চারপাশে থেকেও কেউ নেই

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:১১ পিএম, ২৭ জানুয়ারি ২০২১

ফাত্তাহ তানভীর রানা

‘তোর অবস্থা বুঝি। তুই আগামী সপ্তাহে একবার আয়, তোকে নিয়ে আসলাম ভাইয়ের কাছে যাব। উনার কাছে গেলে একটা ব্যবস্থা হবে। আমার কথা বুঝিস তো! ছেলেটা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়ছে। ওর মায়ের বড্ড শখ ছিল। ঢাকায় থাকি, তুই তো সব বুঝিস। আমার আশা ছাড়।’

এর মধ্যে ল্যান্ড ফোনে একটা কল এলো। উনি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে উঠে চললেন। যাবার সময় বললেন, ‘বন্ধু সময় না দিতে পারলেও তুই কিছু মনে করিস না; খেয়ে যাস। বিদেশি বায়ার আসবে; এই সপ্তাহে আমি খুব বিজি আছি।’

রাজ কথাগুলো শুনল। বন্ধুর সুন্দরী পিএ এসে রাজকে পাঁচশত টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘স্যার আপনাকে দিতে বলেছেন।’

রাজের পরিচিত মহলকে রাজের খুবই অপরিচিত মনে হচ্ছে; ইদানীং অনেকেই তার মোবাইল ফোন ধরছে না। ঢাকায় রাজের থাকাটা অসম্ভব হতে চলেছে। অফিস থেকে বলে দিয়েছে বিনা বেতনে ছুটিতে যাওয়ার জন্য!

রাজ তার মাথায় একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলো।

গ্রামে রাজের বৃদ্ধ মা আর অবিবাহিত বোন রয়েছে। রাজের কৃষক বাবা এক দশক আগে পরলোক গমন করেছে। ঢাকায় রয়েছে রাজের স্ত্রী আর নাবালক দুটি সন্তান। গতকাল রাজ তার একজন প্রিয়ভাজন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতার কাছে গিয়েও দেখা করতে পারেনি। বিষয়টি রাজকে খুবই ভাবিয়ে তোলে।

সংসার জগতে প্রবেশ করে মানুষ কতটা অচেনা হয়েছে! মানুষের চাহিদার শেষ আছে? অবশ্য রাজের এ মুহূর্তে খুব বেশি চাওয়ার নেই; দেখা যাক রাজের কি প্রাপ্তি ঘটে।

২.
রাজ একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছে, কোম্পানির নাম ভালো হলেও বেতন তেমন ভালো নয়। তবে যা বেতন পায় তা দিয়ে তিলোত্তমা নগরী ঢাকায় পরিবার নিয়ে চলে যায় আর কি।

রাজ অভাবি পরিবারেই বেড়ে উঠেছে। অনেক কষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে সে বি.কম সম্পন্ন করেছিল। রাজদের সময়ে গ্রাজুয়েট করা ছাত্রের পিলু হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ ছিল। সেই সময় ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যেত। তাই শিক্ষাজীবন শেষ করতে তাদের অনেকটা সময় লাগতো। জামিল আক্তার রতন যখন খুন হয়; তখন রাজ কলেজের ছাত্র ছিল। আন্দোলন তখন তীব্র! একজন মেডিকেল স্টুডেন্টের মৃত্যু রাজকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিল।

রাজ ছোট থেকেই রাজনীতি সচেতন ছেলে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম অংশ হয়ে গিয়েছিল। রাজ কোন ছাত্র নেতা ছিল না। কিন্তু সে মনে-প্রাণে গণতন্ত্র কায়েম চেয়েছে। সে রাশিয়ার সেই বইগুলো কখনো কিনে, কখনো বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে পড়তো। শোষণ-নিপীড়ন মুক্ত একটা সমাজ ব্যবস্থা রাজের স্বপ্নে ধরা দিতো। রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবেও অনিয়মিত কাজ করতো। লেখালেখি ও একটি পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিল। এখন রাজ অসুস্থ; ডাক্তার দেখিয়েছে। আরও ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার। ভালো ডাক্তার দেখাতে হলে মোটা টাকারও প্রয়োজন!

রাজ পল্টন এলাকা থেকে মালিবাগ যাচ্ছে, ‘হুম, জামান ভাই! অনেক দিন পর! একসাথে কত মিছিল করেছি।’

৩.
জামান ভাইয়ের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না, গাড়ি ছিল বিক্রি করে দিয়েছে। এখনো অনেক ব্যাংক লোন! যা-ই হোক, অনেক দিন পর দু’জনই অনেক গল্পে মেতে উঠলো। জামান ভাই রাজকে কিছু পরামর্শ দিয়েছে; সেই পরামর্শ নিয়ে রাজ আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে যাবে। পেছনে ফেরার সুযোগ রাজের নেই!

বেলা পড়ন্ত; রাজ শরীরে ক্লান্তি বোধ করছে। সে বাড়ি ফিরে গেল। কয়েক দিনের ভেতর পরিবারকে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো দরকার। বাসাটাও ছেড়ে দিতে হয়েছে। চাকরি থেকেও নেই! বিনা বেতনের চাকরি। ঢাকায় থেকে আর কী লাভ? তবে রাজকে আরও কিছুদিন ঢাকায় থাকতে হবে। দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে হবে। রাজের কি রোগ হয়েছে সে জানে না। রোগের নাম শুনলেও ভুলে গেছে দুর্বোধ্য সেই রোগের নাম। রাজের স্ত্রী সব জানে; রাজ শুধু জানে চিকিৎসায় প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টাকার প্রয়োজন!

৪.
- তোমাকে মিছিলে দেখেছি মনে হচ্ছে। ক্যাম্পাসে আমি পরেও অনেকবার গিয়েছি।
- জ্বী ভাই, আমি রিমুদের সাথে মিছিল করতাম।
- এই দেখ, তুমি আরেক কথা মনে করিয়ে দিলে। রিমুর মৃত্যু আমাদের খুব ভাবিয়েছে। আমি তখন জীবন নিয়ে শঙ্কায় ছিলাম। কী করব ভেবেই পাই না! যাই হোক; মিনিস্ট্রিতে পাস দিয়েছে কে?
- বাবর ভাই।
- বাবর অন্য ছাত্র সংগঠন করলেও আমার খুব ঘনিষ্ঠজন। বাবর এখন কী করছে?
- তেমন কিছু না; ছোট একটা ব্যবসা।
- ও আচ্ছা। একসময় ভালোই জমিয়েছিল। অনেক দিন যোগাযোগ নেই। যাই হোক, তোমার বিষয়টি জটিল; সবাইকে নিয়ে বসতে হবে। আমি একা কী করতে পারি? মিনিস্ট্রির বাইরে কোর্টসহ অনেক জায়গায়ই আমাদের ভাই-বেরাদার রয়েছেন। তাদের আমি বলবো। তুমি কি তোমার সাবজেক্ট অথবা অ্যালামনাইয়ের কাউকে বলেছ?
- না, সভাপতি বড় ব্যবসায়ী আর রাজনীতিও করেন; তিনি কি আমার সাথে কথা বলবেন?
- কথা বলবেন না কেন? আমি বলে দেব।
- ঠিক আছে ভাই। সাবজেক্টের বন্ধু-বড় ভাইদের সাথেও কথা বলব।
- তুমি এটা রাখ (খাম ধরিয়ে দিলো)। আসলে এটা দিয়ে তোমার কিছুটি হবে না জানি; তবুও।
এরপর তিনি মিষ্টি হেসে বললেন, ‘এখন বাইরে অনেক ভিজিটর রয়েছেন। তুমি পরে একদিন এসো।’

রাজ বাইরে এসে মুক্তির স্বাদ পেল। মনে হলো, সে নতুন জীবনের সন্ধান পেতে চলেছে। এই গত পরশু দিন, সে গিয়েছিল সেই সময়ের পরিচিত এক সংসদ সদস্যের বাসায়; উনি নেই। উনি বিদেশে গিয়েছেন, কবে আসবেন তা-ও কেউ বললেন না। রাজের মন ভেঙে গিয়েছিল। আজ সে অন্ধকারে নতুন আলোর দিশা পেয়েছে।

তার সময়ের অনেক বন্ধুরা আজ অনেকেই বড় বড় পজিশন দখল করে রয়েছে। বিপদের দিনেই তো বন্ধুর পরিচয়। রাজের মহাবিপদের সময় সেসব বন্ধুদের পাশে চায়।

৫.
রাজকে ডাক্তার দ্রুত অপারেশনের তাগিদ দিচ্ছেন; সময় খুব কম। এমনই সময় রাজ একজন পরিচিত সাংবাদিকের কাছে গেল; আবেদন ছিল তার অসুস্থতা নিয়ে একটি মানবিক আবেদন অথবা ফিচার তৈরি করে পত্রিকায় প্রকাশ করার। রিপোর্টার তথ্য রেখে দিলো আর বললো, ‘এই ডেস্ক তার নয়! আর মানবিক আবেদন এত আসে তা বলার নয়!’ সে শুধু সংশ্লিষ্ট ডেস্কের ব্যক্তিকে অনুরোধ করতে পারে। সেই মানবিক আবেদনটি কখনো পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল কি-না রাজের জানা হয়নি।

৬.
ক্রমশই রাজের শরীর খারাপ হচ্ছে। এ খারাপ শরীর নিয়েই রাজ আরও বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলেছে। রাজ ঢাকায় অবস্থিত তার নিজ এলাকার বিভাগীয় কল্যাণ সমিতি, জেলা সমিতি, উপজেলা সমিতি, গ্রাজুয়েট অ্যাসোসিয়েশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়, হল ও সাবজেক্ট কেন্দ্রীক গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সাথেও কথা বলেছে। কেউই রাজকে বিমুখ করেনি, উপস্থিত যে যা পেড়েছে সাহায্য করেছে। সবাই দিয়েছে আশ্বাস আর অপেক্ষা করতে বলেছে। বলেছে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা বিষয়টি দেখছে। কিন্তু, শরীর কি কারো জন্য অপেক্ষায় থাকে? রাজ শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। রাজ বড্ড ক্লান্ত! সে বিশ্রাম চায়। সে কিছুদিন বন্ধুর মেসে ছিল; বন্ধুও বিরক্ত হচ্ছে!

রাজ ক’টা দিন গ্রামের বাড়িতে থেকে আবার ঢাকায় আসার পরিকল্পনা করলো। তার দুটি সন্তান, বৃদ্ধ মা আর স্ত্রী।

৭.
ভাঙা মন নিয়ে রাজ গ্রামে ফিরে এলো। গ্রামে প্রথম কিছু দিন ভালোই গেল। কিন্তু দুশ্চিন্তা রাজের পেছন ছাড়ছে না। চাকরি নেই, নিয়মিত চিকিৎসাও বন্ধ! শরীরে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেমো দেয়া বন্ধ হয়ে গেলে তীব্র যন্ত্রণা হয়। এমনিভাবে আর কত দিন?

বিধিকে অতিক্রান্ত না করে রাজ বিছানাগত হলো। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ রোগের চিকিৎসা আছে কি? ডাক্তার রোগীকে আপাতত ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। রাজ আর তার শরীর নিজ নিয়ন্ত্রণে নেই। রাজের স্ত্রী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হলো, তাতে রাজকে উঠানো হলো। রাজ শুধু ছোট গলায় বললো, তাদের সাথে যোগাযোগ কর; যারা তাকে পরে দেখা করতে বলেছিল। রাজের স্ত্রী তাদের কাউকেই চেনে না! প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘তুমি চুপ করো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো।’

অ্যাম্বুলেন্স চলছে, বসে আছে রাজের স্ত্রী আর ছোট বোন। গ্রামে মায়ের কাছে রইলো রাজের নাবালক দুটি সন্তান। রাজের সাথে রয়েছে গ্রামবাসীর দোয়া; রাজ বড় ভালো মানুষ।

এসইউ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]