মাঠে বাম্পার ফলন, বাজারে দাম নেই আলুর
আড়তে কেনা আলু ঢাকায় পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ছবি-জাগো নিউজ
- আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না
- হিমাগারে রাখার খরচ বেশি
- বিঘাপ্রতি ১৫-২৫ হাজার টাকা ঘাটতি
- দুই মৌসুমে ক্ষতি ১২০০-১৫০০ কোটি টাকা
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে দেখা গেলো, বগুড়ার মহাস্থানহাটে পাইকারি বাজারে আলুর স্তূপ। কিন্তু ক্রেতা নেই। ক্রেতার অভাবে অলস সময় কাটছে কৃষকদের।
কৃষকরা জানান, এই চিত্র শুধু আজকের নয়, প্রতিদিনের। এবার আলু চাষে বাম্পার ফলন হলেও দাম না পেয়ে হতাশায় দিন কাটছে কৃষকদের। লাভতো দূরের কথা, লোকসান গুনছেন তারা।
সদর উপজেলার শশীবদন্দী এলাকার কৃষক মিল্লাত হোসেন সকাল ৭টায় ২৩ মণ রুমানা পাকড়ি আলু নিয়ে হাটে আসেন। ৬ মণ ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বেলা ১১টা পর্যন্ত বাকি ১৭ মণ আলু পড়ে থাকে। একই অবস্থা কাহালুর পাইকড় ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহিমের। ২২ মণ আলু নিয়ে সকাল থেকে বসে আছেন। পাইকার না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না।
শিবগঞ্জের গুজিয়া শ্যামপুর গ্রামের সজিব হোসেন ১৬ শতক জমিতে চাষ করে পেয়েছেন ৪২ মণ আলু। কিন্তু তার উৎপাদন খরচই বাজার দরের চেয়ে বেশি। সঙ্গে ভ্যান ভাড়া ৫০ টাকা, মণপ্রতি তোলা ৩০ টাকাসহ হাটে আনতেই খরচ পড়ে প্রায় ৯০ টাকা। সেখানে দাম উঠছে মাত্র ২৮০-৩০০ টাকা। অথচ ৭০০-৮০০ টাকা মণ না হলে খরচ উঠবে না তার।

সদরের আকলাছে গ্রামের ওমর ফারুক ৩০ মণ আলু ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। সার, খৈল, পানি ও ওষুধের খরচ মিলিয়ে তার বিনিয়োগের টাকাই ওঠেনি। মহিষবাথানের কৃষক আবু কাসেম ভ্যানে বসে মাথায় হাত দিয়ে বলেন, ‘এ দামে আলু বেচে লাভতো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন।’
আরও পড়ুন: ধান-আলু-পেঁয়াজ-সবজি-সরিষার উৎপাদন বেড়েছে: কৃষি উপদেষ্টা
হাটে পাইকারি দরে রুমোনা পাকড়ি ২৮০-৩০০, ফাটা পাকড়ি ৩৫০-৩৮০, সাদা ২০০-২৫০, স্টিক ২৫০-২৭০ ও অ্যালুয়েট ৩০০-৩৫০ টাকা মণ দরে বেচাকেনা হচ্ছে। জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনুট এলাকার ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, গত কয়েক দিনে মহাস্থান ও পুনট হাট থেকে আলু কিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এখন আর কিনছেন না।
দেশে আলু উৎপাদনের বড় অংশ আসে উত্তরাঞ্চল (বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর) থেকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, সাম্প্রতিক মৌসুমে আবাদি এলাকা ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। ফলনও বেশি হয়েছে। কিন্তু বাজারে সেই সাফল্যের প্রতিফলন নেই। উৎপাদন বাড়লেও ন্যূনতম মূল্য সুরক্ষা না থাকায় কৃষকের আয় উল্টো কমছে।

উৎপাদন বাড়লেও সুরক্ষা নেই
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে বগুড়া, রংপুর ও জয়পুরহাট— এ তিন জেলায় আলুর আবাদ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষকের হাতে লাভতো আসেনি, উল্টো বেড়েছে ক্ষতির অঙ্ক। টাকার অংকে যা দেড় হাজার কোটির কাছাকাছি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে উৎপাদন ১০ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু গত দুই মৌসুমে পাইকারি দাম অনেক সময় ৮-১২ টাকা কেজিতে নেমে আসে, যেখানে উৎপাদন খরচ গড়ে ১৪-১৮ টাকা কেজি। এতে বিঘাপ্রতি গড়ে ১৫-২০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। আলু চাষে জেলাজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ ৪০০-৫০০ কোটি টাকার মধ্যে।
জয়পুরহাটে ২০২২-২৩ মৌসুমে উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা ছয় লাখ টন ছাড়ায় এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রায় ছয় লাখ ৩০ হাজার টনে পৌঁছে। কিন্তু দাম ৯-১১ টাকা কেজিতে নেমে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি কৃষকের ক্ষতি হয় ১৮-২৫ হাজার টাকা। জেলা পর্যায়ে মোট আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক ৩০০-৪০০ কোটি টাকার ঘরে।
আরও পড়ুন: আলু চাষিদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে: কৃষি উপদেষ্টা
রংপুর জেলায় ২০২২-২৩ মৌসুমে উৎপাদন ছিল প্রায় সাত লাখ ৮০ হাজার টন। পরের মৌসুমে তা আট লাখ ৬০ হাজার টনে উন্নীত হয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে উৎপাদন ৯ লাখ টনের কাছাকাছি হয়। কিন্তু একইভাবে দাম পড়ায় বিঘাপ্রতি ১৫-২২ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘাটতি হয়েছে। জেলাজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০-৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
সবমিলিয়ে তিন জেলায় গত দুই মৌসুমে আলুতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১২০০-১৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ঘুরছে। উৎপাদন বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ, কিন্তু বাজার সুরক্ষা না থাকায় সেই সাফল্য কৃষকের আয় বাড়াতে পারেনি। বরং ভালো ফলনের বছরেই লোকসানের বোঝা আরও ভারী হয়েছে।
আজিজুল হক কলেজের সাবেক শিক্ষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ আবু জাফর বলেন, ‘রাষ্ট্র উৎপাদনে সক্রিয়, কিন্তু বাজার সুরক্ষায় প্রতিক্রিয়াশীল। ফলে চক্রটি দাঁড়ায় এমন ভালো ফলন, অতিরিক্ত সরবরাহ, দাম পতন, লোকসান, ঋণের বোঝা। তারপর আবার প্রণোদনা নিয়ে একই পথে হাঁটা। এ সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র ধরা পড়ে বিঘাপ্রতি হিসাব কষলেই।’

মাঠপর্যায়ের কৃষক ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে এখন গড়ে ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে শুধু বীজেই লাগে ২৫-৩০ হাজার টাকা। সার ও কীটনাশকে যায় আরও ১৫-১৮ হাজার। রোপণ থেকে নিড়ানি ও উত্তোলন পর্যন্ত শ্রম ব্যয় ১২-১৫ হাজার টাকার কম নয়। সেচ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় লাগে আরও ৮-১০ হাজার টাকা। এরপর পরিবহন, বাছাই ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে যোগ হয় আরও ৫-৭ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে খরচের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে এক বিঘায় ৭৫-৮৫ মণ পর্যন্ত আলু ওঠে, যা ওজনে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ টন। কিন্তু বর্তমান পাইকারি বাজারদর কেজি ৮-১২ টাকা হিসেবে মোট বিক্রি দাঁড়ায় মাত্র ৫০-৬০ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় বিঘাপ্রতি ১৫-২৫ হাজার টাকা ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলে এ তিন জেলায় ১০৬টি হিমাগার রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন। তবে আলুচাষিদের বড় অংশের পক্ষে সেখানে ফসল সংরক্ষণ করা সহজ নয়। কারণ মৌসুমে ভাড়া মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়, সঙ্গে লোডিং-আনলোডিং ও পরিবহন খরচ যুক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আগাম নগদ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে দাম কম থাকলেও সব কৃষকের পক্ষে আলু স্টোরেজে রাখা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় অনেকে বাধ্য হয়ে মাঠ থেকেই কম দামে বিক্রি করে দেন।
হিমাগারে খরচ বেশি
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হাজিপাড়া মাঠে কথা হয় কৃষক ফিরোজ মিয়ার সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘গতবছর ছয় বিঘা জমিতে আলু রোপণ করেছিলাম। প্রথম দিকে আলুর দাম কম হওয়ায় লাভের আশায় সব আলু হিমাগারে রেখেছিলাম। আলুতো গেছেই, তারপরও পকেট থেকে বস্তাপ্রতি আরও ২০০ টাকা দিয়ে ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে। এবারও সাড়ে চার বিঘা জমিতে আলু রোপণ করেছি। বর্তমানে আলুর যে দাম তাতে সাড়ে চার বিঘা জমিতে কমপক্ষে এক লাখ টাকা লোকশান গুনতে হবে। তারপরও হিমাগরে আলু রাখবো না।’
কালাই পৌরশহরের শিমুলতলী আর বি স্পেশালিস্ট কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক সেলিম হোসেন জানান, গতবছর আলুর দাম কম ছিল, অনেকে আলু ওঠাতে আসেননি। অনেক টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। মালিকপক্ষ এবার আর ভুল করতে রাজি নন। তাই আলু সংরক্ষণের ভাড়ার অর্ধেক টাকা অগ্রিম হিসেবে এবার জমা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যারা আলু রাখবেন, তাদেরকে অবশ্যই ভাড়ার অর্ধেক টাকা অগ্রিম জমা দিতে হবে।
আরও পড়ুন: হিমাগার থেকে হাওয়া কৃষকের হাজার বস্তা আলু
রংপুরের নগরীর নব্দীগঞ্জ এলাকার কৃষক ইব্রাহিম আলী বলেন, গতবছর আলুর বাজার আরও কম থাকলেও বীজের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেশি হয়েছে। গতবছর কৃষকরা হিমাগার থেকে আলু বের না করায় মালিকরা বাধ্য হয়ে ৩-৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন।
রংপুরের গোল্ডেন হিমাগার লিমিটেডের ম্যানেজার বায়োজিদ রহমান বলেন, ৩-৪ টাকায় আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে হিমাগার মালিক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি কৃষক ও ব্যবসায়ীরা শতভাগ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
রংপুরের সহকারী কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শাহীন আহমেদ বলেন, বাজারে প্রচুর পরিমাণ পুরেনো আলু রয়েছে। সঙ্গে নতুন আলু যোগ হয়েছে। এতে সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, বাজারদর নির্ধারণ কৃষি বিপণন বিভাগের বিষয়। তবে অনেক আশায় আলু চাষ করে এবারও ভালো নেই কৃষক।

রংপুরের আলুচাষি সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বলেন, উৎপাদন বেশি হলে কৃষকরা সমস্যায় পড়েন। আলুর মতো নিত্যপণ্যের বিষয়ে সরকার বা কৃষি অধিদপ্তরের তেমন নজরদারি নেই।
এ বিষয়ে বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শাসসুদ্দিন জানান, উৎপাদন বৃদ্ধি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বাজার স্থিতিশীল করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি পর্যায়ে সীমিত আকারে আলু সংগ্রহের চেষ্টা আছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে।
সংকটের চক্র ভাঙবে কীভাবে
বগুড়া, জয়পুরহাট ও রংপুর জেলায় গত তিন বছরে উৎপাদন এবং লোকসানের কারণে কৃষকদের সম্মিলিতভাবে ক্ষতি হয়েছে হাজার কোটির বেশি। জাতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের সাবেক সদস্য ড. আলমগীর হোসেন মনে করেন, সমস্যার মূল বাজার পরিকল্পনায়। উৎপাদন বাড়ানোই একমাত্র লক্ষ্য হলে হবে না। মৌসুম শুরুর আগেই সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের হিসাব ধরে সরকারি সংগ্রহ, রপ্তানি সহায়তা ও বাজার হস্তক্ষেপের ঘোষণা দিতে হবে। তার মতে, ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য স্টোরেজ বরাদ্দে আলাদা কোটা এবং মজুত তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও গবেষক হোসেন বজলুর রশিদ বলেন, ‘আলুর জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কাঠামো বিবেচনায় আনা উচিত। ধানের মতো সরাসরি ক্রয়ব্যবস্থা না থাকায় আলুচাষি পুরোপুরি বাজারের ঝুঁকিতে। ফলন বেশি হলেই দাম পড়ে যায়। এই চক্র না ভাঙলে কৃষক ধীরে ধীরে চাষ থেকে সরে যাবেন।’
এসআর/জেআইএম