রিয়া ফোন ধরেই বলল, কনগ্র্যাচুলেশন।
মুনা খেপে যায়। তুইও মামার দলে?
না। মামার দলে না। তোর দলে। যাকে দেখে তিনবার বেহুঁশ হবি তাকে আমার এখনই দেখতে ইচ্ছা করছে।
যা। দেখ। পারলে তুই ‘তিন বেহুঁশের’ গলায় মালা পরিয়ে দিস।
আচ্ছা দেবো। অনুমতি পেলে আমিই তোর পক্ষ থেকে মালা পরিয়ে দেবো।
আমার বাসর রাতেও তোকে শুইয়ে দেবো।
আচ্ছা। শোবো। তোর সঙ্গে শেয়ার করব। রিয়া হাসতে হাসতে মুনার কথার জবাব দিতে থাকে।
তোর জীবনও তাহলে মামার মতো হবে। শূন্য। ছ্যাঁকা জীবন।
হোক। রেজা মামার মতো জীবন হলে ক্ষতি নেই।
তাহলে এক কাজ কর, বুড়াটার গলায় মালা পরিয়ে বাসায় আয়। মামি বলে সালাম করি।
তুই অনুমতি দিলে না হয় তা-ই করব।
মুনা হেসে বলল, দিলাম। অনুমতি দিলাম।
রেজা মামা তো অনুমতি দেবে না। তুই দিলে কী হবে?
হবে। বল, আমি অনুমতি দিয়েছি।
রিয়া বলল, মামা আমাকে অনুমতি দিয়েছে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য। ওনার সঙ্গে না। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে। মামার পরামর্শ অলরেডি গ্রহণ করেছি। নতুন পরামর্শ তো চাইতে পারব না।
ফাজলামো করিস না রিয়া, বাসায় আয়। মামাকে নিয়ে আয়।
রিয়া এবার একটু শক্ত গলায় বলল, আমার মতো বোকামি করিস না। নিজেকে সামাল দে। তারপর ডিসিশন নিবি। নইলে ভুল হবে। ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে সব নিঃশেষ হয়ে যাবে।
রিয়ার গলার স্বর শুনে কিছুটা শীতল হয় মুনা। সহমর্মী হয়ে বলে, নিজের ভুল এখনো বয়ে বেড়াচ্ছিস, রিয়া?
না। ভুলের বোঝা আজ মাথা থেকে সরে গেছে। সমস্যা মিটে গেছে। এই সংবাদটা মামা দিয়েছিলেন ফোনে। ফারুক সাহেব মামাকে জানিয়েছিলেন। মামা একা ফুলার রোডে ঘুরছিলেন। আমার আনন্দ সংবাদ শুনে স্থির থাকতে পারিনি। কৃতজ্ঞতায় মামার কাছে ছুটে এসেছি। এখন ঘুরছি ওনার সঙ্গে।
মুনা বলল, কনগ্র্যাচুলেশন। আবার আগের জীবনে তোকে ওয়েলকাম রিয়া।
রিয়া এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, রেগে থাকিস না। মন ঠান্ডা রেখে কাজ কর। আমাদের এখন বয়ফ্রেন্ড হচ্ছে পড়ার বই। আমার কথা মাথায় রাখ। বিয়ের ব্যাপার নিয়ে ভাবার দরকার নাই। যা হবার হবে। এখন তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না।
মুনা বলল, থ্যাঙ্কস রিয়া। তোর সঙ্গে কথা বলে মন হালকা হয়ে গেছে।
রিয়া আর কথা বাড়াল না। ফোনসেটটা মামার হাতে দিয়ে বলল, ওঠেন মামা। গাড়িতে ওঠেন।

গাড়িতে ওঠার পরপরই দরজা খুলে দ্রুত আবার নেমে এলো রিয়া।
যেবু আপা, যেবু আপা বলে চিৎকার দিয়ে ও খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল। পাশ দিয়ে রিকশায় চড়ে যাচ্ছিল যেবু।
যেবু আপা দেখতে পেল রিয়াকে।
রিকশা থামিয়ে নেমে ওর কাছে এলেন তিনি।
আপার চেহারা মলিন। ড্রেসে স্মার্টনেস নেই। মলিনমুখে বলল, ভাবছিলাম তোমাদের বাসায় যাব। ভালোই হলো তোমাকে পেয়ে।
তাহলে চলুন, রিকশা ছেড়ে দিন। গাড়িতে ওঠেন।
যেবু রিকশা ভাড়া মিটিয়ে গাড়ির সামনে আসে। রিয়া পেছনের দরজা খুলে বলল, ওঠেন। উনি রেজা মামা। মুনার মামা। আমাদের সবার প্রিয় রেজা মামা। আপনাকে ওনার কথা বলেছিলাম।
যেবু বলল, তুমি পেছনের সিটে যাও।
ওঠেন। পেছনে বসেন। আমি সামনে বসছি। রিয়া অনেকটা হুকুম করে যেবু আপাকে ভেতরে উঠতে প্ররোচিত করে।
রেজা আগেই ভেতরে ছিল। যেবুও উঠলেন পেছনের সিটে। রিয়া সামনে বসেছে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে।
রিয়া ড্রাইভারকে বলল, ফুলার রোড হয়ে চলো। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে মামার গাড়ি অপেক্ষা করছে। মামাকে তার গাড়িতে উঠিয়ে দাও।

ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল রিয়া। রেজা মামাকে উদ্দেশ করে বলল, উনি যেবু আপা। আপনাকে ওনার কথা বলেছিলাম। আমার ইংরেজির টিচার।
গুড ইভিনিং। রেজা মামা ইংরেজি কায়দায় অভিবাদন জানাল।
যেবু বলল, থ্যাঙ্কস। আপনার কথা অনেক শুনেছি রিয়ার কাছে।
আমিও শুনেছি আপনার কথা।
রিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, শোনাশুনিতে কাটাকুটি। এবার মামা, আমার কথা শোনেন। ভেবেছিলাম আপনাকে ফুলার রোডে নামিয়ে দেবো। সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। বাসায় একসঙ্গে চা খেয়ে আপনাকে ছাড়ব। ফোনে আপনার ড্রাইভারকে জানিয়ে দেন আমাদের বাসায় যেতে। কথা শেষ করে নিজের ড্রাইভারকে বলল, সোজা বাসায় চলো।
রেজা বলল, আজ থাক রিয়া। আরেক দিন যাব তোমাদের বাসায়।
আরেক দিন তো যেবু আপা থাকবেন না। আজই চলুন।
না। থাক। তোমার যেবু আপার সঙ্গে আরেক দিন সময় দেবো। আজ মুনাকে সামাল দিই। আমার যেতে দেরি হলে ওর রাগ আরও বেড়ে যাবে। পাশে থাকলে রাগ সামাল দিতে পারবে।
মুনার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে রিয়া রাজি হয়ে গেল মামার কথায়।
যেবু খেয়াল করল রেজাকে। মধ্য বয়স। চল্লিশ পেরিয়েছে বলে মনে হয় না। দেখতে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশের মতো লাগে। ত্বকের রং উজ্জ্বল। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। নতুন মেয়ে পেয়ে হ্যাবলার মতো কথা বলার জন্য লেগে থাকেনি। বরং মার্জিত ভদ্র ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। চারপাশে এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষই তো প্রয়োজন। রিয়াকে উদ্দেশ করে যেবু বলল, থাক। মনে হচ্ছে ওনার কাজটাও জরুরি। উনাকে ছেড়ে দাও আজ।
রিয়া রাজি হয়ে বলল, আচ্ছা। আরেক দিন আমরা সবাই আড্ডা দেবো। রাজি মামা?
রেজা মামা মাথা নাড়িয়ে বলল, রাজি।

গাড়ি চলে এসেছে ফুলার রোডে। ফুলার রোডে মামাকে নামিয়ে দেয় ও। নিজে ফিরে এলো পেছনের সিটে। যেবু আপার মুখের দিকে আবারও তাকাল। আপার মুখের মায়াজুড়ে বসে আছে অনিশ্চিত শঙ্কা।
রিয়া বলল, আপা, মন খারাপ কেন?
ম্লান হাসে যেবু। ঠান্ডা স্বরে বলল, আজ টিএসসির ভেতরে ওর সঙ্গে শেষ বৈঠক হয়েছে।
কী খবর আপা?
টোন কমিয়ে বলল, ও গতকাল মায়ের পছন্দে আকদ করে ফেলেছে। মায়ের কথা রেখেছে। আমাকে গ্রহণ করতে না-পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। সরি বলেছে। ক্ষমা চেয়েছে। কেঁদেছে।
সরি বলে, ক্ষমা চেয়ে কি এত বছরের সম্পর্ক শেষ করা যায়? এ কেমন রিলেশন আপা?
যেবু এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। ফেলে আসা দিনের আনন্দময় মুহূর্তগুলো বারবার মনে পড়ছে। কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট সামাল দেওয়ার জন্য বলল, রিয়া, থাক। এসব আলোচনা বাদ দাও।
রিয়া বাদ দিতে চায় না, বলল, আপা, ওনার শাস্তি হওয়া উচিত।
না। ওকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন আমি দেখছি না। বরং সনাতন সামাজরীতি আর ওর পরিবারের সদস্যদেরই সাজা পাওয়া উচিত।
নিজেকে এত বড় বানানোর মানে নেই, আপা। সবকিছু ক্ষমা করে দিয়ে মীমাংসা হয় না।
যেবু বলেন, আস্তে বলো। ড্রাইভার বুঝে যাবে আমাদের কথার বিষয়।
রিয়ার সেন্স ফিরে আসে। আপার কষ্টে এতই একাকার হয়ে গিয়েছিল যে, বাস্তব জ্ঞান লোপ পেয়েছিল। চুপ হয়ে গেল ও। যেবু আপার জন্য গোপন মায়ায় টলে ওঠে ওর নিজস্ব জগৎ। সহমর্মিতায় ও চেপে রাখল আপার ডান হাতের মুঠি।

বাসায় এসে যেবুর চেহারা বদলে গেল।
বোঝা যায় না তিনি কষ্টে আছেন। বোঝা যাচ্ছে, যেবু এখন একজন দায়িত্ববান টিচার। এই টিচারের কাছে পড়ালেখার বিষয়টাই এখন মুখ্য। যেবু আপার টিচারসত্তায় মুগ্ধ করে রিয়াকে।
রিয়া পড়ায় মনোযোগী হয়।
আপার কষ্ট দূর করতে হলে, ভালো রেজাল্ট করে দেখাতে হবে। ইংরেজিতে এ প্লাস পেলে আপা সফল হবে। নিজের সফলতা আপার সফলতাকে উঁচিয়ে ধরবে। আপার জন্যই তাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। ওনার মলিন মুখে হাসি ফোটাতে হবে। ভালো রেজাল্ট তাকে করতেই হবে। ভাবতে গিয়ে রিয়া সিরিয়াস হয়ে যায়।
নিজের মধ্যে বেপরোয়া এক শক্তি টের পেল রিয়া। এই শক্তি বাড়িয়ে দিলো মনোযোগ। বাড়িয়ে দিলো যেবু আপার প্রতি মমতা, মায়া। এই মায়ার বিনিময়ে যে কোনো জয় ছিনিয়ে আনবে রিয়া।
রাহেলা চৌধুরি একবার এলেন রিয়ার ঘরে।
ইমরুল চৌধুরিও এলেন।
মা-বাবা মেয়েকে দেখলেন।
মেয়ের চোখেমুখে অন্যরকম আলো দেখতে পেলেন তারা। এতদিন মনে হতো মেয়ের মায়াবী মুখে বসে আছে অজানা শঙ্কার ছাপ। এখন দেখছেন দৃঢ়প্রত্যয়ী অনিন্দ্যসুন্দরী রিয়াকে। এই রিয়ার মুখে ভয় নেই। শঙ্কা নেই। জড়তার গিঁট নেই। এই রিয়া যে-কোনো জয় ছিনিয়ে আনবে। ভাবতে গিয়ে প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে মায়ের মন। বাবার মনও।
রাহেলা চৌধুরি মেয়ের মাথায় হাত রাখেন।
রিয়া শান্তি টের পায়।
ইমরুল চৌধুরি যেবুকে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করেন, কেমন হয়েছে রিয়ার প্রিপারেশন?
জি, খুব ভালো।
ইমরুল চৌধুরির মন ভরে যায় ভালো লাগায়।
রাহেলা চৌধুরির মনেও শান্তির ঢেউ বয়ে যায়...

চলবে...

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]