ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

১৯% পাল্টা শুল্ক ছাড়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের নতুন সম্ভাবনা

ইব্রাহীম হুসাইন অভি | প্রকাশিত: ০২:০৯ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক ছাড়ের সুবিধা বাংলাদেশকে নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা ও সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত করে দেবে দেশটির বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একক সর্ববৃহৎ বাজার হওয়ায়, এই সুবিধা দেশীয় পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ চুক্তির ফলে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগে ২০ শতাংশ ছিল। পাশাপাশি, এ চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশি পোশাক পণ্য রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক থেকে ছাড় পাবে বাংলাদেশ। ফলে পাল্টা শুল্ক শূন্য হয়ে যাবে।

কেন বাংলাদেশ লাভবান হবে

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একক সর্ববৃহৎ বাজার, যেখানে আমাদের তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ যায়। সুতরাং, এই সুবিধা দেশীয় পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় করবে।

দি অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭.৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬.৭৬ বিলিয়ন ডলার। মোট আমদানিকৃত পোশাকের মধ্যে প্রায় ৫.১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ছিল তুলাভিত্তিক এবং অবশিষ্ট অংশ ছিল নন-কটন বা তুলাবহির্ভূত পণ্য।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রায় ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।

বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা ও সুযোগের দ্বার উন্মুক্তযুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের হার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ হয়েছে। তবে দেশটির তুলা ব্যবহার করে পোশাক পণ্য রপ্তানিতে সেই শুল্ক দিতে হবে না, ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে সেই তুলা দিয়ে পণ্য উৎপাদন করলে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ, এ ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক ছাড় সুবিধা তখন শূন্য হয়ে যাবে।

অন্যদিকে, নন-কটন পণ্যের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশই নন-কটন পণ্য, ফলে এই খাতেও রপ্তানি সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সই, শুল্ক কমেছে ১ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ৮৫-৮৬ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা মিলবে

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ফয়সাল সামাদ মনে করেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও ম্যানমেড ফাইবার ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে।

তিনি বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা ফাইবার ব্যবহার করে তৈরি কাপড় থেকে উৎপাদিত পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করা হলে শুল্ক কমানো বা শূন্যে নামিয়ে আনার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। এই সুবিধা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ফয়সাল সামাদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা উন্নত মানের হিসেবে পরিচিত। এই তুলা ব্যবহার করলে দেশের স্পিনিং মিলগুলো উচ্চমানের সুতা উৎপাদন করতে পারবে। যদিও ব্রাজিল, ভারত বা উজবেকিস্তানের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দাম তুলনামূলক বেশি, তবে উন্নত মানের সুতা এবং সম্ভাব্য শুল্ক সুবিধা মিলিয়ে এই অতিরিক্ত ব্যয় অনেকাংশে সমন্বয় করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্মত সুতা সরবরাহ করতে পারে, তাহলে পোশাক রপ্তানিকারকরা এটিকে শক্তিশালী বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। এতে উচ্চমূল্যের অর্ডার পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কী পাবে, কী দেবে?
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানি করবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব হায়দার বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে সুতা ও পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করলে অতিরিক্ত শুল্ক ছাড় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তা দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। এতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।

রাজীব হায়দার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে উৎপাদিত সুতা ও পোশাকে শুল্ক ছাড় কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা খরচ কমানোর সুযোগ পাবেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাক আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা তুলনামূলক কম আমদানি করে। এর প্রধান কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির ক্ষেত্রে পরিবহন সময় বেশি লাগে এবং অন্যান্য উৎসের তুলনায় এর দাম কিছুটা বেশি বা প্রিমিয়াম পর্যায়ের হয়ে থাকে। এই দুটি বিষয়ই আমদানিকারকদের জন্য বড় বিবেচ্য বিষয়।

তিনি বলেন, নতুন শুল্ক সুবিধা বাস্তবায়িত হলে উদ্যোক্তারা কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানির বিষয়টি নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে বাজার সুবিধা ও শুল্ক সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এটি বাংলাদেশের স্পিনিং ও গার্মেন্টস খাতের জন্য লাভজনক হতে পারে।

‘আমি মনে করি, আগের অবস্থানের তুলনায় বাংলাদেশ এখানে স্পষ্টভাবে লাভবান হবে। চুক্তির মাধ্যমে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে’, বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একক সর্ববৃহৎ বাজার হওয়ায়, সেখানে সুবিধা পাওয়া অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, এটি আমাদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিবাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সোমবার ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টা শুল্ক চুক্তি (এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ছবি: পিআইডি

সুবিধা কাজে লাগাতে কী করতে হবে

সুরমা গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, এই চুক্তির পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে উৎপত্তি বিধি, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং শুল্ক নির্ধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত স্পষ্টতা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিজিএমইএ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে জানান তিনি।

ফয়সাল আরও বলেন, চুক্তির কারিগরি বিষয়গুলো পরিষ্কার হলে বিজিএমইএ তাদের সদস্য কারখানাগুলোকে অবহিত করবে এবং কীভাবে এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা যায় সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবে।

আউটপেস স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেন, তবে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় চুক্তি করার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নীতিগত স্থায়িত্ব ও স্পষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প এই সুযোগ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারবে।

ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে শ্রমিক অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের শর্তগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, এসব বিষয় আমাদের শুধু আন্তর্জাতিক চাপের কারণে নয়, দেশের নিজস্ব স্বার্থে মেনে চলা উচিত। শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, পরিবেশের মান নিশ্চিত এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শুধু মার্কিন বাজার নয়, ইউরোপীয় বাজারেও বাংলাদেশ সুবিধা পাবে। এতে দেশের শিল্পখাত আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে।

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নতুন বাণিজ্য চুক্তির ফলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রবেশাধিকারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সুযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহারের মূল্যায়ন এবং ট্রেসেবিলিটি প্রক্রিয়া সঠিকভাবে নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বিজিএমইএ আরও জানিয়েছে, মার্কিন তুলা গুণগতভাবে উন্নত এবং ব্যয়বহুল হওয়ায়, স্থানীয় স্পিনাররা যদি সুতার প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হন, তবে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আইএইচও/এমএমএআর

আরও পড়ুন