ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. একুশে বইমেলা

বই আলোচনা

পান্থনিবাস: আশ্রয় ও বিচ্ছেদের গল্প

সাহিত্য ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৪:১৩ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

রাইফা আহমেদ তুরফা

‘পান্থনিবাস’ বইয়ের প্রচ্ছদটা আমর কাছে দারুণ লেগেছে। প্রচ্ছদ দেখে বইটা পড়ার আগ্রহ পাই। তারপর পড়া শুরু করলাম। পান্থনিবাসটা বর্তমানে দেখাশোনা করছেন খালেক মুন্সি। তিন মাসের অসুস্থ মেয়ে অপলাকে নিয়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন পান্থনিবাসের মালিক গণি মিয়ার কাছে। তারপর? তারপর আর কি? সেই থেকে খালেক মুন্সি পান্থনিবাসে বসবাস শুরু করার পাশাপাশি তার দেখাশোনা করেন।

পান্থনিবাস একটি সময়ের গল্প। এখানে বেশ কয়েকজন মানুষের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। পান্থনিবাস বাড়িটিতে খালেক মুন্সি একাই থাকতেন। এরপরে গণি মোল্লা নতুন ভাড়াটিয়া উঠায়। তা-ও আবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক লোক, যার নাম নিমাই চক্রবর্তী। তার সাথে খালেক মুন্সির কোনো মিল হচ্ছিল না। যা হোক, তারপরও পান্থনিবাসে দুজন দুই জায়গায় বসবাস শুরু করে। তার কিছুদিন পর আনিস নামের এক ছেলেকে পান্থনিবাসে পাঠায় গণি মোল্লা, সাথে একটা চিঠি। চিঠিতে বলেন, ছেলেটি পান্থনিবাসেই থাকবে। সেখানে থেকে সে চাকরি করবে। আদতে সে চেয়েছে খালেক মুন্সির বড় মেয়ে সেঁজুতির সাথে ছেলেটির বিয়ে দিতে।

অন্যদিকে পান্থনিবাসে আসার কিছুদিন পরই আনিসের সাথে খাতির জমান লোকমান হাকিম নামের এক লোক। যাকে কাদের মোটেও সুবিধার লোক বলে মনে করতো না। কাদের হলেন পান্থনিবাসের কেয়ারটেকার। কাদেরের সাথে খালেক মুন্সির সম্পর্ক দিনের বেলায় সাপে নেউলের মতো, যেটা পাঠক হিসেবে দারুণ উপভোগ করেছি। আবার খালেক মুন্সি যখন একটু লাল পানি খান; তখন কাদের তার পাশে থাকে। সেই সুবাদে তাকেও একটু দেওয়া হয়। তখন আবার তাদের সম্পর্ক ভালো হয়ে যায়।

একদিন আনিস নামের ছেলেটি রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। তখন জানতে পারি, লোকমান হাকিম ইংরেজ সরকারের হয়ে কাজ করেন। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে রাজনীতি করায় আনিসকে গুম করার আদেশ দেওয়া হয়। লোকমান হাকিম তখন বলেন, আনিসের মায়ায় পড়ার জন্য প্রাণে মারতে পারেন না। তার চোখ বেঁধে নদীতে ফেলে দেন।

সেপ্টেম্বর মাস, ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়েছে অনেক আগে। দেশ দুইভাগ হয়ে এখন পাকিস্তান ও ভারত হয়েছে। গণি সাহেব হজে গিয়ে আর ফেরেননি। সেখানেই ইন্তেকাল করেছেন। তার সমস্ত সম্পত্তি খালেক মুন্সিকে দিয়ে গেছেন। আনিসের বইগুলো সেঁজুতি যত্ন করে রেখে দিয়েছে। বইগুলো আনিসের হাতে দিতে পারলে দায় থেকে মুক্তি পাবে।

আরও পড়ুন
সংগঠন ও বাঙালি: যে কারণে পাঠ জরুরি 
আততায়ী অন্ধকার: নির্বাক যন্ত্রণার কাব্য 

সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল অপলার কর্মকাণ্ড। অপলা একটা কাচের বোতলে কান্নার পানি জমাতো! গল্পটি শেষ হয় সেঁজুতির কণ্ঠে একটি গানে, ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া/ শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে/ অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে ভ্রমর/ কইয়ো গিয়া’।

আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠেছে। চারদিক সুনসান নিস্তব্ধ। অপলা তার বাবার হাঁটুতে মাথা রেখে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। খালেক মুন্সি অপলার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে তার গায়ের চাদর খানিকটা টেনে অপলার গায়ে দিয়ে দিলো। বকুল গাছের ডালের ফাঁকা দিয়ে চাদের আলো এসে পড়েছে সেঁজুতির মুখে। খালেক মুন্সি দেখলো তার মেয়ে কাঁদছে। চাদের আলোয় সেঁজুতির ফর্সা গাল চিকচিক করছে। সেঁজুতি তার আপন মনে দুলতে দুলতে গেয়েই চলেছে।

এত সুখের সংসার, স্বামী, বাচ্চা থাকার পরেও মেয়েটার কী এমন দুঃখ খালেক মুন্সি ভেবে পেলেন না। তার ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো। তিনি অস্ফুট শব্দ করে বললেন, আহারে! আহারে। আহারে! এই মুহূর্তটা যখন পড়ছিলাম; তখন মনে হচ্ছিলো নীরবে আমিও তাদের সাথে এক কর্নারে বসে জীবনচারিতা উপভোগ করছিলাম।

লেখক এত সুন্দর সাবলীলভাবে কাহিনি উপস্থাপন করেছেন, তাতে যে কেউ মিশে যেতে বাধ্য। ‘পান্থনিবাস’ বইটি হুমায়ুন আহমেদের ‘আমাদের সাদা বাড়ি’র গল্পের মতো মনে হয়েছিলো। তবে প্লট অনেকটাই ভিন্ন। বইটির প্রথম দুয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ভালো না লাগলেও তারপর থেকে ভালোই লেগেছিল।

বই: পান্থনিবাস
লেখক: আহমেদ যুবায়ের
প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ
প্রকাশনী: দূরবীণ
মূল্য: ৩৩৩ টাকা।

এসইউ

আরও পড়ুন