সবার নজর আইপিওতে, চাই ভালো শেয়ার
দীর্ঘ মন্দার কারণে শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন/ফাইল ছবি
দেশের শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী ধারায় না ফিরলেও লেনদেনের গতি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ মন্দার কারণে শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন। এ পরিস্থিতিতে শেয়ারবাজারে গতি ফেরাতে দ্রুত ভালো কোম্পানির শেয়ার আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তবে দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আসছে না। ফলে বাজারের গতিও ফিরছে না। তাই বাজারে গতি ফেরাতে দ্রুত ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে।
তারা আরও বলছেন, দেশে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর থেকেই শেয়ারবাজার নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। বিদেশিরা বাজার থেকে শেয়ার কেনার পরিমাণও বাড়িয়েছেন। সেই সঙ্গে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবও কিছুটা বেড়েছে। এই ধারা ধরে রাখতে হলে নতুন ভালো আইপিও’র কোনো বিকল্প নেই। দ্রুত ভালো কোম্পানির আইপিও না এলে বাজার আবার গতিহীন হয়ে পড়তে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে বেশকিছু দুর্বল কোম্পানির আইপিও দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির পর দর ধরে রাখতে পারেনি, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সুতরাং বাজার ভালো করতে হলে ভালো আর্থিক ভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিতে হবে। ভালো কোম্পানির আইপিও এলে, তার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীও আসবে, সেই সঙ্গে বাড়বে তারল্য।
আরও পড়ুন
শেয়ারবাজারে সক্রিয় হচ্ছেন বিদেশিরা, বেড়েছে শেয়ার কেনা
বড় উত্থানের পর শেয়ারবাজারে ফের দরপতন
শেয়ারবাজার নিয়ে সংশয় কাটছে না বিনিয়োগকারীদের
দেশের শেয়ারবাজারে সর্বশেষ আইপিও এসেছে টেকনো ড্রাগসের। ২০২৪ সালের জুনে এই কোম্পানিটি আইপিও’র মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে। এরপর আর কোনো কোম্পানির আইপিও আসেনি। অর্থাৎ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে শেয়ারবাজারে আইপিও আসা বন্ধ রয়েছে। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এত দীর্ঘসময় ধরে আইপিও না আসার ঘটনা আর ঘটেনি।
বিদেশিদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। এ হিসাবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ১২ হাজার ৪০৬টি
এদিকে দীর্ঘ মন্দার কারণে বর্তমানে শেয়ারবাজারের সিংহভাগ বিনিয়োগকারী বড় লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। কোনো কোনো বিনিয়োগকারী ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত লোকসানে আছেন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য এখন বেশিরভাগ কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে দরপতন হচ্ছে।
শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতি বাড়ার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তেও দেখা যাচ্ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিদেশিরা ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন ১৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ার বিক্রির থেকে কেনা বেশি ১৮ কোটি ১ লাখ টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিদেশিরা ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ১১৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার। অর্থাৎ শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি হয় ৮০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।
তার আগের মাস নভেম্বরে বিদেশিরা ৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ১৭৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, অক্টোবর মাসে ৯৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ২৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ২৯১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং আগস্ট মাসে ১৬৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা শেয়ার কেনার বিপরীতে বিক্রি করেন ২০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ টানা পাঁচ মাস বিদেশিদের শেয়ার কেনার থেকে বিক্রি বেশি ছিল।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের শেয়ারবাজার ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায় বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তবে অতি সম্প্রতি তাদের বিও হিসাব বাড়তে দেখা যাচ্ছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ১৩টি। অথচ এর আগে তাদের বিপুলসংখ্যক বিও হিসাব বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ১০৬টি, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ৪৩ হাজার ৫৪৯টি। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা বাড়ার পরও চলতি বছরে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৪৪৩টি।
বিদেশিদের বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ছাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। এ হিসাবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ১২ হাজার ৪০৬টি।
বিদেশিদের লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি সম্প্রতি সার্বিক শেয়ারবাজারেও লেনদেনের গতি বাড়তে দেখা যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত ৮ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। এর প্রতিটি কার্যদিবসেই ডিএসইতে ৫০০ কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছে তিনদিন। লেনদেনের গতি বাড়লেও এখনো দরপতনের পাল্লা ভারি। শেষ ৮ কার্যদিবসের মধ্যে ৬ কার্যদিবস শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে, বিপরীতে দুই কার্যদিবস ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এখন বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তবে দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আসছে না। ফলে বাজারের গতিও ফিরছে না। তাই বাজারে গতি ফেরাতে দ্রুত ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও নিয়ে কাজ করে এমন একটি ব্রোকারেজ হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর থেকেই দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনের পর তাদের আগ্রহ আরও বেড়েছে। বিদেশিরা নিয়মিত বাজারের খোঁজখবর নিচ্ছেন। এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে হলে দ্রুত ভালো কোম্পানির আইপিও আনতে হবে। ভালো কোম্পানির আইপিও আনতে পারলে শুধু বিদেশি না দেশি বিনিয়োগকারীরাও বাজারে সক্রিয় হবেন।’
আরও পড়ুন
নির্বাচনের পর টানা দরপতন, তবুও বাজার মূলধন বাড়লো হাজার কোটি টাকা
দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমায় দুই ডজন প্রতিষ্ঠান, সূচকের বড় লাফ
নগদকে টিকিয়ে রাখতে বড় বিনিয়োগ দরকার, বিদেশি বিনিয়োগও স্বাগত
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে নিষ্ক্রিয় থাকা অনেক বিনিয়োগকারী এখন যোগাযোগ করছেন, বাজার সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এটা ভালো লক্ষণ। তবে বাজারে গতি ফেরাতে হলে এবং বিনিয়োগকারীদের পুরোপুরি সক্রিয় করতে হলে দ্রুত ভালো কোম্পানির আইপিও আনতে হবে। আইপিও না এলে বাজার আবার গতিহীন হয়ে পড়বে।’
যোগাযোগ করা হলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)-এর সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেকদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাইডলাইনে ছিলেন। এখন নতুন সরকার আসছে, আশা করি ৫ বছর থাকবে। এ কারণে বিদেশিরা শেয়ারবাজার নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, ওনারা পজিটিভ। এটা ভালো লক্ষণ। এখন এটাকে ধরে রাখতে হবে। আর এই ধরে রাখার জন্য নতুন আইপিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
শেয়ারবাজারে আইপিও কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজারে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা খুবই কম। তাই এখন দ্রুত ভালো কোম্পানির আইপিও প্রয়োজন। সবাই এখন আইপিও’র দিকে তাকিয়ে আছেন। ভালো কোম্পানির আইপিও এলে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারী আসবে, নতুন ফান্ড আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইপিও হলো শেয়ারবাজারের নিউ ব্লাড (নতুন রক্ত)। নিউ ব্লাড প্রবাহ যদি বাজারে বন্ধ হয়, তাহলে এটা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ব্যাপক ক্ষতি করে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে কোনো আইপিও নেই। এটা বাজারকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। এখন বাজারে গতি আনতে আইপিও’র কোনো বিকল্প নেই।’
ডিএসই’র সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী জাগো নিউজকে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তাই আমরা আশা করছি বাজারে ওপর সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তবে এখন বাজারের জন্য সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভালো কোম্পানির আইপিও আনা। ভালো কোম্পানির আইপিও আনতে না পারলে বাজার গতি পাবে না।’
তিনি বলেন, ‘বাজারের প্রতি এখন দেশি-বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তাদের এই আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। এজন্য বিকল্প বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর এই বিকল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তৈরি হবে নতুন আইপিও আনার মাধ্যমে।’
এমএএস/ইএ