চাঁন-পরীর সংসার

মাঈন উদ্দিন আহমেদ
মাঈন উদ্দিন আহমেদ মাঈন উদ্দিন আহমেদ , কবি ও কথাশিল্পী
প্রকাশিত: ০৮:১৬ এএম, ০৩ এপ্রিল ২০২৩

এদিকে দুঃখটাকে চিরন্তন ভেবে দাঁতে দাঁত কামড়ে পনেরো বছর ধরে টিকে আছে চাঁন-পরীর সংসার। দুঃখের বিশ্রামকালে সুখের সঙ্গমের ফসল মাত্র তিনটে জীবন। শান্তি তবু ফেরেনি ওদের।

ভাতের প্লেট হাতে নিয়ে চাঁন মিয়া ভাষণ ছাড়ে বাঘের স্বরে, ‘মাইন্দারের ঝি, রান্দোনের কালে তোর মন থাকে কই, লবণ কি তোর বাপে দিবো?’
ছোট মেয়েটি বাপের গলা ধরে বলে, ‘বাপজান, মাইন্দার মানে কী?’
রাগে ফেঁটে পড়া চাঁন মিয়া মেয়ের হাত সরিয়ে নিয়ে নিষ্পাপ গালে মারে এক থাপ্পড়! বর্বর শব্দের তীব্রতা ভাঙাচোরা বেড়া ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে উঠোনের ব্রাত্য বাতাসের বুকে।
স্বামীর কাণ্ড দেখে পরী কেঁদে ফেলে ব্যাঙের মতো। দম নিয়ে নিয়ে বলতে থাকে, ‘লবণ কেনোনের মুরদ নাই। গোলামের পো গোলাম, পারে খালি আমার লগে।’
বাক্য সমাপ্তির আগেই পরপর তিন ফোঁটা নোনাজল ঝরে পড়ল গতকাল লেপা মাটির মেঝেতে। নোনাজলের আকার ননি গোসাইয়ের রসগোল্লার মতো। সুষম গোল। কারিগর নিখুঁত। মেঝেতে লেপা কাঁচা মাটির নকশা—অতীতে পরীর পিঠে পড়া থাপ্পড়ের দাগের মতো জাগ্রত। অথবা বর্ষা রাতের কামুক চাঁনের নরম নরম নখের আঁচড় যেরকম জেগে ওঠে স্নানজলের ঘোর ছলনায়।

ঠিক কোন ছলনার জালে আটকে পরী এখনো পড়ে আছে চাঁনের নাকাল সংসারে, তা নিজেও জানে না। হয়তো তিন সন্তানের মায়া মুখের মায়াজালে।
‘গোলামের পো গোলাম’ গালি শুনে চাঁন চেতে যায় ষাঁড়ের বেগে। বসা থেকে দাঁড়িয়ে স্টিলের পুরোনো ভাতের প্লেট আছাড় মারে ক্রোধ মিটিয়ে। প্লেটটা পাক খেতে খেতে থেমে যায় পরীর পায়ের কাছে। ততক্ষণে প্লেটের ঝনঝন শব্দে মুখর হয় ঘরের সমস্ত অন্ধকার। যেন বহুদিন বাদে ফের সাক্ষাৎ হলো পরিচিত ঝংকারের সঙ্গে। নিরীহভাবে দাঁড়িয়ে থাকা হারিকেনকে লাথি মেরে চাঁন মিয়া বেড়িয়ে যায় রাতের আঁধারে।
সন্তানদের কাছে এসব খুবই পরিচিত দৃশ্য। একই স্ক্রিপ্ট, একই সেট এবং একই অভিনেতা। বিনা দোষে লাথি খাওয়া হারিকেনের চিমনিতে ধরা পড়ে সূক্ষ্ম ফাটল। এর চেয়েও ভারী ফাটল পরীর অন্তরে। কৈশোরের প্রেমের ক্ষতের মতো।

আরও পড়ুন: মোহাম্মদ রায়হানের গল্প: ভ্রমের অবন্তী

এসব তো মাসকাবারি ঘটনা। তবুও নিজেকে সংযত করতে পারে না পরী। নিষেধের দেওয়াল ভেঙে ফেটে পড়ে ক্রোধের বিস্ফোরণ। চাঁন মিয়ার চলে যাওয়া পথ ধরে পরীর চোখে নেমে আসে অশ্রুর নহর। চির দুঃখের নদীতে যেন চলছে ভরা জোয়ার। থৈ থৈ দুঃখের ভরাট মঞ্চ।
বড় ছেলে হেলাল মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘বাপের গায়ে এত্ত জিদ ক্যা, মা?’
ছেঁড়া শাড়ির নরম পাড়ে চোখ মুছতে মুছতে পরী জবাব দেয়, ‘যেই ব্যাডা দুনিয়ার কঠিন দরবারে দুর্বল, হ্যায় সবল খালি ঘরের বউয়ের লগে।’
কথাটি হেলালের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল, ঠিকঠাক কিছুই বুঝলো না। তারপর ঘরে আর কোনো কথা শোনা যায়নি। যেন কথার ওপর কারফিউ। নির্মম নীরবতা।
থালা-বাসন গুছিয়ে পোলাপান নিয়ে শুয়ে পড়ে পরী। পেটে তার ক্ষুধা আছে ঠিকই কিন্তু খাওয়া হলো না স্রেফ রাগের বশে। চাঁন মিয়া যে আজ রাতে আর ঘরে ফিরবে না, সেটা পরী ভালো করেই জানে। নিখাদ পূর্ব অভিজ্ঞতা। তাই ভাঙা দরজায় খিল দিয়েছে খানিক আগে। দরজার ভাঙা কাঠ দিয়ে অন্ধকার আর বাতাসের সহজ যাতায়াত।

নভেম্বরের শীত মোকাবিলার জন্য একটি মাফলারই যথেষ্ট চাঁন মিয়ার। খরগোশ সাইজ কানে মাফলারটা পেঁচিয়ে নেয় চাঁন। অন্ধকারে কোনো ভয় নেই ওর। দুই হাত কুঁকড়ি দিয়ে ফাত-ফাত হেঁটে চলে গ্রামের উত্তরে। রাড়ী বাড়ির সামনে এসে ডাক ছাড়ে, ‘এমদাত! এ... এমদাইদতা।’
তিন বারে সাড়া পেয়ে চাঁন নিচু স্বরে বলে, ‘প্যাকেট-পুকেট সব লইয়া আয়।’
দুজন বেরিয়ে পড়ে। এমদাদের হাতে টর্চ লাইট। খানিক বাদে যুক্ত হলো আরও চারজন।

ছয়জন চলে যায় গোপন আস্তানায়। ওদের কাছে স্বর্গের মতো। সেখানে এখনই বসাবে স্বপ্নের আসর। জুয়ার আসর। চারজন খেলোয়াড়, দুজন দর্শক। চাঁন, এমদাদ, পিন্টু আর গণি বসে পড়ে পজিশনে। চাঁন মিয়ার আজ রক্ত গরম, তড় সয় না কোনোরকম। গণিকে তাড়া দিয়ে চাঁন বলতে থাকে, ‘প্যাকেট খোল, জোকার সরা, ক্রস মার, তাস দে।’
চাঁনের চরম উত্তেজনা দেখে পাশ থেকে তাহের বলে, ‘এত্ত উতলা ক্যা, কাকা! সবুর করেন।’
ঘাড় ঘুরিয়ে চাঁন বলে, ‘আরেহ কোনো সবুর-টবুর নাই, মাথা গরম আছে!’
তাহের আবার বলে, ‘মাথা ঠান্ডা করেন কাকা, মাথা গরম থাকলে তো জেত্তারবেন না।’
চাঁন এবার বলে, ‘আজকে আমার কোছা ভারী, আজকেও যদি হারি তাইলে আর কোনোদিন ঘরে যাইমু না, বউয়ের কসম।’
সবাই সামান্য হেসে উঠলো। ততক্ষণে তাসের বণ্টন শুরু হয়ে গেছে। টাকা হাকানোর পালা এবার। আরেক পাশে গাঢ় মনোযোগে গাঁজার রকেট সাজাচ্ছে জালাল। খেলা চলছে, গাঁজা ডলছে, গান চলছে ভান্ডারি। আর দেখছেন দয়াল কাণ্ডারি।

আরও পড়ুন: আজ তানিয়ার বিয়ে

কান্নাকাটি আর হা-হুতাশের নিত্য পরিচিত পাঠ চুকিয়ে সন্তানদের নিয়ে একই বিছানায় ঘুমিয়ে আছে পরী। ঘুম হলো পার্থিব দুঃখ উপেক্ষার মোক্ষম সময়। মাঝরাতে পরী খোয়াব দেখে—একটি দুধেল সাদা গাভি উঠানের আমড়া গাছের নিচে বসে আছে। উঠানজুড়ে দৌড়াদৌড়ি করছে একটি লাল বাছুর। সেই দৃশ্য দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছে পরী। তখনই শুরু হলো বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টি! সাথে দমকা বাতাস। বাতাসের দাপটে ভেঙে যাচ্ছে নিমের নরম ডাল।
আচমকা পরীর ঘুম ভেঙে যায়। দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে শীতল অন্ধকার। আবছা আবছা মনে পড়ে খোয়াবের দৃশ্য। ভাবতে ভাবতে আবারও ঘুমিয়ে পড়ে পরী।

রাত এগিয়ে চলে নিয়মের তাড়নায়। কিছুক্ষণ পরে দরজায় টোকা পড়ে, শান্ত স্বরে ডাক আসে, ‘পরী... ও পরী?’
পরীর কান পাতলা ঘুম। প্রথম ডাকেই সজাগ হয়ে যায়। উঠে বসে বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কেডা? এত রাইতে কেডা?’
বাহির থেকে উত্তর আসে, ‘আমি তোমার চাঁন। দরজা খোলো জান!’
চাঁন মিয়ার এমন সহজ গলা এর আগে খুব বেশিবার শোনেনি পরী। অনুমান আর অভিজ্ঞতার খাতিরে অন্ধকারে হারিকেন জ্বলে উঠলো। দরজা খোলার শব্দে মেয়েটার ঘুম ভেঙে গেল। বাহিরে চাঁনের সঙ্গে লাইট হাতে এসেছে তাহের।
তাহেরকে বিদায় দিয়ে গড়গড় করে ঘরে ঢোকে চাঁন মিয়া। হাসতে হাসতে বউকে বলে, ‘দরজা লাগায়া এদিকে আহো। আজকে জিতছি! সাড়ে সাত পঞ্চাশ হাজার জিতছি!’
পরী খুশি হলো কি না, তা অস্পষ্ট রয়ে গেল। পরী জিজ্ঞেস করল, ‘খেলোনের টাহা পাইলেন কই?’
টাকাগুলো গুনতে গুনতে চাঁন জবাব দেয়, ‘এহন আর কইয়া লাভ নাই। তুই চাউলের ড্রামে গয়না রাখছিলি না! হেইগুলাই বেইচা দিছি গত হাটে। মনে করছোস আমি জানমু না! হা হা। বিশ হাজারে সাড়ে সাত পঞ্চাশ আইলো!’
কথা শেষ হতে না হতেই চাঁনের গলা চেপে ধরে পরী। ক্রুদ্ধস্বরে বলে, ‘মাইন্দারের পো মাইন্দার, আইজ্জো তোরে খাইছি।’
ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে পড়ে হেলাল আর দুলাল। বাপ-মায়ের লড়াই থামাতে দুজনই বিছানা থেকে উঠে পড়ে। তখনই ছোট মেয়েটা আবার জিজ্ঞেস করে, ‘মা, মাইন্দার মানে কী?’
ওর কাছে যেন ‘মাইন্দার’ শব্দটা বিরাট বিস্ময়ের নাম।

আরও পড়ুন: ফাত্তাহ তানভীর রানার গল্প: জল সংকট

চাঁন-পরীর সংসারে নিয়মমাফিক গৃহযুদ্ধ। ধরাবাঁধা রুটিন। দফায় দফায় আক্রমণ। হেলাল আর দুলালের আপ্রাণ চেষ্টায় এ যাত্রায় অল্পতেই যুদ্ধ থেমে গেল। হেলাল-দুলাল বড় হওয়ার পর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত এখন। যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে ওরা এখন ভীষণ অভিজ্ঞ। শান্তিতে সংসারে বলীয়ান। জাতিসংঘের মহাসচিবকেও হার মানায়। সন্তানদের বাধার কারণে বউকে মেরে আগের মতো মজা পায় না চাঁন। যেন নিজের সন্তান বিভীষণ! সেজন্য অন্তরে তার ক্রোধের আগুন। রাগের মাথায় আর কোনো উপায় না পেয়ে টাকাগুলো সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় চাঁন। উদ্দেশ্যহীন পথচলা মাঝরাতের অন্ধকারে। কোথায় গিয়ে থামবে তা কেবল নিয়তিই জানে।

সেই রাতের পর—পরীর আকাশে চাঁন নিখোঁজ। দিন গড়িয়ে মাস চলে যায় কিন্তু চাঁন মিয়ার সন্ধান মেলে না। অপেক্ষার যাঁতাকলে কাবু হয়ে যাচ্ছে পরী। এক ঝগড়াটে বদমাশ জুয়ারুর অভাব খুবলে খায় কলিজা। অনুতাপের তীরে এফোঁড়-ওফোঁড় বুক। সকল মোনাজাতে একই চাওয়া—চাঁন তবু ফিরে আসুক।

এসইউ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।