নিমপাতার পাকোড়ার নিষিদ্ধ আলিঙ্গন

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:০২ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২২

ইসরাত নিপু

শবযাত্রা ভারী হয়। কথাটা মায়ের কাছে শোনা। আজ নিজেই সেটা টের পেলাম। কিছু সময়ের জন্য ফুটপাতের পাশে দাঁড় করানো হয় গাড়িটা। ড্রাইভারের প্রকৃতির ডাক আসে বলেই। ল্যাম্পপোস্টের উপরে বসে থাকা কাকটা ঝিমুচ্ছিলো। আমার দিকে বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল কিছু সময়। হঠাৎ ময়লার গাড়ির দিকে আকৃষ্ট হয়ে উড়ে যায়। ওদিকে আমারও বেশ তাড়া। বেশি দেরী হয়ে গেলে লোকজন বেশি সমাগম হবে। জনে জনে লাশ দেখতে চাইবে। নানারকম প্রশ্ন আসবে মানুষের মনে। আমি চাই না এত প্রশ্ন এসে ভিড় করুক কারো মনে। যত বেশি প্রশ্ন তত বেশি জটিলতা। এই ঝামেলা তৈরি হতো না। যদি লাশটা আজিমপুরে দাফন করা হতো। মা সব কিছুর জন্য দায়ী। শোকে মাতম করতে করতে হঠাৎ চিৎকার করে বললেন, গ্রামের বাড়িতে দাদির কবরের পাশে কবর দিতে হবে। কথা শোনার পর আমি ভয়ে কুঁকড়ে যাই। ওদিকে ছোট চাচা, কথাটা শোনার সাথে সাথে তার দুরসম্পর্কের এক ভাইকে ফোন করে সব ব্যবস্থা করতে বলেন।

গ্রামে আমাদের আপনজন কেউ থাকে না। তাই কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার বা কোনো কাজের প্রয়োজনে এসব লতায়-পাতায় প্যাঁচানো আত্মীয়-স্বজনের সাথে খাতির করতে হয়। মাঝে মাঝে ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে এলে বাসায় আশ্রয় দিতে হয়। ওদিকে মা হিসেব মেলাতে পারছে না কিছুতে। কেন এমন হলো? সারাদিনের শোক, নানা ভাবনা, কিছু আড়াল করতে গিয়ে মায়ের মুখটা শুকিয়ে চুপসে গেছে। দানাপানি পড়েনি সকাল থেকে। পাশের বাসার ছোট চাচি অনেক চেষ্টা করছে। কিন্তু মা এখন অনুভূতিশূন্য পাথর। আজ তার সব বিপন্ন। মায়ের সকালটা শুরু হয়েছিল ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম’ শুনে। প্রতিদিন ওভাবেই শুরু হয়। মা বিছানা ছাড়ে আমি টের পাই। বারান্দার বেলি ফুলের সুগন্ধ এসে নাকে পৌঁছায়। তারপরে আর একটু সময় অপেক্ষা করেছিল। এর পরই হয়তো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাওয়া এসে ঘরে ঢোকে, সেই হাওয়ার সাথে ভেসে যায় সব হিসেবনিকেষ।

এ এলাকায় আমাদের বাড়িটা বেশ পুরোনো, দাদার আমলে তৈরি। কিন্তু এখনো বেশ মজবুত। তাই তো মা আগে প্রায় সময় বলতেন, আমার শ্বশুরবাড়ির বিল্ডিংটা বেশ খাসা। সেই খাসা বাড়িটা সবার কাছে পরিচিত উকিল বাড়ি নামে। জটিল চারমুখী রাস্তার একটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এলাকায় সবচেয়ে পুরোনো বাড়ি হওয়ায় দিকদর্শী ভূমিকা পালন করছে অনেকদিন। অনেকটা সেই কারণে বাড়ির নিচতলায় নিমগাছটার পাশে আমাদের কেয়ারটেকার জয়নাল চাচা ছোট পরিসরে চায়ের আসর জমিয়ে বসেছেন। পরিসর ছোট হলেও ব্যবসা কিন্তু বেশ ভালো। প্রতিদিন সকালে দশটার ভেতরে সিঙারা, সমুচা, আলুর চপ আর মসলা মালাই চা নিয়ে দোকান খোলা হয়। চলতে থাকে বারোটা পর্যন্ত। তারপরে শুধু চা। বিকেলে পুরি, বেগুনি, পিঁয়াজু আর ছোলার আসর।

এ এলাকার ইয়াং ছেলেদের আড্ডাস্থল হলো উকিলবাড়ির চায়ের স্টল। ওখানে আড্ডা দিতে আসা একজনকে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই আমার ভালো লাগা শুরু হয়। বিকেলে ফেরার পথে, রাতে বারান্দায় গামছা শুকাতে দেওয়ার ছলে দেখা হতো আমাদের। সেই দেখাটা এতই গভীরে পৌঁছে যায়। আমি অন্ধকারে পাঁচটি অবয়বের মাঝ থেকে ঠিকই ওকে চিনতাম। ব্যস্ত রাস্তায় ভিড়ের মাঝে দূর থেকে আলাদা করতে পারতাম। কেন পারবো না, লম্বা ছয় ফুটের কাছাকাছি। দেখতে সুর্দশন, গুণ হিসেবে ছবি আঁকে ভালো। সব থেকে উৎকৃষ্টতম যোগ্যতা বুয়েটের মেকানিক্যালের শেষ বর্ষের ছাত্র। খালি... খালি একটাই সমস্যা। মারিজুয়ানা খায়। লম্বা চুল বেঁধে রাখে, সেটাই আমার ভালো লাগে। সেই ভালো লাগাটাকে আরও পোক্ত করার জন্য মায়ের কাছে ছবি আঁকা শেখার আবদার করি। বুয়েট ছাত্রের কাছে গণিত ডিঙিয়ে ছবি আঁকা শিখতে চাওয়ায় মা বেশ অবাক হয়েছিল। কপাল কুঁচকে জানতে চেয়েছিল ঘটনা কী? আমার আহ্লাদী ভরা অভিমানের কারণে মা বিশেষ পাত্তা দেয় না।

মা ছিল আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমাদের বয়সের পার্থক্যটা মাত্র ১৭ বছরের। তাই তো মা জানতো, ভালো লাগার কথাটি তাকেই প্রথম বলবো। আমি যখন ছোট; তখন থেকেই দেখতাম বাবা কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যেত। আবার হঠাৎ হঠাৎ ফিরে আসতো। তাই তো মায়ের একাকী জীবনে আমি একমাত্র অবলম্বন, সাথে এনজিওর চাকরিটা। কারণ বাবার তেমন কোনো আয় রোজগার ছিল না। দুটো দোকান ভাড়া ছাড়া। সে টাকা বাবার হাতখরচে চলে যেত। ভবঘুরে, কবি। মাকে ভালোবাসে প্রচণ্ড কিন্তু দু’জন মানুষ ঝগড়া করতো সারাক্ষণ।

একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফিরে দেখি সোফায় বসে আছেন। প্রথমে একটু হোঁচট খেয়েছিলাম সাথে লজ্জা। আমাকে আসামি হাজির করার মতো করে দাঁড় করানো হয় আর্টের শিক্ষকের সামনে। লজ্জায় সেদিন মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। ঠিক হয় প্রতি শুক্রবার আমাকে দুই ঘণ্টা করে ছবি আঁকা শেখানো হবে। সম্মানিটাও বেশ কম। সব কিছু মিলিয়ে যা ছিল মায়ের অনুকূলে। সেইদিন আমাদের নীরব ঘরটা বেশ সরব হয়েছিল। মা তার সাথে অনেক গল্প করছিল, ইন্টারভিউ নেওয়ার ছলে। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম মায়ের আপত্তিহীনতায়। তবে খুশি, ভয়, শঙ্কা সব যেন সেইদিন একসাথে এসে ভর করেছিল। দু’দিন কীভাবে কাটে সেটা লিখে বা বলে প্রকাশ করা যাবে না। না চাইতে বৃষ্টির মতো, বৃহস্পতিবার বিকেলে ছোট চাচার সরু চোখের চাহনী উপেক্ষা করে একটা ইজেল, কিছু রং, তুলি নিয়ে আমাদের চারতলা বাড়ির তিনতলায় এসে হাজির হয়। মায়ের হাতের চা আর কচি নিমপাতার পাকোড়া খেতে খেতে সেইদিন বলেছিল, আমি এই পাকোড়া খেতে প্রতিদিন আসতে পারবো? মা মিষ্টি হেসে সায় দিয়েছিল।

শুরু হয় আমার চিত্রকলায় তালিম নেওয়া। তালিম বলছি কারণ, ছবি আঁকাটা এত শৈল্পিকভাবে আমাকে শেখানো শুরু করে। আমি তো মুগ্ধ, সাথে মা-ও। তার কাছেই জানতে পারি, চিত্রকররা কীভাবে রংতুলির জাদুতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাদের অসাধারণ সৃষ্টিগুলো। অসংখ্য গল্প ও অনুভূতি সম্মিলিত ছবিগুলো তার বর্ণনায় আমার চোখে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কীভাবে একটি পাইন কাঠের টুকরোর ওপর মোনালিসার ছবিটি এঁকেছিলেন সেই গল্প। সেই রহস্যময় হাসি নিয়ে নানাজনের নানা মত। ভিনসেন্ট ভ্যান গগের পাগলামি, তার কান কাটা। পৃথিবীর দামি কয়েকটি শিল্পকর্মের মধ্যে ভিনসেন্ট ভ্যান গগের স্টারি নাইটের কথা। জীবদ্দশায় যার ছবি বিক্রি হয়েছিল মাত্র চারশ ফ্রাঙ্কে, এখন সেগুলোর মূল্য ১৬শ ডলারের সমান। শিল্পীর অনাদর আমাকে কুঁড়ে খায়। তাই তো সেই গল্প শুনতে শুনতে কেঁদে ফেলেছিলাম মনের অজান্তে।

সেই রাতে হাসতে হাসতে সে আমায় বোকা বলেছিল। ডাচ চিত্রশিল্পী জোহানস ভারমিয়ারের আঁকা বিখ্যাত তৈলচিত্র গার্ল উইথ অ্যা পার্ল ইয়ারিংয়ের গল্প শুনে মনে হয়েছিল আমাকে নিয়ে এমন একটি ছবি সে কেন আঁকে না। সাথে ক্ষ্যাপাটে পাবলো পিকাসোকে নিয়ে নানা কথা। আমার অবাক লাগতো, একটা মানুষ এত কিছু জানে কীভাবে? মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর শক্তিমান সুন্দর দেহাবয়বে আদর্শ পুরুষাকৃতির ডেভিড ভাস্কর্যটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কেমন লাগছে? আমি কিছুটা লজ্জা পেয়েছিলাম, তাই তো উত্তর দিতে পারিনি নিজের অপরিপক্বতার কারণে।

ধীরে ধীরে আমাদের সময়গুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, আমাদের আন্তরিকতা দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকে। সাথে মায়ের পাকোড়া খাওয়া। আশপাশ থেকে নানারকম ফিসফিসানি শুরু হয়। মা ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যায়। ছবি আঁকা ধীরে ধীরে আমার অস্থিমজ্জায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে। গভীর রাতে ছবি আঁকার নেশা পেয়ে বসে আমায়। এক রাতে ঝোঁকের মাথায় এঁকে ফেলেছিলাম, পালতোলা কিছু নৌকা সুদূরে যেতে যেতে আকাশে মিশে গেছে। পরদিন বিকেলে তুলির আরও একটু আঁচড় টানতেই আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছিল ছবিটা। মা বাড়ি ফিরে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় ছবিটা দেখে। মেয়ের ছবি ফ্রেমে বাঁধাইয়ের জন্য দোকানে ছোটে। সুযোগসন্ধানী আমি সুযোগ বুঝে সেদিন মাকে বলেছিলাম, চারুকলায় পড়তে চাই। আমাকে নিয়ে উচ্চাশা ছিল যে মানুষটার; সে একবাক্যে সেদিন রাজি হয়ে যায়। ইচ্ছেপূরণের সায় মেলে। তার সান্নিধ্য, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ইচ্ছেপূরণের অঙ্গিকার। আমার চারপাশটা আরও বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। পরীক্ষা কাছাকাছি চলে আসায়, মা রংতুলি নিয়ে নাড়াচড়া বন্ধ রাখতে বলে কিছুদিনের জন্য। মনটা খারাপ হলেও মায়ের কথা মেনে নিয়েছিলাম কোনোরকম আপত্তি না করে।

পরীক্ষা শেষ হয়, আমি আবার ছবি আঁকা শুরু করতে চাই। এবারে মায়ের অন্যরূপ, বাহিরে কোনো স্কুলে গিয়ে শিখতে হবে। ওদিকে আমার মনের ভেতর বসত করা সেই মানুষটার নতুন চাকরি হয়েছে। আগের মতো সময় দিতে পারবে না জানায়। আমি বুঝি, তবে মনটা বড্ড অবুঝের মতো আচরণ করে। আমার রংতুলির প্রতিটি আঁচড়ে যে তাকে চাই। সেটা কাউকে বোঝাতে পারি না। চিত্রশিল্পী হওয়ার ইচ্ছে মরে যায়। অন্ধকারে তার অবয়ব আর খুঁজে পাই না, ফোনে কথা হয় না। মাকে বলতে গিয়েও বলতে পারি না, আমি প্রেমে পড়েছি!

কদিন আগে টিএসসিতে গিয়েছিলাম ক্লাসের বন্ধুদের সাথে ঘুরতে। হঠাৎ বৃষ্টি নামে, ঝুম বৃষ্টি। টিএসসির বারান্দায় ভিড়ের মাঝে নিজেকে কেমন যেন একা লাগে। কল্পনা এসে চোখে মিশে যায়। মনে হয় সেই মানুষটা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। খুশিতে আত্মহারা হওয়ার আগে দেখতে পাই, দূরে মায়ের সাথে একজন। আলুথালু হয়ে রিকশায়। পলিথিন না থাকায় দুজনই ভেজা কাক। বৃষ্টি থামে, আমি সিনজিতে বাসায় ফিরে আসি। আমি ফেরার কিছু সময় পরে মা আসে, মায়ের চোখেমুখে সুখরেখা দেখা যায়। ভালো লাগে না আমার। মায়ের সাথে কথা হয় টুকিটাকি। সেই রাতে অনেক বৃষ্টি হয়, বৃষ্টির সাথে ঝড়। প্রকৃতির সাথে সেদিন আমার বড্ড বেশি মিল ছিল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি, প্রকৃতি কতটা ডামাডোল করেছে আশপাশটায়। নিমগাছের বড় একটি ডাল ভেঙে আমাদের বারান্দার গ্রিলে একটু আশ্রয় প্রার্থনা করছে। আমাদের আশ্রয় উপেক্ষিত হলেই অপমানে মাটিতে নেমে আসবে। আকাশের কাজল মেঘ সরিয়ে সূর্য উঁকি দিতে চলে এসেছে একটু আগে। বারান্দার লেবু পাতা ছিঁড়ে চা বসাই। মা তখনো বিছানায়। বুঝতে পারি মায়ের আজ বাহিরে যাওয়ার তাড়া নেই। কিছু সময় পরে হঠাৎ বাবা এসে হাজির। গালভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি। পায়ের বুড়ো আঙুলটায় ব্যান্ডেজ। বাবাকে দেখেই আমি দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরি, কোনো কিছু না ভেবেই কেঁদে ফেলি। কারণ আমার পালাতে ইচ্ছে করে মায়ের কাছ থেকে, দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে। জীবন থেকে পালাতে ইচ্ছে করে। বাবাকে চা দিয়ে নোট আনার ছলে বের হই। প্রথমে যাই তিতিরদের বাসায়। ওদের বাসাটা একটু অন্যরকম, কেউ কারো খবর রাখে না। কে এলো কে গেলো। যেন কেউ কারো নয়, যোজন যোজন দূরত্ব ওদের বাসার প্রতিটা মানুষের মাঝে। আমাদের ঘরে আগে অনেক সুখ লুটোপুটি খেতো। এখন সব চন্দ্রবিন্দু।

ফেরার পথে সব আয়োজন গুছিয়ে ফিরে আসি আমাদের উকিলবাড়িতে। এসে দেখি আমাদের বসার ঘরটা লন্ডভন্ড। এক কর্নারে দাঁড়িয়ে মা কাঁদছে। বাবা চিৎকার করছে আর একটা একটা করে জিনিস আছাড় মারছে। বুঝতে পারি মায়ের ব্যাপারে কেউ হয়তো নোংরা কিছু বলেছে বাবাকে। যা বাবা সহ্য করতে পারেনি। আমি বাবাকে তখন বলতে পারি না, ‘বাবা তোমার আর আমার চক্ষুশূল একই ব্যক্তি’। কিছুক্ষণ পরে বাবা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। মা চলে যা শোবার ঘরে। আমাদের বাড়িটা নীরব হয়ে পড়ে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে, বাবার অপেক্ষায় মা বারান্দা ঘরে ছোটাছুটি করে। মায়ের অস্থিরতা দেখে আমার আনন্দ লাগে। মনে হয় শোধ নেওয়া হচ্ছে আমার।

তারপরেও বারান্দায় অনেকটা সময় বসে থাকি। সেই অবয়বটা নিয়ে ভাবি, কেন এমন হলো। আমার অনেক অভিমান হয়, রাগ হয়। মায়ের ডাকে ঘরে ফিরে আসি, একসাথে ভাত খাই। মা কোনো কথা বলে না আমার সাথে। চোখে মুক্তদানার মতো জল এসে জমে। চোখে আঙুল দেওয়ার ছলে মুছে ফেলি। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি চোখ দুটো টকটকে লাল। ফর্সা নাকের চারপাশটা লালচে। যেন অনেক রক্ত কণিকার সমাবেশ আজ ওখানটায়। আমার চোখে চোখ পড়ার পরে মা বেশ নির্লিপ্তভাবে বলে, কাজটা তুমি ঠিক করোনি। আমাকে বলতে পারতে। অপরিচিত লাগে চিরচেনা মাকে। খাওয়া শেষে মা টিভির রিমোট নিয়ে বসে পৃথিবীর এমাথা ওমাথার খবর নিতে। কিছুক্ষণ পরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পাই। খুলেই দেখি বাবা। হাসি দিয়ে ঘরে ঢোকে। হাতে তিনটা বিরিয়ানির প্যাকেট। এসেই হইচই শুরু করে স্বভাবসুলভ। মায়ের সাথে আহ্লাদ শুরু করে, যেন কিছু হয়নি দুপুরে। তিনজন আবার খেতে বসি। যেন সব কিছু আবার আগের মতো।

সেই রাতে আমি ইজেল, রং নিয়ে বসি। বাবা টিভির রিমোট নিয়ে। মা আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেও বাবাকে স্বাভাবিক দেখে যে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল, আমি টের পাই। মধ্যরাতে ছবিটা আঁকা শেষ হয়। নীল অপরাজিতার কান্না। আঁকার পরে দুই চোখে যেন জোয়ার আসে। সব কিছুর জন্য কষ্ট হয়। মায়ের একাকিত্বের সাথে সেই মানুষটা, তাকে হারানো। বাবা উপর রাগ হয় তার বৈরাগ্যের জন্য। তিনি স্বাভাবিক হলে হয়তো আমাদের পরিবারটা ছোট চাচার পরিবারের মতো হতো। বারান্দা থেকে ফিরে এসে দেখি বাবা পাশের ঘরে ঘুমিয়েছে। আমি মায়ের পাশে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকি। মার নির্লিপ্ততায় ঘুম আসে না। আজান শুনে মা বাথরুমে যায়, আমি টের পেয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে ঘুমের ভান করি। হঠাৎ মায়ের চিৎকারে লাফিয়ে উঠি। আমার বাবা ঝুলন্ত ফ্যানের সাথে। আমার মুহূর্তে শ্বাসটান ওঠে, বাম পাশ প্রথমে তারপর পুরো শরীর ভারী হয়ে আসে। কষ্টগুলো পাঁজর ছিঁড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে চায়। মা জ্ঞান হারায়। ছোট চাচা ছুটে আসে। বাবাকে নামানো হয় মাটিতে, তাকিয়ে দেখি বাবা একরাশ অভিমান নিয়ে অন্ধকার ঘরে নীরবে শুয়ে আছে। আমি ভাবতে ভাবতে চিন্তার অতলে তলিয়ে যাই। যখন জ্ঞান ফেরে; তখন দেখি মা কাঁদছে। সময় এগিয়ে যায়। আমি একটা সময় ঘর ছাড়ি, মায়ের উপর রাগ ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে। ছবি এখন আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন।

জেগে থাকলে নিঃসঙ্গতার মাঝে বাবার মৃত্যুটা আমার ভাবায়। মায়ের কোনো খবর রাখি না এখন। মাঝে মাঝে স্বপ্নে একটি মিষ্টি রোদের বিকেল আসে আমার কাছে, বাবা আর আমি ছুটছি। দূরে দেখি কিছু কচি নিমপাতার পাকোড়া আর চা, সাথে দুজন প্রিয় মানুষের নিষিদ্ধ আলিঙ্গন। ঘুম ভেঙে গেলে কষ্টে নীল হই। স্বপ্নটাকে নিয়ে আঁকতে বসি আমার ক্যানভাস...

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]