মালয়েশিয়া
মাই সেকেন্ড হোম: দ্বিতীয় ঠিকানা হলেও মিলবে না নাগরিকত্ব
মালয়েশিয়ায় বসবাসের স্বপ্ন পূরণে ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ (এমএমটুএইচ) কর্মসূচি বিদেশিদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। তবে এই কর্মসূচিকে ঘিরে নাগরিকত্ব পাওয়ার গুঞ্জন বা বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। এ কথা আবারও পরিষ্কার করে জানালেন দেশটির পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রী দাতুক সেরি টিয়ং কিং সিং।
সংসদে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এমএমটুএইচের মাধ্যমে কোনোভাবেই মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ নেই।
দেওয়ান রাকিয়াতে মঙ্গলবার মৌখিক প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রী জানান, এমএমটুএইচ মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ভিজিট পাস কর্মসূচি। এর আওতায় বিদেশিরা মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা সুবিধা নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মালয়েশিয়ায় বসবাস করতে পারেন। তবে এই সুযোগের সঙ্গে নাগরিকত্ব বা স্থায়ী রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কোনো যোগসূত্র নেই।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ পর্যন্ত এমএমটুএইচ কর্মসূচির আওতায় কাউকে নাগরিকত্ব দেওয়ার কোনো নজির নেই।
মন্ত্রী আরও ব্যাখ্যা করেন, অনেকেই মাই পিআর (মাইপিআর) বা স্থায়ী বাসিন্দা মর্যাদাকে নাগরিকত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। বাস্তবে মাই পিআর-ও নাগরিকত্ব নয়; এটি এমএমটুএইচের কাঠামোর মধ্যেই থাকা একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ভিজিট পাস। এর মেয়াদ ৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। মাই পিআর চারটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত-প্লাটিনাম: ২০ বছর, গোল্ড: ১৫ বছর, সিলভার: ৫ বছর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল: ১০ বছর।

এই প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে মন্ত্রী আহ্বান জানান, পাসের ধরণ, সুবিধা ও মেয়াদ নিয়ে বিভ্রান্ত না হতে এবং জনসাধারণের মধ্যেও সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে।
ডুংগুন আসনের সংসদ সদস্য ওয়ান হাসান মোহাম্মদ রামলি (পিএন) প্রশ্ন তুলেছিলেন, এমএমটুএইচ কর্মসূচির কোনো আবেদনকারী কি কখনো নাগরিকত্ব পেয়েছেন? পাশাপাশি ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই কর্মসূচির আওতায় বিদেশিরা মালয়েশিয়ায় কতটি বাড়ি কিনেছেন, সে তথ্যও জানতে চান তিনি।
জবাবে টিয়ং কিং সিং-যিনি বিনতুলু আসনের সংসদ সদস্যও-পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এমএমটুএইচ কর্মসূচির ৭৪৪ জন অংশগ্রহণকারী মালয়েশিয়ায় আবাসিক সম্পত্তি কিনেছেন। শুধু তাই নয়, আরও ২ হাজার ৬৩৭ জন বর্তমানে বাড়ি কেনার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বিক্রয়চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং উপযুক্ত আবাসস্থল নির্বাচন।
দেশভিত্তিক তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে চীনা নাগরিকরাই শীর্ষে-মোট ৩০৪টি বাড়ি। এরপর রয়েছে তাইওয়ান (৯১), সিঙ্গাপুর (৬৩), যুক্তরাষ্ট্র (৪১), যুক্তরাজ্য (৪০) এবং হংকং (৩৪)।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়া (২৯), বাংলাদেশ (১৯), দক্ষিণ কোরিয়া (১৫), ইন্দোনেশিয়া ও জাপান (১৪) নাগরিকরাও এমএমটুএইচ কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় আবাসন কিনেছেন বলে জানান তিনি।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট-এমএমটুএইচ কর্মসূচি মালয়েশিয়ার আবাসন খাতকে চাঙা করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তবে মন্ত্রী আবারও মনে করিয়ে দেন, এই অর্থনৈতিক ও পর্যটনবান্ধব উদ্যোগের লক্ষ্য কখনোই নাগরিকত্ব দেওয়া নয়। বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে বিদেশিদের বসবাস ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে দেওয়া এই বক্তব্য এমএমটুএইচ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও ভুল ধারণা দূর করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে প্রবাসী ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি পরিষ্কার বার্তা। মালয়েশিয়াকে ‘দ্বিতীয় ঘর’ হিসেবে বেছে নেওয়া গেলেও, নাগরিকত্বের প্রশ্নে দেশটির অবস্থান অপরিবর্তিত ও কঠোর।
এমআরএম/এমএস